কী ‘অসহায়’ সাংবাদিকতা!

সৈয়দ ইফতেখার

করোনার এই সময়ে চাকরি হারিয়েছেন বহু সংবাদকর্মী। অন্য আর আট-দশটা পেশার সংকটের মতো সাংবাদিকতা পেশাতেও কোভিডকালের সংকট দেখা দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অন্যদের চাকরি গেলে সংবাদ হয়, অন্যরা দুরাবস্থায় থাকলে মানবিক প্রতিবেদন প্রচার-প্রকাশ পায়। কিন্তু সাংবাদিকরা কেউ কষ্টে দিন কাটালে সংবাদ তো দূরের কথা, অনেক প্রিয়জনও শত্রু বনে যান (পাছে ধার না চেয়ে বসে এই ভয়ে)!

সংকটে চাকরি হারানো, পেশাগত অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতাসহ এ পেশার নানান রকম সমস্যা তো রয়েছেই। কিন্তু গেলো কদিন ধরে মাথায় ঘুরছে, বিনা চিকিৎসায় সাংবাদিকের মৃত্যুর বিষয়টি! মানতে পারছি না যে! বলছি আলোকচিত্রী, ফটো সাংবাদিক রেহানা আক্তারের কথা। বড় অকালে চলে গেছেন তিনি, তাও আবার ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুকে বরণ করে!

রেহানা আক্তার আমার দীর্ঘদিনের সহকর্মী ছিলেন। অনেকটা সময় তাকে পেয়েছি বাংলানিউজে। ২০১৪ সালে দৈনিক আমাদের অর্থনীতি থেকে যোগ দিলাম বসুন্ধরা গ্রুপের বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর ডটকমে। বার্তাকক্ষে। সম্পাদক তখন অনলাইন সাংবাদিকতার পুরোধা ব্যক্তিত্ব আলমগীর হোসেন। সেসময় খুব কাছ থেকে দেখেছি রেহানা আপা কাজ। তিনি পরিশ্রমী মানুষ— এক কথায় তাকে নিয়ে এটাই বলেন সবাই। ছিল না অহংকার, সাদা মনের মানুষ যাকে বলে। অফিস রাজনীতির বাইরে একেবারেই অজাতশত্রু।

এমন একটি মানুষের করুণ মৃত্যুতে কষ্টের পাল্লাটা ভারী আরও বেশি। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন, অথচ ঠিক মতো চিকিৎসা হলো না অর্থের অভাবে। রেহানা আক্তারের ভাই ফোজিত শেখ বাবু (আলোকিত মিডিয়ায় কর্মরত) তার পাওনা টাকা চেয়ে ঢাকা আহ্‌ছানিয়া মিশন ও আলোকিত মিডিয়ার চেয়ারম্যান কাজী রফিকুল আলমের কাছে একাধিকবার আবেদন করেন। যার সেই হাতে লেখা আবেদনপত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়েছে ব্যাপকভাবে, যা লেখা হয় ২২শে মে। টাকা যদি না পান, তাহলে অন্তত যেন তার প্রতিষ্ঠানে (আহ্‌ছানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতাল, ঢাকা) চিকিৎসা করানো হয়। কিন্তু সেটিতেও কর্ণপাত করেনি কাজী রফিকুল আলম। এভাবে অর্থ সংকটে ৩২ বছর বয়সে ২৯শে জুন (সোমবার) সন্ধ্যায় নিজের বাসায় মারা যান দৈনিক ইত্তেফাকের ফটো সাংবাদিক রেহানা আক্তার। চিকিৎসার জন্য দরকার হচ্ছিল অনেক টাকার। তার ভাই জানান, রেহানাকে বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন, কিন্তু পারলেন না!

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই মৃত্যুর দায় কার! এই আধুনিক যুগে এসেও কেন মানুষকে সঠিক চিকিৎসার অভাবে মরতে হবে! বাংলাদেশ তো এখন ডিজিটাল, অথচ কেন অনুন্নত যুগের মতো আমাদের পিছিয়ে যেতে হচ্ছে রোজ রোজ।

একজন সংগ্রামী নারী সাংবাদিককে হারালাম আমরা, তার সন্তানের ভরণপোষণ এখন কে করবে! তার মৃত্যু নিয়ে বাংলানিউজের আরেক সহকর্মী রাইসুল ইসলাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, ‘রেহেনা মরে প্রমাণ করে গেলো যে, কতটা নিষ্ঠুর কতোটা অমানবিক এই জগত। একজন গার্মেন্টস শ্রমিকেরও কিছু অধিকার থাকে, কিন্তু সাধারণ একজন সাংবাদিকের কিছুই থাকে না। রেহেনার সন্তান দুটোর জন্য কিছু করা যা কিনা, সেটি ভাবতে হবে এখন। সে ব্যাপারে তার সহকর্মীসহ সাধারণ সাংবাদিকরা, আর সাংবাদিক বড় ভাই-বোনদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এগিয়ে আসতে হবে রেহানার প্রতিষ্ঠান ইত্তেফাককে। আমাদের পাশে আমাদেরই দাঁড়াতে হবে। কারণ এদেশে দুস্থ সাংবাদিক হিসেবে সরকারি সহায়তা পেতে যে পরিমাণ ধনী হতে হয়, সে পরিমাণ ধন সম্পদের মালিক আমরা কখনই হতে পারবো না।’

আসলে দিন দিন সাংবাদিকতা কঠিন হচ্ছে। কঠিন হচ্ছে কাজে নয়, বেঁচে থাকার তাগিদে। কত শক্তিশালীই না এই পেশা! অথচ এমনও সময় আসে, যখন এ পেশায় থেকে মানুষ কিছুই করতে পারে না, তখন তাকে অসহায় সাংবাদিকতা বলে।

লেখক: সৈয়দ ইফতেখার, গণমাধ্যমকর্মী।