করোনাকাল: গুরুত্বহীন খবর ও শিরোনামের ব্যবসা

রাহাত মুস্তাফিজ

ঘুম থেকে উঠে পত্রিকার একটি খবর দৃষ্টি কেড়ে নিলো। খবরের শিরোনাম ‘’ খেতে খেতে ৮টা আম খেয়ে ফেলেছি’’। টিভি ও চলচ্চিত্রের অভিনয় শিল্পী শবনম ফারিয়া খেতে খেতে ৮টা আম খেয়ে ফেলেছেন- এটাকে শিরোনাম করেছে একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা। তা গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ ছড়িয়ে দেওয়া দায়িত্বজ্ঞান করি। তাছাড়া একজন অনলাইন একটিভিস্ট হিসেবে যেকোনো ‘ভাল কিছু’, ‘জরুরি কিছু’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুলে ধরা দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকর মনে হয়।

মিডিয়া তারকা সৃষ্টি করে। তবে আকাশে যে কোটি কোটি তারকা আছে ততো তারকা মিডিয়ার দরকার নেই। একটি নির্দিষ্ট সময়ের ক্যানভাসে মিডিয়ার দরকার পড়ে অল্প কিছু তারকা তথা স্টার। ওই স্টারদের স্টার হয়ে ওঠার সাথে সাথে তাঁদের স্টার ইমেজ তৈরি করা হয়। তারপর ওই স্টার ইমেজ প্রয়োজন অনুসারে বিক্রি করা হয়। এখানে ইমেজটা আসলে একটা পণ্য। এই পণ্যের উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন করে পুঁজিবাদ মুনাফা সৃষ্টি করে। সারা পৃথিবীতে এই একই কায়দা চলছে।

মুনাফার এই চক্করের ভেতরে ওদিকে হয়তো দেশের কোনো এক প্রত্যন্ত কোণে অক্সিজেনের অভাবে কেউ মরে পড়ে আছে বা করোনায় কাজ হারিয়ে দিশাহীন নিম্ন আয়ের মানুষগুলো হয়তো নিয়তির পানে অসহায় তাকিয়ে আছে। ওই মানুষগুলোর কাছে মিডিয়া পৌঁছবে না। তাঁরা খবর হবে না। আবার হয়তো খবর হবে বিকল্প মিডিয়ায় ভাইরাল হবার কারণে। তখন ওই প্রত্যন্ত কোণে মরে পড়ে থাকা ব্যক্তি জনপ্রিয় পত্রিকাগুলোতে শিরোনাম হবে- শবনম ফারিয়ার আটটি আম খেয়ে ফেলা খবরের এক পাশে৷ মরে পড়ে থাকা ওই ব্যক্তির অভাব-অনটনের ইতিকথা প্রাবন্ধিকের সুলিখিত কলামে উঠে আসবে। শিক্ষিত মধ্যবিত্তের দরবারে সকালের চা’য়ের টেবিলে পরিবেশিত হবে লেখাটি।

এবং এই অধম একটিভিস্ট ও তাঁর এই লেখাটিও (অথবা ভবিষ্যতে লেখা হবে এমন কোনো লেখা) হয়ে যেতে পারে ভাইরাল। তখন এই লেখকের স্টার ইমেজ ক্রয়-বিক্রয়ের নিলামে উঠে যাবে হয়তো।

কথা হচ্ছে, শবনম ফারিয়ার তারকা ইমেজের পাশাপাশি তাঁর আটটি আম একবসায় খেয়ে দেওয়া সংবাদের ভোক্তা শ্রেণিও আছে সমাজে৷ স্টার তৈরির সাথে সাথে ভোক্তা শ্রেণিও তৈরি করা লাগে। বৈশ্বিক মহামারির এই আকালে স্টারের আম খাওয়া গুরুত্বহীন সংবাদ মনে হলেও, এটাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা ও সেটাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করানোটাও ব্যবসায়ের অংশ। এটাই কৃত্রিম প্রয়োজন। যা আসলে দরকারই ছিল না। কিন্তু ভোক্তার কাছে এটাকেই গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় হিসেবে হাজির করানো হবে। সেজন্য যে মোড়ক পরানোর দরকার হয় তা পরানো হবে। এই কৃত্রিম প্রয়োজন সৃষ্টি করে পুঁজির মোড়লেরা আমাদেরকে কী কী ভুলিয়ে দিতে চায় এবং তাঁরা আর কী কী হাসিল করে নিতে চায় তা কি আমরা জানি কিংবা জানতে চাই?

পুনশ্চঃ ধন্যবাদ শবনম ফারিয়াকে। ভাইরাল হওয়া শিরোনামটিকে তিনি বিদ্রুপের সাথে গ্রহণ করেছেন ও আমাদেরকে গ্রহণ করতে বলেছেন। তিনি লিখেছেন,’’ঘুম থেকে উঠে দেখলাম আমাকে নিয়ে অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা নিউজ হইসে!!! করোনা কালিন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ!!!
যদিও আমি নির্বাক!!!

যাইহোক, আমিও হাসতেছি, আপনারাও হাসেন!!!
এই কঠিন সময়ে হাসাটা খুব জরুরী… cheers !’’

লেখক: রাহাত মুস্তাফিজ, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট