আবেগ, বিজ্ঞান ও গণমাধ্যম

অধ্যাপক মুনীরউদ্দিন আহমেদ

গত কয়েক দিন ধরে ফেসবুক, ম্যাসেন্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, বিভিন্ন মিডিয়া ঘেঁটে যা উদ্ধার করলাম, তাতে আমি রীতিমতো পাজেল্ড। বুঝতে পারছি না বানের জলের মতো ভেসে আসা কোন সংবাদ বা তথ্যটি গ্রহণযোগ্য আর কোনটি বর্জনীয়। একটু বিচার বুদ্ধি প্রয়োগ না করেই কিছু মানুষ হাতে যা আসছে তা-ই শেয়ার করে দিচ্ছে এবং অন্যদেরও তা শেয়ার করার অনুরোধ জানাচ্ছে। এসব তথ্য বা সংবাদের বেশির ভাগই করোনা সংক্রান্ত। বেশির ভাগ ভুয়া তথ্য বা সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে জনমনে প্রচন্ড নেতিবাচক বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে।

দুয়েকটি ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাথায় ভুত চেপে বসেছে। সস্তা জনপ্রিয়তা ও আর্থিক ফায়দা অর্জনের জন্য এই মিডিয়াগুলো মরিয়া হয়ে মানুষ গোগ্রাসে গিলবে এমন যা পাচ্ছে তাই প্রচার করে বেড়াচ্ছে। আমাদের দেশের প্রচারমাধ্যমগুলো বুঝে ফেলেছে – এদেশের মানুষ মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কী দেখতে বা শুনতে বেশি পছন্দ করে। যৌন কেলেঙ্কারি, পরকীয়া, ধর্ষণ, নায়ক-নায়িকাদের কেলেঙ্কারি, রাজনীতিবিদদের(মহিলা হলে তো কোনো কথাই নেই)অনৈতিক দুষ্কর্ম্ম, বাঙালির উদ্ভট আবিষ্কারজাতীয় খবর মিডিয়ার শিরোনাম হয়। আমরা সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের ভালোবাসি। ভিলেইনদের ঘৃণা করি। নায়ক নায়িকাকে রক্ষা করার জন্য এক ঘুষিতে ২০/৩০ জন পালোয়ান গুন্ডাকে ধরাশায়ী করে ফেললে আমরা হাততালি দিয়ে সিনেমা হল ফাটিয়ে ফেলি। আমরা বাস্তবের ধার ধারি না, অযৌক্তিক বদ্ধধারণার জালে নিজকে জড়িয়ে রাখি, আমরা যুক্তি বুঝি না, আবেগে ফেটে পড়ি। বিজ্ঞান বুঝি না, মনে-প্রাণে অলৌকিকতা বিশ্বাস করি।

লেখকের আরও কলাম


»স্ট্যান্টবাজির সাংবাদিকতা এবং ‘ডেক্সামেথাসোন’

» করোনার ‘ওষুধ’ ও মিডিয়া ‘সন্ত্রাস’

এটা কিন্তু আমাদের দোষ নয়। আমরা ছোটকাল থেকে এভাবে গড়ে উঠেছি। এদেশে অল্পসংখ্যক মানুষ জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা করে। সাধারণ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত শিক্ষা আমরা ছোটকাল রপ্ত করতে পারিনি। আর সে কারণে কল্পনাবিলাশ, অহেতুক আবেগ, অযৌক্তিক ও অশালীন আচরণ ও অবাস্তব চিন্তা-চেতনা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে চরমভাবে প্রভাবান্বিত করে।

আমরা সবসময় নিজেদের পারফেক্ট ভাবি। আমাদের দোষ-ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা আমাদের নজর এড়িয়ে যায়। কিন্তু কোনো মানুষই পারফেক্ট নয়। সবার কিছু না কিছু দোষ-ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা থাকে। আমাদের অবাস্তব ও একগুঁয়েমীর কারণে আমরা সমালোচনা সহ্য করতে পারি না। কিন্তু সমালোচনা না থাকলে মানুষ পরিশুদ্ধ হয় না, সমাজ বা রাষ্ট্র পরিশুদ্ধ হয় না।

ফিরে আসি করোনায়। আমরা চাই অচিরেই করোনার ভ্যাক্সিন জনগণের হাতে আসুক। এবং তা আসুক বাংলাদেশ থেকে। বাংলাদেশী বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও দেশপ্রেমের মধ্য দিয়ে। কিন্তু অবাস্তব ও আবেগী হয়ে ম্যাচিউরড হওয়ার আগেই বাচ্চাকে জোর করে প্রসব করিয়ে ফেলবেন না। তাহলে এই বাচ্চা বাচ্চাই থেকে যাবে, কোনো কাজে আসবে না।

লেখক: ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়