ঘরোয়া সহিংসতা: করোনার মাঝেই হিংস্রতার কালো ছায়া

রাফিন ইসলাম খান

বাংলাদেশে কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ঘরোয়া সহিংসতার হারও একই সঙ্গে ঊর্ধ্বমুখী। বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী,২০১৯ সালে শিশু ও নারী নির্যাতনের মামলা দায়ের হয়েছে ১১৩৯টি। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন নামক একটি মানবাধিকার সংস্থার একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধুমাত্র এপ্রিল মাসেই ৪২৪৯ জন নারী এবং ৪৫৬ জন শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছেন। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হল ১৬৭২ জন নারী এবং ৪২৪ জন শিশু প্রথমবারের মত সহিংসতার শিকার হয়েছেন।যারা প্রথমবারের মত এ ধরনের অপরাধের শিকার হয়েছেন তারা মূলত লকডাউনকেই বা কর্মহীনতাকে দায়ী করছেন। সামাজিক যোগাযোগের অভাব ও চাকরি হারানোর ফলশ্রুতিতে এ সকল অপরাধের পরিমাণ বাড়ছে। শুধু তাই নয়, আর্থিক সংকটের কারণে ইতিপূর্বে “বোঝা” মনে করা কমবয়সী মেয়েদের বাল্যবিবাহ দিতে বাধ্য হচ্ছে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো।

শুধু বাংলাদেশ নয় সারা পৃথিবীতে এ ধরনের সহিংসতার হার গুরুতরভাবে বাড়ছে। চীনের জিংঝু শহরে পুলিশ ২০১৯ সালের তুলনায় তিনগুণ বেশি ঘরোয়া সহিংসতার অভিযোগ পেয়েছে। এমনকি সাউথ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্রের মত উচ্চ ও উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে দেশে অপরাধের হার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ‘রিফিউজি’ নামক যুক্তরাজ্য ভিত্তিক একটি সংস্থা জানায় তাদের কাছে ঘরোয়া সহিংসতা সংক্রান্ত অভিযোগের সংখ্যা শতকরা সাতশ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে।

স্পেনের ঘরোয়া সহিংসতা বিষয়ক হেল্প লাইনে এপ্রিলের প্রথম দুই সপ্তাহে ফোন কলের সংখ্যা সাতচল্লিশ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।ইউএন উইমেনের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ফুমজিল মেলাম্বো-এনগকুকা বলেন, “সাধারণ জীবনযাপনে সীমাবদ্ধতা নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য এবং অর্থের উদ্বেগ দ্বারা সৃষ্ট উত্তেজনা ও চাপকে বাড়িয়ে তুলছে; এবং নারীদের বিচ্ছিন্ন করে তুলছে যাদের অনেকের জীবনসঙ্গী সহিংস।”তিনি পরিস্থিতিটিকে “বন্ধ দরজার পিছনে হিংস্র আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি নিখুঁত ঝড়” হিসাবে আখ্যায়িত করেন।

এ অবস্থা মোকাবিলার জন্য জাতিসংঘ‌ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করতে আহ্বান জানিয়েছে- অনলাইন পরিষেবা এবং সুশীল সমাজের সংস্থাগুলিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি,বিচারিক ব্যবস্থাগুলোতে অপরাধীদের বিচার অব্যাহত রাখা, নির্যাতনকারীরা সতর্ক হওয়ার আগেই নারীদের সহযোগিতা পাওয়ার সুরক্ষিত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা ইত্যাদি।ভিজার মুজকো-নিমানী, ইউএনএফপিএ এর একজন কর্মকর্তা বলেন,“আমাদের নিশ্চিত করা দরকার যে,সকল ধরণের সহিংসতা, কলঙ্ক এবং বৈষম্য রোধ, সুরক্ষা এবং প্রশমন করার জন্য পদক্ষেপগুলি নেয়া হয়েছে, বিশেষত কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশন চলাকালীন সময়ে মহিলাদের ও মেয়েদের বিরুদ্ধে যেগুলি সংঘটিত হয়। ”

বাংলাদেশে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার সবসময় খোলা রয়েছে। সেন্টারটি জরুরি ও গুরুতর অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিচ্ছে।

পাশাপাশি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ আলোচনা অনুষ্ঠান,সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি করতে কাজ করে যাচ্ছে। ভার্চুয়াল বিচার ব্যবস্থা এসকল অপরাধের বিচার কার্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম বলে মনে করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একটি বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন। পাশাপাশি রূচিশীল বিনোদনের সহজলভ্যতা পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারে বলে তারা মনে করছেন। সর্বোপরি, বাংলাদেশের ‘স্পর্শকাতর’ সামাজিক ব্যবস্থার অধিকতর অবক্ষয় রোধে দৃঢ় ও দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের প্রয়োজন।

লেখক: রাফিন ইসলাম খান
          শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়