আয়নায় নিজের ‘অন্তর’ দেখুন

ফারাহ জাবিন শাম্মী

“কেমন ছিল সাবরিনার জেলের প্রথম রাতটি?” “সাবরিনার প্রভাবশালী যত বয়ফ্রেন্ড”। নামসর্বস্ব কিছু অনলাইন নিউজের হেডলাইন। নামসর্বস্ব হলেও শেয়ারিংয়ে কমতি ছিলনা। যেমনটা চাচ্ছিলেন আপনি।সাথে আরো কয়েকটা রঙচঙা কথা জুড়ে দিয়ে শেয়ার করে দিলেন নিজের টাইমলাইনে।আপনার উদ্দেশ্য সফল , ফেবু ফ্রেন্ডদের সাড়া পেয়েছেন বেশ। পাবেনই না বা কেন? সাথে যে ছিল বৃষ্টি ভেজা আর বড় কাটের ব্লাউজের ছবি।যেন জীবনে প্রথম কোন নারীর শরীর দেখছেন। খানিকটা সময় চাঙা রাখা যাবে ফেবু ফ্রেন্ডদের, সাথে আপনিও।

লেখকের আরও কলাম


> ঘরের নীরব করোনাযোদ্ধা মায়েরা

এটা থেকে স্ক্রল করতেই নিউজফিড আসলো “সুন্দর চেহারা নিয়ে পুলিশের কাছে, বাঘের খাচায় হরিণ” এই শিরোনামে একজনের স্ট্যাটাস, সাথে অন্য একটা ছবি। শুধু নামসর্বস্ব অনলাইন পোর্টাল কেন বলি? স্যোশাল মিডিয়ার এসব ছবি থেকে চোখ সরাতে পারেনি জনপ্রিয় ইলেকট্রনিক মিডিয়া গুলোও। এমনি একটি নিউজের লিংক ঘুরে বেড়াচ্ছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এখানেও সাবরিনার সংবাদটি উপস্থাপনের ধরণ এমন ছিল যে, যেন এইমাত্র একটি টাটকা মাছ জালে আটকা পড়েছে।

গোটা দেশের মানুষের চোখ সাবরিনার ছবিতে আর তাতে প্রয়োগ করা ভাষা আপনাকেই উপস্থাপন করছে। যেটা আপনি জ্ঞান হারিয়ে হয়তো ভুলেই বসেছেন। মিতু, মিন্নি, পাপিয়া, মিথিলা থেকে সাবরিনা। অপরাধী যদি বয় নারী। তার অপরাধকে ছাড়িয়ে পোশাক বা ব্যক্তিগত বিষয়গুলো নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে সমালোচনায়।ব্যক্তি আক্রমণে স্যোশাল মিডিয়া থেকে সংবাদমাধ্যমগুলো কেউ কম যায়না।ইদাদিং পেস্ট কালারের জামার একটা ট্রেন্ড চালু করেছে গুণী ফেবু ট্রলকারীরা। সকল ‘খারাপ’ মেয়েরই নাকি পেস্ট কালারের জামা পড়ে। আপনারা হয়তো জানেননা এই কালারের জামা অধিকাংশ মেয়েরই পছন্দ, যেমন আমারও। আপনি নিজের ঘরের বোন অথবা স্ত্রীর কাছেও পেয়ে যাবেন দুই একটা।

যার যায় কেবল সেই বুঝে। করোনা আক্রান্ত হয়ে আজ ১৫ জূলাই বুধবার ঝরে গেলো আরো ৩০ টি প্রাণ। সর্বমোট মারা যাওয়া সংখ্যা ২ হাজার ৪৫৭ জন। এই পরিবারগুলোর বোবা কান্না বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। আপনি কি তার গন্ধ পান? আক্রান্ত পরিবারগুলোর খোঁজ আমরা কতজন রাখি? অথচ এখন এগুলো নিয়ে কথা বলার কথা ছিল। পাশের করোনা আক্রান্ত ঘরটিতে খাবার আছে কিনা বা প্রতিবেশি যে পরিবারটিতে করোনা রোগী আছে বলে হেনস্থা হতে হচ্ছে তার খবর কি রাখেন? করোনা থেকে রক্ষার জন্য সচেতনতা মূলক কোন প্রচার কাজে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন কি? আপনার বাড়ির ডাক্তার, স্বাস্থকর্মী বা সম্মুখসারির করোনা যোদ্ধাদের যখন ভাড়া বাড়িতে ঢুকতে দেয়া হয়নি তখন আপনি কি এর বিরুদ্ধে কথা বলেছেন? আপনি কি খোঁজ রাখেন করোনার কারনে দেশে পাঁচ কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা এখন হুমকীর মধ্যে এবং ৫০ লাখ লাখ মানুষ চলে যেতে পারে দারিদ্রসীমার নীচে? করোনা পরবর্তী সময়ে যে বেকারত্ব দেখা দিবে সেই সংকট মোকাবেলায় করনীয় বা আপনার চিন্তাভাবনাগুলো কি তুলে ধরেছেন আপনার ফেসবুক স্ট্যাটাসে? করোনার কারনে হাজার হাজার শিশু ঝরে যাবে পড়াশোনা থেকে। সাবরিনা, আরিফ কিংবা শাহেদ এরাই কি একমাত্র অপরাধী ? এরা কি করে এমন অপরাধ করে এসেছে তার মূল জায়গা নিয়ে আমরা কতটুক ভাবি? এভাবে একজন দুজন অপরাধীর শাস্তি হয়তো হবে কিন্তু তৈরি হবে আরো অসংখ্য। এসব অপরাধীরা আগেও ছিল এখনও আছে। এসব নিয়ে ভাবনার সময় কোথায়?

যদি বলি মেয়ে অপরাধী হলে তার ছবি বা কমেন্টবক্সে যেসব কথা বলছেন, গালি দিচ্ছেন তাতে করে আপনি নিজেকেই প্রকাশ করছেন? আমরা স্যোশাল মিডিয়াতে অনেক ছবিই শেয়ার করি। সেই ছবিগুলো তোলা হয় একেবারেই নিজের ভাল লাগার জায়গা থেকে। স্যোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করলেও আপনি চাইলেই কি তার ছবি পারমিশান ছাড়া শেয়ার করতে পারেন? এক্ষেত্রে আপনি একজন সাইবার ইভটিজার হিসেবে নিজের পরিচয় প্রকাশ করছেন না তো? অথচ আপনারাই কখনও কখনও ইভটিজিংয়ের বিপক্ষে কথা বলেন। একজন মানুষ যে অপরাধ করেছে সেই অপরাধের সাথে তার পিঠখোলা ছবির কি সম্পর্ক? ফেসবুক এখন এমন একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে যেখানে প্রত্যেকেই একেকজন উকিল এবং একইসাথে বিচারক। অপরাধীর অপরাধ প্রমান হবার আগেই তার বিচার করে দেয়া হচ্ছে, ভাষার ব্যবহারে তাকে উত্যক্ত করা হচ্ছে বারবার। নিজেকে জানুন। আগে নাটকে বিবেক নামে একটা কারেক্টার ছিল যেখানে একজন মানুষের ভেতরটা কথা বলে উঠতো।একবার আয়নার সামনে দাঁড়ান, কেবল নিজের ছবি নয় ,অন্তরটা দেখুন।

লেখক: ফারাহ জাবিন শাম্মী
সম্পাদক, লুক