করোনাকালে সৌদি গণমাধ্যমের ভূমিকা

আরিফুর রহমান

বলতে বাধা নেই, করোনা কালে যে কোন তাৎক্ষনিক খবর পেতে আমাদের দৃষ্টি ছিলো সৌদিআরবের জাতীয় দৈনিকগুলোর অনলাইন মাধ্যমে। প্রতি মুহুর্তের খবর নিতে ফেইসবুক, টুইটারে শেয়ার করা সৌদি গণমাধ্যমগুলো এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের করোনা আপডেট পোষ্ট থেকে প্রাপ্ত তথ্যেই আমাদের নির্ভরতা ছিলো। এছাড়া সৌদি প্রেস এজেন্সিতে দেশটির যে কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের খবরগুলো সবার আগে পেতাম। করোনার দিনগুলি বলতে গত তিন মাস যে হারে প্রতিদিনের আপডেট জানতে অনলাইনের প্রতি নির্ভরশীল ছিলাম, অতীতে তা হয়নি। হয়তো তখন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু থাকলে অথবা বিদেশ বিভূঁইয়ে আমাদের প্রবাসীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোন খবর থাকলে খুটিয়ে খুটিয়ে তা দেখতাম। তবে মার্চ মাসের শুরুতে সৌদি গণমাধ্যমগুলোর বরাতে প্রতিদিন মহামারী করোনার যে আপডেট প্রকাশিত হতো, তা ছিলো আমাদের জানার মূল মাধ্যম। প্রতিদিনের নির্ভুল তথ্যের শক্তিশালী ব্যবহার করে জনগনকে জানানোর জন্য দেশটির গণমাধ্যম কর্মীরা নিজেদের উজাড় করে দিয়েছেন প্রতিটি সংবাদ প্রকাশে।

সৌদিআরব মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বৃহদায়তনের একটি দেশ। রাজতন্ত্রের শাসন ব্যবস্থা সম্বলিত এই দেশটির স্থানীয় প্রশাসনকে দেখেছি প্রতি মুহুর্তে জনগনের কল্যানে নেওয়া যে কোন সিদ্ধান্তের দ্রুত বাস্তবায়ন করতে। সৌদিআরবের মহামান্য বাদশার নির্দেশে দেশটিতে বসবাসরত সকল দেশের প্রবাসীদের সমস্যা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিলো কল্যানমূলক সব উদ্যোগ। করোনা রোগে আক্রান্ত সকলের জন্য চিকিৎসা সেবা ফ্রি, ভিসা নবায়ন, রেসিডেন্ট কার্ডের (ইকামা) মেয়াদ বৃদ্ধি সহ সব তথ্যই প্রতিদিনের প্রত্রিকায় প্রকাশের প্রধান বিষয়বস্তু ছিলো। লকডাউনে ঘরে থাকা প্রবাসীদের কর্মহীন থাকার হতাশা আর চলমান সংকট মোকাবেলায় খাদ্য সহায়তার জন্য বিশাল অংকের বাজেট ঘোষনা দেওয়া হয়েছিলো। এছাড়া বিভিন্ন কমিউনিটির ভাষাভাষীদের জন্য প্রতিনিয়ত নিজ নিজ ভাষায় করোনা থেকে সচেতন থাকার প্রচারনা ছিলো প্রশাসনের প্রকাশিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক, টুইটার সহ সবখানে। মোবাইল কোম্পানীগুলোর মাধ্যমে সকল নাগরিকের মোবাইলে ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমেও ছিলো সতর্কবার্তা ও সচেতন থাকার নির্দেশনা।

এছাড়াও করোনার মহামারিতে প্রতিনিয়ত দেশটির গণমাধ্যমগুলোতে আভ্যন্তরীন সকল সংবাদের সাথে প্রাধান্য পেত আন্তর্জাতিক সকল সংবাদ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের করোনার সংবাদ ছাড়াও অন্যান্ন সংবাদগুলোও সমান গুরুত্বের সাথে প্রকাশ হতে দেখেছি। করোনা মহামারী থেকে মুক্ত থাকার জন্য দেশের জনগনকে সচেতন করতে রাষ্ট্রের সকল সংস্থাই তাদের উপর অর্পিত সকল দায়িত্ব কঠোর ভাবে পালন করতে দেখেছি। পত্রিকার পাতায় বড় পরিসরে ঝড়-বৃষ্টি, প্রখর রোদ্রতাপ উপেক্ষা করে প্রশাসনের বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের সড়ক, মহাসড়ক হাসপাতাল সহ গুরুত্বপূর্ণ সকল প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বপালনের ছবি দেখেছি। করোনা নিয়ে প্রতিদিনই স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের পক্ষ থেকে মিডিয়া ব্রিপ করা হতো। জনগনের উপর চাপ কমাতে এবং দেশটির অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে মেগা প্রজেক্টগুলোর অর্থায়ন সংকোচনের সিদ্ধান্তও পত্রিকার পাতার বড় হেডলাইন ছিলো।

এর সাথে বিভিন্ন দেশের ভাষাভাষীদের সাথে আমরাও সক্রিয় ছিলাম নিজস্ব কমিউনিটির জন্য সংবাদ সরবরাহে। আরব দেশের আরবী মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের বাংলা উপাত্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিদিনই প্রকাশ করতেন আমাদের রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিযুক্ত দূতাবাসের সংশ্লিষ্টজন। এখানে প্রবাসীদের সচেতন থাকা, দূর্যোগে ত্রান বিতরন কার্যক্রম, নিজেদের চিকিৎসক প্যানেল তৈরী সহ সবকিছুতেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ব্যবহার ছিলো সর্বোচ্চ পর্যায়ে।

তবে কাতার, কুয়েত, দুবাই, বাহরাইন, ওমান সহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে করোনা মহামারিতে আক্রান্ত সংখ্যাধিক্যের ব্যবধান সবচেয়ে বেশি ছিলো সৌদিআরবে, উল্লেখিত দেশগুলোর তুলনায় কোন কোন দেশের সাথে সৌদিআরবে সংক্রমনের মাত্রা ছিলো প্রায় দ্বিগুন। মার্চের প্রথম দিকে একজন দিয়ে শুরু হওয়া সংখ্যাটি প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। খুব কম সময়ের মধ্যে এতো সংক্রমন ছিলো অন্য দেশগুলোর তুলনায় বড় বেমানান। প্রতিদিনের আক্রান্ত যে সংখ্যাগুলো অস্বস্তির ছিলো, মে মাসের দিকে সে সংখ্যাগুলোই ক্রমশ সুস্থতার দিকে ফিরতে শুরু করায় স্বস্তির জায়গাটা কিছুটা বিস্তৃত হয়েছে। সৌদিতে জুনের চার তারিখের প্রকাশিত প্রতিবেদনের সুত্র থেকে প্রায় চুরানব্বই হাজার সংক্রমিত সংখ্যার মাঝে উনসত্তুর হাজারের কাছাকাছি সুস্থ হয়েছেন, মৃত্যুর হার যেখানে মাত্র এক সতাংশ বলে জানানো হয়েছে। এমন বাস্তবতায় করোনা মহামারীর শুরুতে মুসলিম বিশ্বের ধর্মীয় ইবাদতের কেন্দ্রবিন্দু মক্কা মদীনা সহ দেশটির সকল মসজিদে ইবাদত সাধারণ মুসল্লীদের জন্য সাময়িক বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর, মে মাসের শেষ দিন থেকে মক্কা ব্যতীত মদীনার মসজিদে নববী সহ সকল মসজিদ বিভিন্ন শর্তারোপের মাধ্যমে আবারো তা সাধারনের জন্য খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সকলের মাঝে এক স্বস্তির সংবাদ হিসেবে প্রচার হয়েছে। টানা কয়েক মাসের কর্মহীন ক্লান্তির মাঝে সবকিছু আগের মত স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফিরছে মনে করে এটা ছিলো জনমনে এটি ছিলো একটু প্রশাস্তির সংবাদ। মার্চের মাঝামাঝি থেকে মসজিদগুলোতে সাধারণ মুসল্লীদের জন্য নামাজ বন্ধ হলে বারো সপ্তাহ পরে জুনের প্রথম সপ্তাহে পবিত্র জুম্মার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছে দেশটির মসজিদগুলোতে। তবে এর বাহিরেও আমাদের জন্য অপ্রকাশিত কিছু বিষয় ছিলো দৃষ্টির মাঝে, আমাদের অনেক প্রবাসীর অকাল মৃত্যু, প্রবাসীদের মাঝে বাধ্যক্যের কোন ছাপ নয়, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুর খবরগুলো ছিলো আমাদের মাঝে বেশি।

সময়ের সাথে সাথে এখানের প্রবাসীরা সকল দুঃখ কষ্টকে দূরে ঠেলে করোনাকে জয় করে আবরো আগের দিনগুলোতে ফিরবেন এমন প্রত্যাশার কথা জানিয়েছে আমাদের কাছে। করোনা মহামারীর দিনগুলোকে পেছনে ফেলে সৌদিআরবে আগের মতো বছরব্যপী মক্কা মদীনায় গিয়ে ওমরাপালন ও বিভিন্ন দেশ থেকে আগত মুসল্লিদের নিয়ে মুসলিম বিশ্বের সবচাইতে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র হজ্ব সহ সব কিছুই স্বাভাবিক সময়ের মতো হবে এমনটাই চাওয়া সকলের। করোনায় আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে ঈদের খুশি, জামাতে পড়তে দেয়নি ঈদের নামাজও। সেই বেদনা বুকে নিয়ে আমরাও অপেক্ষায় আছি কোন প্রবাসী কর্মী ছাটাই ছাড়া যেন সৌদির অর্থনীতি ঠিক থাকে। অপেক্ষায় আছি করোনার কারনে যেন এবারের পবিত্র হজ্বের আনুষ্ঠানিকতা বাতিল না হয় সেই শুভ সংবাদের জন্য।

লেখক: আরিফুর রহমান, গণমাধ্যমকর্মী।