আমাদের ‘বিসিএস সাংবাদিকতা’!

মোহাম্মদ ওমর ফারুক

একবার স্কুলে শিক্ষক জানতে চেয়েছিলো। জীবনে কে কি হতে চায়। ক্লাসে প্রায় ৮২ জন শিক্ষার্থী ছিলো। এর মধ্যে অর্ধেক ছিলো ডাক্তার , ইঞ্জিনিয়ার, বাকি অর্ধেক বিসিএস দিয়ে বড় চাকরি করবে। আর আমি হাত তুলেছিলাম সাংবাদিক হবো। শিক্ষক ও সহপাঠিরা খুব অবাক হয়েছিলো সাংবাদিক হবো বলে। সবাই হাসাহাসি করছিলো। হাইস্কুলে পড়ার সময় টুকটাক লেখালেখি করতাম,একটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করতাম। কলেজে পড়ার সময় স্থানীয় পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছি। তখন ওই ছোট্ট বয়সে কয়েকটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট করেছি পরে যেগুলো খুব ইমপ্যাক্ট পড়েছিলো সমাজে। স্থানীয় প্রশাসন আমার রিপোর্টের ভিত্তিতে অনেক ব্যবস্থাও নিয়েছিলো। যেটা শুধু সাংবাদিকতা করেছি বলেই পেরেছি।

আরও পড়ুন    

আবেগ, বিজ্ঞান ও গণমাধ্যম

এখন আমার বয়স ২৪ বছর ৬ মাস। আমি একটি পত্রিকার অপরাধ বিষয়ক প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করছি। আমি এখনো বুকে হাতে দিয়ে বলতে পারবো, চাইলে প্রমাণ দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারবো, অনেক বিসিএস ক্যাডারের চেয়ে আমি অনেক বেশি কাজ করেছি। যা সমাজকে পরিবর্তন করতে সাহায্য করেছে। জানি না ভাগ্য কোথায় নিয়ে ঠেকায়! আমি চাইলে আরো পাঁচ থেকে ছয়টি বিসিএস দিতে পারবো। আমার কথা কেন বল্লাম তা পরে বলছি। বিসিএস স্রেফ একটি চাকরি। হাতি ঘোড়ার মতো কিছু নয়। এখানে সৃজনশীলতার কিছু নেই। আমি বিসিএসকে ছোট করে দেখছি না। দেখার সুযোগও নেই। এখানে যা আছে মুখস্ত নির্ভরতা। তবে যারা বিসিএস দেন,তারা খুব পরিশ্রমী হন। সারাদিন বই নিয়ে বসে থাকেন। যেখানে মুখস্ত করতে হয় উগান্ডার প্রধানমন্ত্রীর নাম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিনগুলো থেকে লাইব্রেরীই তাদের ঘরবাড়ি। হয়তো কেউ রসায়নে পড়ছেন বা ইসলাম ইতিহাসে। কিন্তু যদি লক্ষ্য থাকে বিসিএস , তাহলে কে কোন বিভাগে পড়লো সেটা ব্যাপারই না। কেউ কেউ তো ঠাট্টা করেও দাবী করে বসেন, বিশ্বদ্যালয়গুলোতে সব বিভাগ তুলে দিয়ে যেন বিসিএস নামে একটি বিভাগ খোলা হয়। যেখানে এমপি থ্রি’র মতো বিষয়গুলো পড়াবে। এই দাবী কিন্তু আমার অযৌক্তিক মনে হয়। যেখানে বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনা করেও সেই পড়াশোনা কোনো কাজে লাগাতে পারছে না। সেখানে এমন বিভাগ খোলা সময়ের দাবী। তবে আমি আজ সেটা নিয়ে লিখতে বসিনি। আজ লিখতে বসেছি, বিসিএস পাশ ছেলে মেয়েদের নিয়ে গণমাধ্যমের উন্মদনার কথা। অদ্ভুত অদ্ভুত শিরোনাম দিয়ে সংবাদগুলোকে ভাইরাল করার কথা।

প্রথমসারির পত্রিকা বা অনলাইন থেকে শুরু এই আওয়াজ সর্বত্রই। এই যেমন গত কয়েকদিন ধরে ফেসবুকের নিউজফিডে সংবাদগুলো ভেসে বেড়াচ্ছিলো , সদ্য পাশ করা কোনো ক্যাডার জীবনে ফোন ব্যবহার করেননি। অথবা বন্ধু ফেসবুক থেকে আনফ্রেন্ড করে দিয়েছেন , জেদ ধরে তিনি ক্যাডার হয়ে গেছেন। কোচং ফি ছাড়া ডাবল বিসিএস । স্বামী স্ত্রীর বিসিএস জয় এরকম আরো শত শত উদাহরন দেয়া যাবে। সাংবাদিকতার ছাত্র হিসেবে বলতে পারি এসবে কোনো সংবাদের রসদ নেই। তারপরেও অনলাইন বা পত্রিকার এসব বাড়াবাড়ি অসুস্থ প্রতিযোগিতা ছাড়া কিছুই মনে হয়নি। এসব সংবাদ যে শুধু সংবাদ তাই নয়, এমন সংবাদ বিসিএস এর প্রতি তরুণদের আর্কষণ বা ক্রজে বাড়াচ্ছে। এই যে ক্লাসে আমি বলেছিলাম সাংবাদিক হবো, এই কথা শুনে সবাই হাসাহাসি করলো। সেটা কিন্তু এই সংবাদের ফল। আগে তেমন একটা অনলাইনে না থাকলেও এসব বিষয় নিয়ে তখনো পত্রিকায় রিপোর্ট হতো । ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বলা হতো। বোঝানো হতো জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিৎ বিসিএস। এখানে ক্ষমতা আছে, আভিজাত্য । কিন্তু আর্দশগত জায়গা থেকে বলতে গেলে,পৃথিবীতে কারোই কোনো ক্ষমতা নেই, যদি সেটা সে অপব্যবহার না করে। আক্ষরিক অর্থে ক্ষমতা বলতে কিছু নেই, যেটা আছে –কাজরে প্রতি দায়বদ্ধতা বা ‘জব রেস্পন্সিবিলিটি। প্রায় কানে ভাসে ক্ষমতার জন্যই মানুষ বিসিএস দেয়, সাথে একটি নিরাপদ জীবন।

স্বাধীনতার পরে হাজার হাজার বিসিএস ক্যাডার হয়েছে। তাদের ক’জনকে মনে রেখেছেন দেশের মানুষ। কিন্তু তারপরেও এখানে আগ্রহরে কমতি নেই। প্রতিটি পরীক্ষার লাখ দশেক আবেদন পড়ে। ঘুরেফিরে সেই গণমাধ্যমের কথাই আসে। মানুষ গণমাধ্যম বিশ্বাস করে। মানুষ মনে করে পত্রিকা বা টেলিভিশনে দেখা যাওয়া মানুষটিই দুনিয়ার সেরা মানুষ। আমরা যখন বিসিএস পাশ করা একজন ব্যক্তিতে নিয়ে অদ্ভুত শিরোনাম দিয়ে তেলতেলে একটি রিপোর্ট করি, তখন সেই রিপোর্টে একটি মেডিকেল শিক্ষার্থী বা বুয়েটের শিক্ষার্থী নিজেকে সেই জায়গায় স্বপ্ন দেখে। মেধাবী শিক্ষার্থী যে স্বপ্ন দেখতো অনেক বড় গবেষক হবে, এসব রিপোর্টে সে স্বপ্ন দেখে বিসিএস ক্যাডার। ফলে মেডিকেলের শিক্ষার্থী হয় এডমিন ক্যাডার! অথচ তাদের পিছনে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা শুধু অপচয় হলো। এগুলো আমার আপনার টাকা। কিন্তু এর দায়ভার কি গণমাধ্যম কখনো এড়াতে পারবে? এসব বিষয় নিয়েও অনেকে ঠাট্টা করেন, বলেন প্রতিটি গণমাধ্যমে একটি বিট খোলা হোক যেটি ‘বিসিএস সাফল্য সাংবাদিকতা’ বিট!

অথচ গণমাধ্যমগুলো অনুসন্ধানী বা গবেষণামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারতো, কেন বিসিএস এ ঝুঁকছে তরুন তরুনীরা। কেন ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার থেকে শুরু করে প্রথম বর্ষের ছেলেমেয়েরা বিসিএস নিয়ে বসে যাচ্ছে । সেসব নিয়ে গবেষণাধর্মী রিপোর্ট হতে পারতো। এসব না করে তার বিপরীত কে বিসিএস ক্যাডার হলো, কে প্রথম বা দি¦তীয় হলো এসব নিয়ে একের পর এক সংবাদ করছি। তার ওপরে অদ্ভুত যত শিরোনাম দিয়ে। গণমাধ্যমের এমন বাড়াবাড়িতে মনে হয়, জীবন মানেই বিসিএস। আমরা এটাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বলেুন বানিয়েছি নিজেদের মতো করে। বরং বিসিএস যাদের ধ্যান জ্ঞান তাদের স্বপ্ন যে খুব একটা বড় এটা ভাবা বোকামী। বরং এসব মেধাবীরা যখন একজন উদ্যোক্তা হতো, গবেষক হতো তারা আরো ভালো কিছু করতে পারতো। এসবের ফল , গত কয়েক দশকে দেশে কোনো সৃজনশীল মানুষ বের হয়নি, একজন তুখোর বিজ্ঞানী বের হয়নি, দেশে ভালো কোনো গবেষণা হয়নি। অন্যের গবেষণা বা আবিস্কার ধার করে চলতে হয় আমাদের।

এবার আসি রিপোর্টারদের নিয়ে ,সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, যারা এসব বিষয়ে গণমাধ্যমে রিপোর্ট করছেন তাদের বয়সও কিন্তু ওই ক্যাডারদের সমান বা আশেপাশে। যে রিপোর্টার অন্যের সফল ক্যারিয়ার নিয়ে সংবাদটি লিখলো, সে কিন্তু তার নিজের ক্যারিয়ার থেকে দূরে সরে গেলো। একই তো সংবাদের রসদ ছাড়া সংবাদ তার ওপরে এসব সংবাদ রিপোর্টারের ক্যারিয়ারে যোগ করার মতো কোনো সংবাদ না । আবার সব সংবাদ যে ক্যারিয়ারে যোগ হবে তাও কোনো কথা না। তারপরে যে সংবাদটিতে নিজের বাইলাইন যাবে, সে সংবাদটি পড়েও কিন্তু মানুষ ওই রিপোর্টারের জানাশুনা , সেন্স, কমনসেন্স বিবেচনা করবে। বাইলাইনে না গেলেও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে পাঠকের ধারণা খারাপ হতে পারে। আগামীর সাংবাদিকতা টিকে থাকবে শুধু অনুসন্ধান বা গবেষনাধর্মী সংবাদের ওপর ভিত্তি করে। অথচ ওই প্রতিবেদক নিজেরাও নিজের দিকে নজর দিতে পারতো, ভালো সংবাদের খোঁজ রাখতে পারতো। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বা গবেষণাধর্মী সাংবাদিকতা করতে পারতো। এতে কমপক্ষে নিজের ক্যারিয়ারটা পাকাপোক্ত হতো। এসব তেলতেলে রিপোর্ট না করে, বিসিএস নিয়েই কাজ করতে পারতো, বেকারদের চাকরি সমস্যা নিয়ে কাজ করতে পারতো। সবাই বিসিএসের দিকে ঝুঁকে যাওয়ার ফলে দেশের কি ক্ষতি হচ্ছে,কি ইমপ্যাক্ট পড়ছে সেগুলো নিয়ে কাজ করতে পারতো। তখন সাংবাদিকতা অর্থবহ হতো।

আমি অস্বীকার করছি না ,একজন বিসিএস ক্যাডারকে নিয়েও সংবাদ হতে পারে। প্রতিকূলতায় জীবন সংগ্রাম করে, যে বিসিএস ক্যাডার হয়েছে। তাকে নিয়ে সংবাদ করলে হয়তো কখনো কখনো অন্যদের জন্য উৎসাহের হতে পারে। এসব বিষয় নিয়ে সংবাদ হতে পারে। কিন্তু রাতদিন পড়াশোনা করে ,মুখস্ত করে বিসিএস পাশ করেছে সেটা নিয়ে সংবাদের কি আছে? বিসিএস অন্য আট দশটি সরকারি চাকরির মতো।কিন্তু আমরা কি অন্য চাকরি প্রাপ্ত কাউকে নিয়ে কোনোদিন সংবাদ করেছি? যদি না হয় তাহলে বিসিএস নিয়ে আমাদের গণমাধ্যমের এতো উন্মদনা কেন?

লেখক: মোহাম্মদ ওমর ফারুক
অপরাধ বিষয়ক প্রতিবেদক,মানবজমিন