নীতিভ্রষ্ট ‘সাংবাদিকদের হাতে’ সাহেদরা শক্তিশালী

হাসান আল মাহমুদ

বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা করার সময়ে আমরা দেখতাম ছাত্রনেতাদের মধ্যে যারা ধান্দাবাজ টাইপের তারা প্রায়ই এটাসেটা গিফ্ট দেয়ার এবং খাওয়ানোর জন্য জোরাজোরি করতেন আমাদের। কিন্তু আমরা তো তাদের ইনটেনশন জানতাম- দুই একটা লোকদেখানো পজিটিভ কাজের প্রচার পাওয়া আর অপকর্ম করলে সংবাদ প্রকাশে ছাড় পাওয়া। ফলে খাবারের দোকানে এমন কাউকে দেখলে সেখানে আর ঢুকতামই না বিল দিয়ে দিবে এই ভয়ে। কারণ, ধান্দাবাজদের টাকায় সৌজন্যতার এককাপ চা খাইলেও তার জন্য কিছু করার দায়বোধ তৈরী হয়, নৈতিক শক্তি দুর্বল হয়; ধান্দাবাজ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অফারে ঢাকার যেসব বড় বড় সাংবাদিক বিভিন্ন উপঢৌকন গ্রহণ করেন, বিশেষ পার্টিতে নিমন্ত্রণ নেন, চিকেন ফ্রাই, লালপানি ইত্যাদি গিলেন, ফ্যামিলি ট্যুরে যান, ট্রাভেল টিকেট নেন তারা সাংবাদিকতার নৈতিকতার এই সহজপাঠটি জানেননা তা কিন্তু নয়। কারো সাথে পাঁচ-দশমিনিট কথা বললে যদি লোকটার গতিপ্রকৃতি বুঝতে পারা না যায় তাহলে তার জন্য অন্তত সাংবাদিকতা পেশা না। আমাদের সাংবাদিকদের এ গুণটি যথেষ্টই আছে। এমনকি বাংলাদেশের সাংবাদিকরা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতারও যথেষ্ট সামর্থ্য রাখেন। অর্থাৎ, কোথায় কী ঘটনা-অঘটনা ঘটে, কারা কোথায় কী করে তা আমাদের সাংবাদিকরা ভালো করেই জানেন, খবরে সেটা প্রকাশ করেন বা না করেন।

 

করোনার টেস্ট নিয়ে রিজেন্ট হাসপাতালের জোচ্চুরি প্রকাশ্যে আসার পর ফেসবুকের কল্যাণে আমরা দেখতে পেলাম ঢাকার কত বড় সাংবাদিক এবং মিডিয়ার কত কর্তাব্যক্তিদের সাথে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. শাহেদের কতটা দহরমমহরম সম্পর্ক! না, আমি এখানে কারো সাথে কেবল ছবি থাকাকেই দহরমমহরম বলছিনা। যেকেউ যেকারো সাথে ছবি তুলতে পারেন, এতে করে অপকর্মের দায় কারো উপরে বর্তায় না। সাংবাদিকরা বহু সামাজিক পার্টি, গেদারিংয়ে অংশ নেন, বহু শ্রেনী-পেশার মানুষের সাথে ওঠাবসা করেন -এগুলো স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু দহরমমহরম সম্পর্ক থাকলে সেটিকে আলাদা করে চিহ্নিত করা যায়, কমনসেন্স থাকলে। র্য্যাব রিজেন্টের কুকীর্তি ফাঁস করার আগে কোন কোন বড় বড় সাংবাদিক রিজেন্ট হাসপাতালের পক্ষে এডভারটাইজমেন্টে অংশ নিয়েছেন, শাহেদের গুণকীর্তন করে ফেসবুকে প্রচারণা চালিয়েছেন সেগুলোও এখন সামনে চলে আসছে। এ সাংবাদিকরা এতটা আলাভোলা নন যে তারা শাহেদকে গভীরভাবে জানতেননা। বরং ভালো করেই জানতেন এবং বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই শাহেদের সাথে তাদের আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।


শাহেদকে প্রায়ই বিভিন্ন টিভি টকশোতে দেখা যেত। এটা অসম্ভব যে, যারা তাকে টকশোতে ডেকে নিতেন তাদের অনেকেই শাহেদ কেমন লোক তা জানতেননা। এটা তো এখন সাধারণ মানুষজনও জানেন যে টকশোতে যারা কথা বলতে যায় তাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন আছেন যারা নিজেরা তদবির করে টকশোর অতিথি হন এবং কোন কোন টিভি স্টেশন তাদের অতিথি বানায় সরাসরি আর্থিক কিংবা পরোক্ষ বাণিজ্যিক লাভের বিবেচনায়। অর্থাৎ, সাধারণত টকশো অতিথিরা যেখানে একটা পরিমাণে সম্মানী পান টিভি স্টেশন থেকে সেখানে এই বিশেষ ধরণের অতিথিরা উল্টা টিভি চ্যানেলকে নানাভাবে সম্মানিত করেন। কারণ, টকশোতে অতিথি হতে পারা মানে তাদের ফেইস ভ্যালু অনেক বেড়ে যাওয়া, রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়া, ক্ষমতাবলয়ে সহজ প্রবেশগম্যতা পাওয়া। ফলে এটি খুব দরকারি বিষয় ধান্ধাবাজদের জন্য। সংবাদমাধ্যমে যারা কাজ করেন টকশোবাণিজ্যের গলিপথ নিয়ে তাদের রয়েছে আরও স্বচ্ছ ধারণা। শাহেদ এখানে এমন বহু চরিত্রের মধ্যে কেবল একটি চরিত্র মাত্র। তার ধান্দাবাজি প্রকাশ হওয়ায় আমরা হয়ত তাকে উপলক্ষ করে আলোচনাটা করছি।

এদেশে বহু ইতিবাচক ঘটনা ঘটে যার অনেকগুলোই হয়ত মিডিয়ার আলো পায়না। কিন্তু মিডিয়া ফলাও করে প্রচার করে এমন কিছু কিছু ইতিবাচক ঘটনার খবর আছে যেগুলোর ভেতরে থাকে আরও খবর। ধান্দাবাজ, দুবৃত্ত, বাটপারদের মধ্যে যারা একটু স্মার্ট, চালাকচতুর তারা যেটা করেন- কিছু একটা পজিটিভ ঘটনা ঘটান কিংবা কিছু টাকা-পয়সা খরচ করে একটা আকর্ষণীয় মানবিক কাজ করেন যাতে করে মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়। উদ্দেশ্য- মিডিয়ার আলোয় যদি একবার আলোকিত হতে পারা যায় তাইলে তো আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবেনা। একটা ভালো কাজের আড়ালে ২০ টা দুবৃত্তপনা নির্বিঘ্নে চালিয়ে নেয়াটা সহজ হয়ে যাবে। তখন কোন মিডিয়া চাইলেও তাকে ধরাটা আর সহজ থাকেনা। যে পজিটিভ ইমেজ তার ইতিমধ্যেই দাঁড়িয়ে গেছে তার বিরুদ্ধে যাওয়াটা সহজ ব্যাপার না। কারণ মিডিয়ার নিজেরও বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখার একটা ব্যাপার আছে। কিন্তু যে সাংবাদিক কিংবা মিডিয়া প্রচারের সুযোগটা করে দিলেন তার অবশ্যই ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের ইনটেনশন বুঝতে পারার দায় আছে। এবং কোন প্রকৃত সাংবাদিকই এতটা সহজ-সরল হননা যে, কারো কোন কাজের ইনটেনশন তিনি বুঝতে পারবেননা।

কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে মফস্বল থেকে একেবারে রাজধানী পর্যন্ত দুবৃত্তদের কিছু পোষা সাংবাদিক থাকে যারা এই দুবৃত্তদের এক টাকার ভালো কাজকে ফলাও করে প্রচার করতে সহযোগিতা করেন যাতে করে এটাকে আড়াল বানিয়ে জায়েজ করা যায় একশ’ টাকার চুরি-বাটপারি। এমনকি এই পোষা সাংবাদিকরাই মিডিয়া স্টান্টবাজির যাবতীয় বুদ্ধি বাতলে দেন- কী ধরণের কাজ করলে ভালো কাভারেজ পাওয়া যাবে। ধান্দাবাজরা এবং এসব নীতিভ্রষ্ট সাংবাদিকদের মধ্যে এসব ঘটে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও লেনদেনের ভিত্তিতে। দুর্বৃত্তদের কাছ থেকে যারা মাসোহারা খান স্বভাবতই তাদের উপর দায়িত্ব বর্তায় বিনিময়ে কিছু সাপোর্ট দেয়ার।

করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালের স্ট্যাটাস পাওয়ার পর রিজেন্ট হসপিটালকে নিয়ে এমন একটি শোরগোল ফেসবুকে দেখা গিয়েছিল- স্থানীয় কাউন্সিলরের প্ররোচনায় এলাকাবাসী নাকি করোনার চিকিৎসায় বাধা দিয়েছিল, রিজেন্ট হসপিটাল ভাঙচুর করেছিলো। আমার এখন সন্দেহ হয় এঘটনাটি সাজানো স্টান্টবাজিরই অংশ ছিল কিনা! ভাঙচুরকারী এলাকাবাসীরা আসলে কারা ছিলেন তা খুঁজে বের করতে পারলে বিষয়টা বোঝা যেত। অবাক হওয়ার কিছু নেই। ধুরন্ধর ধান্দাবাজরা কিছু সাংবাদিকের সহায়তায় এভাবেই প্রচারণা চালান।
যেসব নীতিভ্রষ্ট সাংবাদিক শাহেদের মত চোরদের হাতকে নানাভাবে শক্তিশালী করেন তাদের কুকীর্তি সবিস্তারে আলোচনা করার সময় এসেছে। আসলে সময় আসেনি, সময় চলে যাচ্ছে। সাংবাদিকতার মত মহান পেশাটি বাংলাদেশে অবনমনের শীর্ষ চুড়ায় পৌঁছার আগেই। অন্তত যে সাংবাদিকরা ক্যারিয়ারে অন্য আরও অনেক সম্ভাবনা থাকা স্বত্বেও এই ঝুঁকিপূর্ণ পিচ্ছিল পথটি বেছে নিয়েছেন মর্যাদাপূর্ণভাবে বাঁচবেন বলে, তাদের উপর এটা দায়িত্ব। অন্যের অপকর্মের ভার থেকে দায়মুক্তি পেতে চাইলে। যাতে করে বাটপার শাহেদদের সাথে সাথে তাদের সহচর অসৎ সাংবাদিকদেরও কোণঠাসা করে ফেলা যায়।

লেখক: হাসান আল মাহমুদ, সংবাদকর্মী