মানবসম্পর্কের ওপর সোশ্যাল মিডিয়ার নেতিবাচক প্রভাব

ফাতিহুল কাদির সম্রাট

২০১০ সাল থেকে সারা দুনিয়ায় ৩০ জুন দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।দিবস উপলক্ষে নেটিজেনরা #SMDAY হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে থাকে।বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণকালে মানুষ যখন গৃহান্তরীণ এবং শরীরী যোগাযোগ ঝুঁকিপূর্ণ তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সমাজজীবনকে সচল রাখতে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। তাই করোনাকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। দিবসটির তাৎপর্যও সেজন্যে অন্য সময়ের চেয়েঅনেক বেশি।

সামাজিক যোগাযোগের সবচেয়ে প্রাচীন মাধ্যম হলো চিঠি-পত্র। সামাজিত যোযোগে বিপ্লব আসে টেলিফোন আবিষ্কার হবার ফলে। এরপর আসে ফ্যাক্স। মোবাইল ফোন এসে যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা দেয়। ইন্টারনেটে সাধারণ মানুষের একসেস বাড়ার সাথে ইন্টারনেট ও কম্পিউটার প্রযুক্তিনির্ভর সামাজিক যোগাযোগ প্লাটফরম গড়ে উঠতে থাকে। ইন্টারনেট ভিত্তিক ভারচুয়াল যোগাযোগের প্রথম প্রয়াস Six Drgrees (১৯৯৭)। ২০০২ সালে আসে My Space। সামাজিক যোগাযোগের ধারণা পাল্টে দিতে তুমুল জনপ্রিয়তা নিয়ে আসে Facebook(২০০৪)। YouTube (২০০৫), Tweeter(২০০৬) ও Instagram (২০১০) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন মাত্রা যোগ করে। এছাড়া প্রতিদিনই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নতুন নতুন প্লাটফরম ও টুলস খুলে দিচ্ছে বৈচিত্র্যের দুয়ার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সুবাদে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে।বর্তমানে বিশ্বে চার শ ৫৭ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে, এর মধ্যে সাড়ে তিন শ কোটির ওপর মানুষ ফেসবুক ইউটিউব জাতীয় সোশ্যাল মিডিয়ার সাথে যুক্ত। প্রতিবছর ৯% হারে বাড়ছে ব্যবহারকারীর সংখ্যা। নেটিজেনরা দিনে গড়ে ১৪৪ মিনিটব্যয় করেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। প্রতিদিন টুইট করা হয় ৫০ কোটি, মিনিটে ৬০০০টি।ইউটিউবে প্রতি মিনিটে ৩০০ ঘন্টার ভিডিও আপলোড করা হয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার ৮১% আজকের দিনে কোনো না কোনোভাবে সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর নির্ভরশীল। দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সোশ্যাল মার্কেটিং ধারণা।

তথ্যপ্রযুক্তি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে মানুষের যোগাযোগ অবারিত হয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।এই মাধ্যম দূরকে এনে দিয়েছে কাছে, নিকটকে এনেছে আরো নিকটে। প্রতিটি মানুষ এখন বিশ্বগ্রামের বাসিন্দা। সবাই যেন সবাইকে চেনে, জানে। প্রযুক্তির এই অবাধ প্রবাহ, এই কাছে আসা এবং কাছে থাকার অবারিত সুযোগ, মানবসম্পর্কে কী প্রভাব ফেলেছে সেটি এখন মূল্যায়নের সময় এসেছে। বিশেষ করে যে সম্পর্ক হৃদয়গত, সেটির ওপর এর প্রভাব এখন বিচার্য। বিশ্বের বড় বড় গবেষণা প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে এ নিয়ে কাজ শুরু করেছে। গবেষণায় বেরিয়ে আসছে উদ্বেগজনক চিত্র।

গবেষণায় দেখা যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষ করে তুলেছে অসামাজিক।বস্তুত ভারচুয়াল যোগাযোগের সুযোগ যত বাড়ছে, মানবসম্পর্ক তত ভঙ্গুর হয়ে যাচ্ছে। কাছে আসার ছলে মানুষ চলে যাচ্ছে দূরে। সম্পর্কজাল যত বিস্তৃত হচ্ছে, সম্পর্কের মূল্য সম্পর্কে মানুষ তত বেশি বেখেয়াল হয়ে যাচ্ছে। এখন সম্পর্ক আলগা, হৃদয়াবেগরহিত। মানব-সম্পর্ক বিষয়ক গবেষক ও আচরণিক বিজ্ঞানী Clarissa Silva বলেন,“Social media has been linked to higher levels of loneliness, envy, anxiety, depression, narcissism and decreased social skills.”

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অবারিত ব্যবহারের কারণে মানবীয় সম্পর্কের আবেগ ও হৃদয়ানুভূতি হারিয়ে যাচ্ছে। প্রেম-ভালোবাসার সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি। যোগাযোগশূন্যতার হাহাকার, প্রতীক্ষার দুঃসহ প্রহর এবং উদ্বেগাকুলতার পর মিলন, প্রেমের সেই চিরমধুর রূপটি এযুগে একেবারেই অচল। বিশেষ করে মানবীয় প্রেমকে আনুভূতিক জগৎ থেকে শরীরী ভূমিতে টেনে নামিয়েছে সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থা।

নব্বই দশকের একজন মা ও সন্তানের অনুষঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব কল্পনা করা যাক। নিভৃতপল্লির একটি ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ছে। খোকা চিঠি দিলেই কেবল মা তার ভালোমন্দ জানতে পারে।মা জানে ঢাকায় আন্দোলন চলছে। সে আন্দোলনের সামনে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। আন্দোলনে ছাত্রদের মারা যাবার খবর লোকমুখে মা শুনে।মায়ের মনজুড়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে মা পরম করুণাময়ের কাছে তার খোকার নিরাপত্তার জন্যে প্রার্থনা করে। মা জানে না তার খোকা কেমন আছে, কিভাবে আছে, তাই অদৃশ্য প্রভুর কাছেই তার সমস্ত আকুতি। দোয়া ছাড়া নিরূপায় মায়ের আর কোনো ভরসা নেই। ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ‘মাগো, ওরা বলে’ কবিতায় এক মায়ের কথা আমরা জানি। যে ঢাকায় পড়ুয়া তার খোকার জন্যে ডালের বড়ি শুকিয়ে রাখে, ‘খোকা কবে আসবি’ আকুতি জানিয়ে হৃদয়-ছেঁড়া চিঠি লেখে। সেই চিঠি পকেটে নিয়েই খোকা ভাষা আন্দোলনে শহীদ হয়। মা জানতেই পারে না তার খোকার পরিণতি। সে শুধু প্রতীক্ষা করে তার খোকার জন্যে।

এর বিপরীতে বর্তমানের কোনো দৃশ্য কল্পনা করলে দেখা যাবে, খোকার সাথে প্রতিদিন প্রতিক্ষণ কথা হয় তার মায়ের। খোকা কোন বেলা কী খেয়েছে তাও মায়ের জানা। শুধু ফোনকলে কথা নয়, ভিডিও কলে মা আর খোকার দেখাদেখিও হয়। খোকার শরীর-স্বাস্থ্য মায়ের চোখে-দেখা।মায়ের মনে কোনো অনিশ্চয়তাজনিত উদ্বেগ নেই, মা নিশ্চিন্ত। তাই খোকার জন্যে স্রষ্টার কাছে আকুতি-ঝরানো দোয়া করার প্রয়োজন বোধ করেন না একালের মায়েরা।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ভালোবাসার মানুষকে চোখের আড়াল না করতে বলেছেন।‘চোখের আড়াল হলে মনের আড়াল’ সমাজে প্রচলিত এমন কথারও ভিত্তি হয়তো আছে।শরীরী উপস্থিতি সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলেও তথ্যপ্রযুক্তি মানুষকে শরীরী যোগাযোগে নিরুৎসাহিত করছে, এমনটা গবেষণায় প্রমাণিত। ভারচুয়াল বার্তা বা কথা যে মুখোমুখি বসে বলা কথার তুল্য নয়, সেটা আজকের মানুষ ভুলতে বসেছে। শরীরী বা করস্পর্শ তা ভালোবাসার হোক বা স্নেহেরই হোক, তার বিকল্প হতে পারে না ভারচুয়াল রিয়েকশনের সাইন।অথচ একালের মানুষ শারীরিক উপস্থিতি কিংবা করস্পর্শেরভারচুয়াল প্রক্রিয়া জানিয়েই পরিতৃপ্ত থাকতে চাইছে।

সম্পর্কের ক্ষেত্রে কাছে থাকাটা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি দূরে থাকাটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।দূরে না গেলে প্রিয়জনের বিশ্বস্ততা প্রমাণিত হয় না। যোগাযোগহীনতা সত্বেও পারস্পরিক আনুগত্য এবং হৃদয়িক উপস্থিতি সম্পর্কের শক্তি প্রমাণ করে। সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত ‘শবনম’ উপন্যাসের নায়ক তার প্রিয়তমার কাছ থেকে শত শত মাইল দূরে থাকে। একটি চিঠি পৌঁছাতে সময় লাগে কয়েক মাস। নায়ক প্রত্যেক চিঠিতে একটি আবেদন রাখে, ‘প্রিয়তমে, তুমি আমার বিরহে অভ্যস্ত হয়ে যেয়ো না।’ অর্থাৎ প্রেমিক দাবি করছে, তাদের মাঝে বিশাল দূরত্বের বিচ্ছিন্নতা, কিন্তু ভালোবাসা অবিচ্ছিন্ন।এই বিচ্ছিন্নতাজনিত বিরহ-বেদনা প্রিয়তমার গা সওয়া হয়ে গেলে চলবে না। তার বিরহে প্রিয়তমা প্রতি মূহূর্ত বেদনানীল হবে, তার হৃদয় রক্তাক্ত হবে, কিন্তু তাকে সে ভুলবে না।কষ্টের কষ্টিপাথরে উত্তীর্ণ হবে তাদের প্রেম।

অনুভবে অনুক্ষণ একজন আরেকজনকে নিজের অস্তিত্বে জড়িয়ে রাখবে, জ্বলেপুড়ে মরবে, কিন্তু বিস্মৃত হবে না, ভালোবাসার এটাই আসল দাবি। সে কেমন আছে, কী করছে, কী ভাবছে, এসব নিয়ে আকুলিবিকুলি ভাবনায় একজন আরেকজনকে হৃদয়গহীনে অনুভব করবে, এটাই তো ভালোবাসার সুখসুধা। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের ফলে আজকের মানব-মানবী হৃদয়ের গভীরে অনুভবে একে অপরকে জড়িয়ে রাখতে ভুলে গেছে। এ যুগে বিরহের আগুনে জ্বলে প্রেম হচ্ছে না নিকষিত। ফলে একালের প্রেমিক-প্রেমিকা হৃদয়গত অনুভবের দিক থেকে বলতে গেলে ফতুর।পরস্পরের বিচ্ছিন্নতার মধ্যে অনুভূতি মানুষকে যে অদৃশ্য শক্তিসুতোয় আবদ্ধ করে রাখে প্রযুক্তি এই সুতোকে ছিঁড়ে ফেলেছে।
স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের বন্ধুর সংখ্যা বৃদ্ধি করলেও প্রকৃতপক্ষে তাকে বন্ধুহীন করে ফেলেছে। শিল্পবিপ্লবের পর মানুষ নিঃসঙ্গ শুরু করে, তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এসে সে হয়ে পড়েছে চরম নিঃসঙ্গ। অসংখ্য মানুষের ভিড়ে সে একা। মনোসমীক্ষকদের মতে একজন মানুষের সর্বোচ্চ ১৫ জন ভালো বন্ধু এবং ৫ থেকে দশ জন ঘনিষ্ঠ বন্ধু রাখা সম্ভব। কিন্তু এখন সামাজিক যোগাযোগ প্লাটফরমে মানুষের বন্ধুর সংখ্যা শত। কিন্তু তারা যে কেউ প্রকৃত বন্ধু নয় সেটি কেউ বুঝতে পারছে না। অসংখ্য ভারচুয়াল বন্ধু রাখতে গিয়ে মানুষ নিকটাত্মীয় এবং খাঁটি বন্ধুদের প্রতি মনোযোগ দিতে পারছে না। ফেইক বন্ধুর মোহে হারিয়ে ফেলছে আসল বন্ধুদের।দূরের মানুষকে কাছে টানতে গিয়ে কাছের মানুষদের ঠেলে দিচ্ছে দূরে। তাই স্বভূমেই সে বন্ধু ওস্বজনহীন।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ফেরে পড়ে মানুষ সামাজিক যোগাযোগের দক্ষতা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলছে।

মানবসম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক ইন্টারএকশন বা মিথস্ক্রিয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য প্রযুক্তি এই মিথস্ক্রিয়ার পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে। এমনকি স্বামী-স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের ইন্টারএকশনের সময় গিলে খাচ্ছে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, সোশ্যাল মিডিয়ার প্রসার যত ঘটছে, মানুষের আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে সশরীরে যাতায়াত তত কমছে। সামাজিক কর্মকাণ্ড ও যোগাযোগেও শরীরী উপস্থিতিতে মানুষ নিরুৎসাহিত হচ্ছে। উপস্থিতির বদলে ভারচুয়াল বার্তা ছেড়েই দায়িত্ব এড়াতে চাইছেন অনেকে। ফলে সামাজিক সম্পর্কের গুণগত রূপান্তর ঘটেছে। এতে সম্পর্কের বন্ধন আলগা হয়ে যাচ্ছে। পারস্পরিক দায়িত্বের বোধটাও হয়ে যাচ্ছে নড়বড়ে। প্রত্যক্ষ ব্যক্তিক যোগাযোগে ইতিবাচক ফলাফলের বিপরীতে ভারচুয়াল যোগাযোগের ফল হচ্ছে নেতিবাচক। বোঝাপড়ার জায়গাটা আজকাল শূন্য থেকে যাচ্ছে কেবল প্রত্যক্ষ যোগাযোগের অভাবে।

সামাজিক কারণে বা লোকচক্ষুর ভয়ে যে কথা আমরা সহজে বলতে পারি না, ভারচুয়াল জগতে তা অবলীলায় বলে ফেলি। যেসব বিষয়ে বিরোধ এড়িয়ে চলি, সেব বিষয়ে সহজেই বিরোধে জড়াচ্ছি। কারণ ব্যাপরগুলো ঘটছে বায়বীয় জগতে যেখানে মুখ দেখাদেখির দ্বিধা কাজ করে না। ফেসবুক বা টুইটারে এমন অশ্রাব্য কথার ছড়াছড়ি দেখা যায়, যা সচরাচর সমাজের স্বাভাবিক যোগাযোগে কেউ ব্যবহার করে না। অশরীরী উপস্থিতি আমাদের আবেগের বেগকে ক্রমহ্রাসমান করে দিচ্ছে। কারো কোনো কথায় ফেসবুকের লাফটার সাইন দেওয়া মানে হেসে কুটি কুটি হওয়া নয়, আবার স্যাড সাইন দেওয়া মানে হৃদয়ে বেদনা অনুভব করা নয়। স্টিকার আর ইমোজিতে মজে মানুষ তার আবেগকে জলাঞ্জলি দিয়েছে। মনোবিদগণ একালের তরুণ প্রজন্মকে কার্টুন প্রজন্ম নাম দিয়েছেন। কার্টুনের নড়চড়া আছে কিন্তু নেই ক্রিয়াশীলতা, নেই আবেগ। বর্তমান তরুণ প্রজন্মও কার্টুনের মতোই। তাদের জীবনাচরণে চাঞ্চল্য থাকলেও নেই প্রাণের ছোঁয়া।

সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি এই বিশ্বাস ও আস্থার মূলে কুঠারাঘাত করেছে।স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বেড়ে উঠছে অবিশ্বাসের দেওয়াল। অনৈতিক ও অসম সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে অনেকে। যুক্তরাষ্ট্রে একে গবেষণায় দেখা যায়, দম্পতিদের মধ্যে যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশি সময় ব্যয় করে তাদের দাম্পত্য কলহ ও বিবাহবিচ্ছেদ বেশি। আমাদের দেশেও বিশেষ করে ফেসবুক ব্যবহারের কারণে বাড়ছে দাম্পত্য ও পারিবারিক কলহ। হচ্ছে পরকীয়া, ঘটছে বিবাহ বিচ্ছেদ। মিথ্যা ভুয়া পরিচয়ের সম্পর্ক-সূত্রে সহিংসতা ও হত্যার ঘটনাও ঘটছে।

সম্পর্কের আরেকটি দাবি হলো পারস্পরিক মনোযোগ। প্রিয়জন নিজে মনোযোগ আকর্ষণ করে, চায় তার প্রতি মনোযোগও। অথচ আজকের মানুষের মনোযোগ নিবিষ্ট স্মার্ট ফোন, ট্যাব, কম্পিউটার প্রভৃতির ওপর। গবেষণায় দেখা গেছে যে, একজন মানুষ প্রতি আড়াই মিনিটে অন্তত একবার হাতের কাছে থাকা স্মার্ট ফোন নেড়েচেড়ে দেখে, স্ক্রিন অন করে কোনো কারণ বা প্রয়োজন ছাড়াই। এমনকি প্রেমিক-প্রেমিকা মুখোমুখি বসে থাকার সময়ও তাদের মনোযোগ কেড়ে নেয় যান্ত্রিক ডিভাইস। সময় ফলে সম্পর্কের নিবিড়তা হয় বাধাগ্রস্ত। সম্পর্কের আরেকটি বিশেষ দিক প্রাইভেসি বা গোপনীয়তা। সোশ্যাল মিডিয়া, বিশেষ করে ফেস বুক প্রাইভেসিকে মারাত্মকভাবে আঘাত করেছে। সম্প্রতি ভারতের পুনে শহরে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু হয়েছে এক প্রকৌশলী দম্পতির। স্ত্রী সোনালি দাম্পত্যজীবনের গোপনীয় বিষয়গুলোও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিতেন।এতে বিব্রত ও অতিষ্ঠ স্বামী রাকেশ গাঙ্গুর্দে নিজহাতে স্ত্রীকে হত্যার পর নিজে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন। তার লেখা সুইসাইড নোটে একথা জানা যায়।

আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি অনেকক্ষেত্রে আশীর্বাদ হলেও মানবসম্পর্কের ক্ষেত্রে মোটেও আশীর্বাদ নয়। ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ ফেসবুক উদ্ভাবনকে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল বলে স্বীকার করেছেন। স্বীকারোক্তির পরেও তাঁর পক্ষে ফেসবুক বন্ধ করা সম্ভব হবে না। মানুষও ভারচুয়াল জগৎ থেকে দূরে যেতে পারবে না। এই বাস্তবতায় সোশ্যাল মিডিয়ার নিয়ন্ত্রিত ও যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করার উপায় খুঁজে বের করতে হবে এখনই।

লেখক: ফাতিহুল কাদির সম্রাট
সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজ।