সাবরিনার ‘পাপ’: নৈতিকতার কাঠগড়ায় সামাজিক ও সংবাদমাধ্যম

জুবায়ের ফয়সাল

গভীর রাত, তা প্রায় তিনটা… স্কুল জীবনের এক বন্ধু মেসেঞ্জারে নক করলো, জানতে চাইলো কেমন আছি। কিন্তু ওর চরিত্র বলে, কোন দরকার ছাড়া এতো রাতে বার্তা পাঠানোর ছেলে ও না। তাই সরাসরি জানতে চাইলাম, বল কি অবস্থা? কিছু বলবি? আমাকে হতাশ করেনি ও, জানতে চাইলো, বন্ধু এক্সক্লুসিভ কিছু আছে নাকি? জিজ্ঞাসা করলাম, এক্সক্লুসিভ মানে? ও বললো, আরে তুই তো সাংবাদিক, ডাক্তার মহিলার আরো কোন ছবি আছে কিনা, যেটা পাবলিশ হয়নি? ওকে যে উত্তরটা দিয়েছিলাম, সঙ্গত কারণেই এখানে তা উল্লেখযোগ্য নয়…

আরও পড়ুন


> আয়নায় নিজের ‘অন্তর’ দেখুন

কিন্তু, সে রাতে আর ঘুম আসেনি। নাহ ওর কথায় না, বরং ভাবছিলাম, কিভাবে প্রতিদিন আমার রাষ্ট্র একের পর এক নেতিবাচক খবরের শিরোনাম হচ্ছে, আর বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে, সেটা। অথচ সরকার স্বস্তি খুঁজছে তখন, গঠনমূলক ভাবনা বাদ দিয়ে ঐ বন্ধুর মতো তারুণ্য যখন বন্দি হয়ে পড়ছে এক নারীর রুপের জালে। হয়তো কিছুটা হাফ ছেড়ে বাঁচার ভান করছেন করোনায় কঙ্কাল বের হয়ে পড়া স্বাস্থ্যখাতের কর্তারাও। অন্ততঃ আপাদমস্তক ব্যর্থতার সমালোচনা থেকে কয়েকদিনের জন্য নেটিজেনরা যে, পূর্ণ মনোযোগে কাটাছেড়া করছে সাবরিনার এপিঠ ওপিঠ। মোটামুটি ক’দিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যম, আন্ডারগ্রাউন্ড অনলাইন পত্রিকা কিংবা মেইনস্ট্রিমের গণমাধ্যম, সবখানেই শিরোনামের হটকেক, রিজেন্ট-শাহেদ আর সাবরিনা-জেকেজি কেলেঙ্কারি। কিন্তু প্রচারণার শীর্ষে, শুধুমাত্র ডা.সাবরিনার নানা ভঙ্গিতে তোলা গোটা বিশেক স্থিরচিত্র। সঙ্গে লেখা হচ্ছে চটকদার সব ক্যাপশন। যা দেখলে একজন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের মনে হতেই পারে, এ দেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারিদের একটা বড় অংশই বিকৃত মানসিকতা পোষণ করেন।

সেখানে অবশ্য আমার কোন আপত্তি নেই, কারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যক্তি অবশ্যই তার মনের মর্জিমতোই কথা বলবেন। অপ্রাসঙ্গিক কোন লেখা কিংবা মিথ্যা তথ্য দিলে অধিকাংশ সময়ই ঐসব সাইটগুলো দায়বদ্ধতার প্রশ্নে তাকে বিদ্ধ করে না, কিন্তু তাই বলে অনৈতিক আচরণ আর অশ্লীল ভাষার চয়নে নিজের বিবেকের দায়বদ্ধতা এড়াবেন কিভাবে? এখানে একদমই আলাদা সংবাদ মাধ্যমের ভুমিকা। বিশেষ অনুসন্ধান আর কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া চাইলেই কোন ভিডিও ফুটেজ কিংবা স্থিরচিত্র ব্যক্তির অনুমতি না নিয়ে ব্যবহার করতে পারে না গণমাধ্যম। নিকট অতীতে ইফতেখার আহমেদ ফাহমি আর মিথিলার স্ক্যাণ্ডালের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে সরাতে, হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে উচ্চ আদালতকেও। কিন্তু সব নিয়ম নীতি ভেস্তে গেছে সাবরিনা কাণ্ডে। তার এবং তার প্রতিষ্ঠানের জালিয়াতির অপরাধের সমালোচনা করতে গিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভেঙেছে নৈতিকতার বাঁধ। আর সংবাদ মাধ্যম ভেঙেছে ব্যক্তিগত সুরক্ষা আর গোপনীয়তা রক্ষার মানদণ্ড। খবর প্রকাশ করতে গিয়ে জালিয়াতির হোতা জেকেজি, আর তার অনুমতি প্রদান করা কর্তৃপক্ষের চেয়ে গণমাধ্যমে বেশি উপস্থাপন করা হয়েছে নানান ভঙ্গিমায় তোলা সাবরিনার খোলামেলা ছবি। অথচ, কোথাও চোঁখে পড়লো না, ছবিগুলোর সোর্স কি, সংগ্রহ করা হয়েছে কোত্থেকে, তার ক্রেডিট লাইন।

তাহলে কি ধরে নেবো, সংবিধান, আইন না মেনে শুধু তাৎক্ষণিকতার চাহিদা আর কাটতি বাড়ানোর কৌশল-ই নিয়ন্ত্রণ করছে এখনকার সাংবাদিকতা? যেখানে, ব্যক্তির গোপনীয়তা রক্ষার অধিকারকে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে খোদ বাংলাদেশ সংবিধানের ৪৩ নম্বর ধারা। এমনকি ২০০৬ এর সাইবার আইন মানলেও আপনাকে ধরে নিতে হবে, ব্যক্তির অনুমতি ছাড়া তার স্পর্শকাতর কোন ছবি কিংবা তথ্য প্রকাশ করাও অপরাধ। আবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের ১২ নম্বর অনুচ্ছেদ মতে, কোন ব্যক্তির গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ করতে পারবে না অন্য কেউ, তার আত্মসম্মান নষ্ট হয়, এমন কোন কাজ করাও অপরাধ।

একজন মানুষ তার সুন্দর মুহূর্তে সাজগোজ করে ছবি তুলতেই পারেন, হ্যাঁ তার অনুসরণ করা সংস্কৃতি যদি খোলামেলা ই হয়, সেটার দায়ভারও তো একান্তই তার নিজের ই। আচ্ছা বলুন তো, সে যতো বড় অপরাধী-ই হোক, পেটখোলা শাড়ি আর পিঠখোলা ব্লাউজে নারীর ছবি মানেই, অন্তর্চক্ষু দিয়ে দেখতে দেখতে তাকে কী বোর্ডের ডিজিটে ধর্ষণ করা জায়েজ?

অনেকেই বলতে পারেন, ইন্টারনেটে পেয়েছি, আমরা দিলে দোষ কি? দোষ আছে, সাবরিনা আমাকে আপনাকে এই ছবি দেননি। আমি আপনি অবাধে তার সাজগোজ করা ছবিকে বাহারি ক্যাপশনে নিজের ওয়ালে লাইক কমেন্ট বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করতে পারি না। খবরের মুল ইস্যুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছবি পাশ কাটিয়ে দর্শকদের তার নানা অঙ্গভঙ্গির ছবি গেলাতে পারি না। তিনি অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত, প্রচলিত আইন তার শাস্তি নিশ্চিত করুক। কারা তাকে এমন অন্যায়ের প্ররোচণা, আর সুযোগ করে দিয়েছে, শাস্তির আওতায় আসুক তারাও। সাবরিনার শরীরতত্ত্ব বাদ দিয়ে এই আলোচনাগুলো চলতে থাকুক সব প্লাটফর্মে, আখেরে তাতে দেশেরই লাভ।

লেখক: জুবায়ের ফয়সাল, গণমাধ্যমকর্মী