গণমাধ্যমে অপেশাদারিত্ব বনাম সংবাদকর্মীর নিরাপত্তা

কাজী আনিছ

‘সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকর্মীদের ‌নিরাপত্তা’ পৃথিবী জুড়ে বহুল উচ্চারিত ও আলোচিত বিষয়। রাষ্ট্রের সঙ্গে গণমাধ্যমের মিথস্ক্রিয়া, আন্ত:সম্পর্ক, স্বাধীন সাংবাদিকতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা প্রভৃতি বিষয় বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিষয়টি অবধারিতভাবেই আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে। এ আলোচনা আন্তর্জাতিক, জাতীয় ও স্থানীয়-সব পর্যায়ে। অর্থাৎ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ‘সাংবাদিকদেও নিরাপত্তা’ দেখা হয় সামষ্টিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে, রাষ্ট্রীয় প্রেক্ষাপটে।

ব্যস্টিক দৃষ্টিকোণ তথা চাকরিরত গণমাধ্যম কর্মীদের পরিচালনা, তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক, প্রাতিষ্ঠানিক পেশাদারিত্ব প্রভৃতি ক্ষেত্রে গণমাধ্যম মালিকদের ভূমিকা কেমন এবং কী মাত্রায়-সেই দৃষ্টিকোণ থেকেও নিরাপত্তার বিষয়টি বেশি আলোচনার দাবি রাখে। আলোচনা চলে বটে, তবে বিক্ষিপ্ত। অপেশাদারিত্ব, চাকরিচ্যুতি, অপর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা প্রভৃতি বিষয়ে মাঝে মাঝে কিছু সভা-সেমিনার, গবষেণা প্রবন্ধ, কয়েকটি মানববন্ধন বা প্রতিবাদ ইত্যাদিতে আলোচনা হয়। কিন্তু ওই পর্যন্তই। আশু সমাধানের জন্য জোড়ালো কোনো আলোচনা কখনও হয়নি। নানান স্বার্থগত দ্বন্দ্বের কারণে এ আলোচনার তেমন কোনো ব্যাপ্তিও ঘটেনি। ফলে, পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি বরং সমস্যা আরো ঘনীভূত হয়েছে। অথচ এ কথা অনস্বীকার্য যে, ব্যস্টিক পর্যায়ের ‘নিরাপত্তা’ বিঘ্নিত হলে সামষ্টিক পর্যায়ের নিরাপত্তায়তা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।

করোনাকালীন বিশেষ করে শুরুর দিকে ব্যস্টিক পর্যায়ের আলোচনা ব্যাপকতা লাভ করে, ভিন্ন আঙ্গিকে, ভিন্নআবহে। সামষ্টিক পর্যায়ে নিরাপত্তার আলোচনা চলে যেখানে হত্যা, হয়রানি, হুমকি প্রভৃতি নিয়ে, করোনার সময় ব্যস্টিক পর্যায়ে তা আলোচিত হয়েছে ও হচ্ছে ‘ভাইরাস কর্তৃক সাংবাদিকের আক্রান্ত হওয়া বা মৃত্যু’নিয়ে। সামষ্টিক পর্যায়ের নিরাপত্তার দায়িত্ব তাই যেমন বর্তায় রাষ্ট্রের উপর, তেমনি করোনাকালীন ব্যস্টিক নিরাপত্তার দায়িত্ব বেশি বর্তায় গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান তথা মালিকের উপর।

ইউনেস্কো তাই সকল গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষকে করোনাকালীন সংবাদকর্মীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কারণ, দুর্যোগ, মহামারি প্রভৃতি ক্ষেত্রে মানুষকে সচেতন করার জন্য অবাধ ও নিরবচ্ছিন্ন তথ্য প্রবাহে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। করোনা মহামারিতে গণমাধ্যমের গুরুত্ব আরো বেশি অনুভূত হয়েছে। কারণ, তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের সুযোগে ভুয়া তথ্যের ‘মহামারি’ও সৃষ্টি হয়েছে। একে বলা হচ্ছে, ‘ডিসইনফোমেডিক’। তাই, করোনার সময় সংবাদকর্মীদের মোটামুটি তিনটি চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে কাজ করতে হয়েছে। এক. নিজের জীবনের নিরাপত্তা, দুই. জনগণের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং তিন. ‘ডিসইনফোমেডিক’-এর বিরুদ্ধে লড়াই। জনসংখ্যার ঘনত্ব, মিডিয়া লিটারেসির অভাব, কুসংস্কারে বিশ্বাস প্রভৃতি কারণে উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশের সংবাদকর্মীদের জন্য এ চ্যালেঞ্জ গুলো মোকাবিলা করা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়েছে। তাই এ তিনটি কাজে আরো বেশি সমর্থন ও সহায়তা দেওয়ার দায়িত্ব ছিল গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান গুলোর।

সম্প্রতি আমি, একজন গণমাধ্যমকর্মী ও কয়েকজন সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী দেশের ২৪টি গণমাধ্যমের ৪৮ জন সংবাদকর্মীর উপর প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রদত্ত করোনাকালীন নিরাপত্তা নিয়ে যে গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করেছি, তা ফলাফল আশাব্যঞ্জক নয়। গুটি কতেক গণমাধ্যম নিরাপত্তা প্রদানে সুব্যবস্থাপনা, আন্তরিকতা ও প্রচেষ্টা থাকলেও অধিকাংশ গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। গণমাধ্যমকর্মীরা সবচেয়ে বেশি শিকার হয়েছে আর্থিক অব্যবস্থাপনা তথা অনিয়মিত বেতন ও অযথাযথ বোনাস প্রাপ্তির। তবু, আমরা এর নেপথ্যে করোনার মতো ভাইরাসের সঙ্গে মানিয়ে চলার অনভিজ্ঞতা, বিশ্বব্যাপী অর্থনীতির উপর করোনার নেতিবাচক প্রভাব ইত্যাদি বিষয়কে এসব অব্যবস্থাপনার কারণ হিসেবে অনুমান করেছি।

কিন্তু হাল আমলে, কয়েকটি গণমাধ্যমে সংবাদকর্মীদের বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো এবং ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্তের খবর অযৌক্তিক, অমানবিক ও বেদনাদায়ক মনে হয়েছে। এমন সিদ্ধান্ত নিলে তা হবে আত্মঘাতী এবং দেশেরজন্য অমঙ্গলজনক। কারণ, দুর্যোগব্যবস্থাপনার নামে অনেক সংবাদকর্মীদের দুর্যোগে ফেলে দিয়ে দুর্যোগকে আরো ঘনীভূত করা হবে। শুধু সংবাদকর্মী নয়, তাদের পরিবারের সদস্যদেরকেও অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হবে। ব্যয় সংকোচনের নামে অনেক সংবাদকর্মীর আয়ের পথকে বন্ধ করে দেওয়া হবে। আর এমন এক সময়ে তা করা হবে যখন অন্য কোথাও চাকরি প্রাপ্তির সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।

অনেকেই যুক্তি দেখান যে, বিশ্বে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এমন ছাঁটাই হয়েছে এবং হচ্ছে। এমন যুক্তি মেনে নিচ্ছি। কিন্তু যে উদাহরণগুলো দেওয়া হয় সেগুলোর সবই উন্নত বিশ্বের। সেখানে চাকরিচ্যুত কোনো ব্যক্তির পরবর্তী চাকরি প্রাপ্তির নিশ্চয়তা যেমন আছে, তেমনি ব্যক্তি পর্যায়ে দায়িত্ব নেওয়ার মতো সেই রাষ্ট্রীয় কাঠামো আছে। সেখানে চাকরিচ্যুতির ক্ষেত্রেও যথেষ্ট পেশাদারিত্ব ও মানবিকতা বজায় রাখা হয়। যা আমাদের দেশে নেই বললেই চলে। থাকলে কীভাবে এ করোনার সময় বিনা বেতনে অসংখ্য সংবাদকর্মীকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো যায়! কীভাবে সংবাদকর্মীদের অজ্ঞাতে ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। সুতরাং, বহির্বিশ্বে উদাহরণ টেনে ছাঁটাই প্রক্রিয়া চালালে তা হবে গণমাধ্যমে অপেশাদারিত্ব বজায় রাখার জন্য করোনা ও বহির্বিশ্ব সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করার শামিল।

আমরা অস্বীকার করছিনা, করোনার কারণে সর্বত্র অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধন হয়েছে। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানও এর বাইরে নয়। কিন্তু সঙ্গে এটাও দেখতে হবে যে, মাত্র কয়েক মাসের ক্ষতি দীর্ঘ বছরের লাভকে এতটা ম্লান করেনি যে, কর্তৃপক্ষকে কর্মী ছাঁটাইয়ের মতো প্রাচীন ও সনাতন এক পদ্ধতি নিতে হবে। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির যুগে গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ব্যয় সংকোচন, দুর্যোগে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি বিষয়ে বিভিন্ন পদ্ধতি আলোচিত হচ্ছে। সেগুলো প্রয়োগ না করে এক তরফা ছাঁটাই দুঃখজনক।

এ সময়ে একজন সংবাদকর্মীর সবচেয়ে বড় নিরাপত্তাহচ্ছে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। সবাই মিলে করোনাকে মোকাবিলা করার যখন দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হচ্ছে, সেখানে গণমাধ্যমকর্মীদের ছাঁটাই করা হলে তা হবে ওই প্রত্যয়কে ভঙ্গ করার শামিল। তাই, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে নিয়েই সব ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে। এক তরফা চাপিয়ে দেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়, আলোচনা-বৈঠক করে সমস্যার সমাধান বের করতে হবে।

যদিও অপেশাদারিত্ব, হুটহাট ছাঁটাই করোনাকালীন ঘটনা নয়, আবহমানকাল ধরে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোতে তা চর্চিত হয়ে আসছে। আগেই বলা হয়েছে, বিক্ষিপ্ত ভাবে কিছু আলোচনায় এ অপেশাদারিত্বের কথা ওঠে আসলেও, তা সমাধানে তেমন কোনে কার্যকর ভূমিকা পরিলক্ষিত হয়নি। গণমাধ্যমের এ অপেশারিত্ব বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা শিক্ষাকেও ব্যাহত করছে। তরুণ প্রজন্মের বেশির ভাগই ভবিষ্যতে নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে দেখতে চায় না। এমন পরিস্থিতি চললে অদূর ভবিষ্যতে মেধাশূন্য হয়ে পড়বে এ পেশা। ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্র, সমাজ ও সাংবাদিকতা শিক্ষা। তাই, করোনাকালীন যেহেতু এ নিয়ে আবারো কথা উঠেছে, আলোচনা-তর্ক-বিতর্ক চলছে, আশাকরি রাষ্ট্রীয়নীতি-নির্ধারক, গণমাধ্যম মালিক, সাংবাদিক সংগঠনসহ সচেতন নাগরিকেরা মিলে গণমাধ্যমের অপেশাদারিত্ব দূর করার আশুসমাধান গ্রহণ করবেন। আর এক্ষেত্রে গণমাধ্যম মালিকদেরকেই মুখ্য ও আন্তরিক ভূমিকা পালন করতে হবে।আমরা বিশ্বাস করি, ব্যস্টিক পর্যায়ে তথা ঘরে সাংবাদিকেরা নিরাপদ থাকলে, সামষ্টিক পর্যায়েও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ জোরদার হবে।

লেখক: কাজী আনিছ
প্রভাষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।