করোনা ভাইরাস ও মিডিয়ার গণ-সংযোগ

সাজিদ রাজু

একটি বড় লাল-কমলা রঙের গোল বলের মতো করোনা ভাইরাস ঘুরছে ঢাকার রাজপথে। বড় রাস্তাধরে একটির পর আরেকটি ভবন পার হয়ে যাচ্ছে। এই বলের চারপাশে নানা রকমের ডিজাইন করা, করোনা ভাইরাসের গাঠনিক আকৃতি। আকৃতি এতো বিশাল যে বহু সংখ্যক মানুষকে দলিত মথিত করে দিয়ে যেতে পারে নিমেষেই। এই হলো করোনা ভাইরাস নিয়ে মানুষকে সচেতন করার টেলিভিশনে প্রচার করা তথ্যচিত্র।

আরও পড়ুন


> সাংবাদিকতা যখন প্রশ্নবিদ্ধ!

> কী ‘অসহায়’ সাংবাদিকতা!

এই তথ্য চিত্র নিয়েই ট্রল হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে,চা দোকানে বসে গ্রামের এক বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ বলছে,‘এতো বড় একটা জিনিস, এইডা যদি মাইনষের মধ্যে ঢুহে, তাইলে এমনেই মরবো’। তার চিন্তা-কল্পনার করোনা ভাইরাস এমনই। তার মতো আরো বহু মানুষের হয়তো করোনা ভাইরাস নিয়ে ধারনা এমনই। এমন একটা তথ্য-চিত্র দেখে এসব মানুষের পক্ষে মাস্ক পরা আর সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সত্যিই কঠিন নয় কি?

ইউটিউব এখন অনেক জনপ্রিয় বিনোদন মাধ্যম। গ্রাম গঞ্জের বহু মানুষ,তৃণমূল নাগরিকও ইউটিউবে ভিডিও দেখে বিনোদন পান।করোনা ভাইরাস নিয়ে ইউটিউবেও বেশ কিছু ভিডিও চোখে পড়লো। সেখানে সাধারণ মানুষকে করোনা ভাইরাস সম্পর্কে নিয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছে। তারাও তাদের মতো করে সেসব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন।

একজন বলছেন, করোনা নামের একটা অসুখ এসেছে বলে তিনি শুনেছেন টিভির খবরে। তার বিশ্বাস এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা গজব,মানুষের দুষ্ট কার্যক্রমের ফল। আমরা বাংলাদেশের মানুষ যেহেতু গরীব,তাই এ নিয়ে ভাবনার কিছু নেই। আল্লাহই আমাদের হেফাজত করবেন। আর সে কারণেই তিনি বাইরে বের হন,তার আপাতত কিছু করার নাই।

আরেকজন বলছে,সে শুনছে যে মানুষ মারা যাচ্ছে।টিভিতেও দেখেছে। তারা গরীব মানুষ, দিন এনে দিন খান,তাই আল্লাহই তাদের সাহায্য করবেন।

অপেক্ষাকৃত শিক্ষিত একজন বলছেন,টিভিতে তিনি দেখেছেন যে করোনা মহামারি আকার ধারন করেছে। তবে বাংলাদেশ যেহেতু গরীব দেশ,আল্লাহ সাহায্য না করলে তারা কেউ বাঁচাতে পারবে না।এটা থেকে পরিত্রাণের জন্য তারা নামাজ-রোজা আরো জোরেশোরে শুরু করেছেন। মানুষকে অসভ্যতা পরিহার করারও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

কৃষিজীবী একজন বলেছেন,তিনি শুনেছেন যে বিদেশে ঘণ্টায় আটশ’ থেকে এক হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে করোনা ভাইরাসে। বিদেশ থেকে যারা বাংলাদেশে ফিরেছেন,তারা বেশি ঝুঁকিতে আছেন। বাকিদের খুব একটা সমস্যা নেই। তার আরো একটা ব্যাখ্যা, বাংলাদেশে বেশি শীত নাই, তাই এদেশে করোনা ভাইরাস টিকবে না।

স্থানীয় একজন ইউটিউবার যাদের মন্তব্য নিয়েছেন,তারা সবাই এসব তথ্য পেয়েছেন টিভির খবর দেখে।

এই যে মানুষগুলো নিজেদের মতো করে করোনা সম্পর্কে তথ্য জেনেছেন, সেটার উপর ভিত্তি করে তাদের মধ্যে একটা বিশ্বাস গড়ে উঠেছে। এতে তাদের কোন দোষ নেই, কোন ভুলও নেই। এটার পুরো দায় গণমাধ্যমের, বিশেষ করে টেলিভিশন, রেডিও ও পত্রিকাগুলোর। কারণ প্রান্তিক এই মানুষগুলোর তথ্য জানার উৎস গণমাধ্যমই। গণমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ের ভুল রিপোর্টিং,অস্পষ্ট প্রতিবেদন,যাচাই বাছাই না করে বানানো তথ্য-চিত্র মানুষের মনে দাগ কেটেছে,তারা নিজেদের সক্ষমতার আলোকে সেসব তথ্য সংরক্ষণ করেছেন,আবার অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগিও করেছেন। আর এভাবেই গেল কয়েক মাসে এসব ভুল ও মিথ্যা ধারনা ছড়িয়ে গেছে মানুষের মধ্যে।

গরমে যে করোনা ভাইরাসের কিছু হয় না, তা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও বারবার করে বলেছে। তারা একটা সেমিনারে এটাও বলেছে যে, গরমকালে দেশের তাপমাত্রা ৩৫-৪০ ডিগ্রির মতো হয়। এই তাপমাত্রায় গবেষকরা ভাইরাস কালচার করার জন্য রেখে দেন। অথচ কি এক অজানা কারণে দেশময় এ খবর রটে গেল যে, গরমে করোনা টিকবে না। এটা শীতের দেশের ভাইরাস।

শুধু গণমাধ্যম নয়, গণমাধ্যমে যারা কাজ করেন, তাদের অনেকেও ব্যক্তিগত উদ্যোগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের ধারনা ও বিশ্বাস প্রচার করেছেন। ব্যক্তি হলেও গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের দেয়া তথ্যকে মানুষ গুরুত্ব দেয়। অপেক্ষাকৃত শিক্ষিত তরুণরা গণমাধ্যমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনুসরণ করেন বেশি। তারা আবার এসব তথ্য নিজেদের ওয়ালে পোস্ট করেন, শেয়ার করেন, ছড়িয়ে দেন। কাজেই সাংবাদিকদেরও ব্যক্তিগত দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।

সাংবাদিকতার ক্লাসের এক জনপ্রিয় গল্প মনে পড়ছে। হেলথ কমিউনিকেশনের ক্লাসে এ গল্প বলেছেন আমাদের কোন এক শিক্ষক। একবার জনসংখ্যা কমানোর ব্যাপারে দেশজুড়ে সচেতনতা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রচারনা চলছিলো। সে সময়ের স্লোগান ছিলো ‘ছোট পরিবার সুখী পরিবার’।

গ্রামীণ জনপদে সাধারণত ‘স্ত্রী’কে বলা হয় ‘পরিবার’। গ্রামের মানুষ পারস্পারিক খোঁজখবর নেয়ার সময়ও ঘরে বউ ভালো আছে কি না তা জানতে চেয়ে জিজ্ঞেস করে, পরিবার কেমন আছে।

এই ক্যাম্পেইন চালানোর পর পরবর্তী জনশুমারিতে দেখা গেল, কোন এক উপজেলায় (নাম মনে নেই)জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, ওই এলাকার মানুষের এই ধারনা হয়েছে যে,সুখী হতে হলে ঘরে একটা করে ‘ছোট পরিবার’ থাকতে হবে। অর্থাৎ সুখী হওয়ার পূর্ব শর্ত হলো ছোট পরিবার। তাই অনেক বিবাহিত পুরুষ একাধিক বিয়ে করে ঘরে একটা করে ছোট পরিবার এনেছে,অর্থাৎ ছোট বউ ঘরে এনেছে। ফলাফল, ওই এলাকার জনসংখ্যাও বেড়ে গেছে।

গণমাধ্যম ভুল তথ্য দিলে মানুষ বিভ্রান্ত হয়। ভুল বার্তায় মানুষের উপরও এর প্রভাব পড়বে, এটাতো স্বাভাবিক মিডিয়ার দায়িত্বই সঠিক তথ্য দিয়ে মানুষকে সচেতন করা, শেখানো। সঠিক সময়ে সঠিক দায়িত্বটি পালন করতে না পারলে মানুষ তার উপর আস্থা রাখতে পারে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধানের দেয়া ৫ পরামর্শ প্রণিধানযোগ্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সে ভিডিও ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেখানে তিনি বলছেন, প্রয়োজন হলে দুই বারের বেশি নিউজ না দেখা। দেখলেও যথাযথ সোর্স আছে, তথ্যের উৎস বিশ্বাসযোগ্য এমন জায়গা থেকে খবর সংগ্রহের পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি। কারণ আমাদের বেশিরভাগ মিডিয়া করোনা সংকটে যে দায়িত্ব পালন করার কথা ছিল তা করতে পারছে না। এখনো বাস্তবসম্মত, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ বা তথ্য সরবরাহ করতে পারছে না। এক্ষেত্রে অবশ্যই গণমাধ্যম ও গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দায় এড়াতে পারেন না। এই দায়িত্বশীল আচরণ অবশ্যই করতে হবে, নইলে যে উল্টো ফল, তার দায়ও নিতে হবে।