করোনাকালে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা

শান্তনু চৌধুরী

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অবাধ বিচরণ, নানা প্লাটফর্ম আর খবরের চেয়ে গুজবে বিশ্বাস করা এই জাতি এমনিতে সংবাদমাধ্যমের ওপর বিশ্বাস হারিয়েছে অনেক আগে। এর মধ্যেু করোনাকাল এসে সেই সাংবাদিকতাকে করে ফেলেছে একেবারে গৃহবন্ধী। এর মধ্যে খগড় হিসেবে যুক্ত রয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, যা অনেকের ভাষায় কার্যত দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের পথকেই প্রশস্ত করেছে।

সাংবাদিকের কাজ সময়ের সত্যকে খোঁজা-দেখা-জানা-বোঝা আর জনমানুষকে তা জানানো। যাচাই-বাছাই করা তথ্য কোনো পক্ষ না নিয়ে যথাযথ প্রেক্ষাপটসহ জানানো। সাংবাদিকের সত্যান্বেষণকে পুস্তকি ভাষায় এভাবেই বর্ণনা করা যায়। আর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় সেই যাচাই বাছাইয়ের বিষয়টি আরো গভীরে। আরো আরো অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে খোঁজা। এমনিতে গেলো এক দশকে আমাদের দেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা অনেকটা লক্ষণরেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে অন্যদিকে করোনার থাবায় তা যেন পথ হারিয়েছে, অন্তত টেলিভিশন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একথা বলা যায়।

সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করলে বিষয়টি পরিস্কার হবে। একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে গুলি করে দুই ভাই বিশেষ বিমানে বিদেশ পালাল, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোর্শেদ খান সস্ত্রীক চার্টার্ড বিমান ভাড়া করে যুক্তরাজ্য গেলেন। বিমান ভাড়া করে সস্ত্রীক যুক্তরাজ্যে গেছেন বেক্সিমকো গ্রুপের চেয়ারম্যান সোহেল এফ রহমানও। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা এবং বেক্সিমকো গ্রুপের বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের বড় ভাই। এছাড়া কানাডা গিয়েছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংসদ মাহবুব উল আলম হানিফ। অথচ এসব বিষয়ে আমাদের তেমন কোনো অনুসন্ধানী রিপোর্ট চোখেই পড়েনি। আর এই সব খবর জানাও গেছে তারা বিদেশ চলে যাওয়ার পর।

করোনা ভাইরাসের কারণে বিমানবন্দরে নানা বিধি নিষেধ রয়েছে। এরপরও রন হক শিকদার এবং দিপু হক শিকদার এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে ব্যাংকক গেলেন কীভাবে? তারা এমন কোনো অসুস্থও নন। তাদের নামে মামলা আছে, পত্রিকায় তাদের ছবিও ছাপা হয়েছে। তাদের তো জেলে যাবার কথা। অথচ তারা দেশ ছেড়ে পালাল সব দিক ম্যানেজ করে। এ প্রসঙ্গে সাংবাদিক কামাল আহমেদ এর একটা লেখা থেকে ধার নিচ্ছি। তিনি লিখেছেন, ‘কয়েকজন ব্যবসায়ীর দেশছাড়ার খবর সাংবাদিকতার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা আবারও তুলে ধরেছে। কিন্তু, এটি খবরের শেষ নয়, শুরু। এখনও জানা প্রয়োজন যারা বিদেশে গেলেন, তারা কোনধরনের বিমান ভাড়া করেছিলেন? দেশীয় বিমান সংস্থার, নাকি বিদেশি? যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রে গন্তব্য হয়ে থাকলে ছোট বিমানে এই যাত্রা অসম্ভব। তাহলে কি বিদেশি কোম্পানির বিমান ভাড়া করা হয়েছে? ভাড়া বিদেশি মুদ্রায় পরিশোধ করা হয়ে থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেজন্যে নিশ্চয়ই অনুমোদন দিয়েছে? বিদেশি মুদ্রা খরচের জন্য তো কারণ দেখাতে হয়, বিশেষ করে যেখানে খরচের পরিমাণ ন্যূনপক্ষে কয়েক লাখ ডলার হবে। এই খরচ তো ব্যবসায়ীক প্রয়োজনে নয়, যে কোম্পানির তহবিল থেকে খরচ হবে।

ব্যাক্তিগত প্রয়োজনে যেখানে সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা খরচের আইন আছে , সেখানে একটি সম্ভাব্য মহামন্দার কালে এতো বড় অংকের অনুমোদন কতটা স্বাভাবিক? সিকদার ভ্রাতৃদ্বয়ের মেডিকেল সার্টিফিকেট কি ভুয়া? কোন হাসপাতাল বা চিকিৎসক তা ইস্যু করেছেন? রাজনীতির সঙ্গে টাকার যোগসূত্রগুলো বোঝার জন্য এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা প্রয়োজন।‘ কিন্তু এখনো তেমন কোনো রিপোর্ট চোখে পড়েনি। মাহবুব উল আলম হানিফের বিদেশ যাওয়া নিয়ে কানাডা থেকে শওগাত আলী সাগরের যে প্রতিবেদন প্রথম আলোতে প্রকাশ হয়েছে তা পড়লে দেখা যায়, সন্মানিত সংসদ সদস্য এবং সেদেশের বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সির বক্তব্যের মধ্যে কোথাও যেন ফারাক রয়েছে।

আবার যদি আমরা সংসদ সদস্য কাজী শহিদ ইসলাম ওরফে পাপুলর কথা বলি, যিনি কুয়েতে ভিসা বাণিজ্যের নামে মানব পাচার ও অবৈধ মুদ্রা পাচারের চক্রের অভিযোগে আটক হয়েছেন। তার বিষয়টিও আমরা জেনেছি কুয়েতে আটকের পর।

একথা ঠিক যে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এখন আর আগের অবস্থানে নেই। এর প্রধান কারণ রাষ্ট্রযন্ত্র এক ধরনের অলিখিত চাপ দিয়ে রেখেছে, সেটা একদিকে আইনের মাধ্যমে, অন্যদিকে সংবাদ মাধ্যমের মালিকপক্ষ এবং সাংবাদিক নেতাদের পকেটস্থ করে নানা সুযোগ সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে। যে কারণে ‘তিনি বলেন’, ‘তিনি আরো বলেন’ সাংবাদিকতা এখন বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, নিউ এজ এর মতো কয়েকটি সংবাদমাধ্যম যে ব্যতিক্রম নয় তা বলবো না, তবে তাদেরও এগুতে হচ্ছে নানা প্রতিকূলতার মাঝে। আরেকটি বিষয় যুক্ত হয়েছে, পাবলিক সংবাদের ওই উপাদান গ্রহণ করে কিনা। সোজা বাংলায় খায় কিনা! সেটি টিআরপি, ফেসবুক লাইক কমেন্ট বা ইউটিউবের ভিউ বলে দেয়। প্রযুক্তির এই যুগে এসবকে এড়িয়ে যাওয়া যেমন ঠিক হবে না, আবার একথা ঠিক যে, পাবলিক খাওয়া নিয়ে সাংবাদিকতা হয় না। সে কারণে ‘কামাল লোহানীর মৃত্যু’ পাবলিক না খেলেও সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করতে হবে। কারণ সংবাদ মাধ্যমের কাজ শুধুমাত্র সংবাদপ্রচার করা নয়। পাঠক বা দর্শকের মন, মনন, রুচি গঠনেও তার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। প্রেস রিলিজ, ভক্সপপ, বাইট, ভিডিও বার্তা বা ফোনালাপ মার্কা সাংবাদিকতা আর যাই হোক নিজের ক্যারিয়ারে যেমন বাড়তি কিছু যোগ করবে না তেমনি পাঠক বা দর্শক সমাজেও কোনো আলোড়ন সৃষ্টি করবে না।

তবে একথা ঠিক যে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে নিজের হাউজ পলিসি এবং ঊর্ধ্বতনদের মনোভাব একটা বিশাল ভূমিকা রাখে। যেমন টেলিভিশনে যেটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে সময়ের, আবার ছবি, বক্তব্য একসাথে প্রচার করার সুবিধাও রয়েছে। ইন হাউজ প্রতিবন্ধকতা যদি থেকেও থাকে সেটিকে জয় করার চেষ্টা করতে হবে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়ে। কোনো একজন রিপোর্টারকে দেখে যদি কর্তৃপক্ষ বুঝে নেয়, তাকে সময় দিলে, সুযোগ দিলে সে ভালো কিছু উপহার দেবে তাহলে তাকে সহযোগিতা করতে যে কোনো ভালো প্রতিষ্ঠান পিছপা হবে না। সাংবাদিকতার সেই বিশ্বাসযোগ্যতাটা অর্জন করতে হবে। একইসঙ্গে তাকে অর্জন করতে হবে পাঠক বা দর্শকের বিশ্বাসযোগ্যতাও। যেন পত্রিকা বা অনলাইনে নাম বা টেলিভিশনের সংশ্লিষ্ট রিপোর্টার দেখেই বুঝে নেন, তার রিপোর্ট মানেই বিশ্বাসযোগ্য রিপোর্ট। এই বিশ্বাসযোগ্যতা একদিনে অর্জন হয় না। সময় দিতে হয়। এই করোনাকালে ভাইরাসের ভয়ে আমরা অনেকেই গৃহবন্ধী এটা যেমন ঠিক তেমনি অনেকে নিজস্ব সোর্স ব্যবহার করে ভালো ভালো অনুসন্ধানী রিপোর্ট করে যাচ্ছেন। না হলে মাস্ক কেনার কেলেঙ্কারি, করোনা পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ করে ফেলে দেয়ার মতো কেলেঙ্কারি বা করোনার সুযোগে চট্টগ্রামে পাহাড় দখল করার মতো ঘটনা অনুসন্ধান হয়ে পাঠক-দর্শকের সামনে আসতো না। কিন্তু সেক্ষেত্রে টেলিভিশনগুলো কিছুটা পিছিয়ে আছে বলে মনে হয়।

অবশ্য হাউজ যদি সাহস না দেয়, তবে ব্যক্তি হিসেবে সাংবাদিকের এগিয়ে যাওয়াও দুস্কর। যেখানে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো একটা আইন রয়েছে। যার ৩২ ধারার কারণে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ততো বটেই। এই ধারার ব্যাখ্যা অনুযায়ী অনুমোদন ছাড়া সরকারি কোনো দপ্তর বা সংস্থার তথ্য সংগ্রহ করলে তা গুপ্তচরবৃত্তি বলে বিবেচিত হবে। সে কারণে এখন পুলিশের ঘুষ কেলেঙ্কারির সংবাদ প্রচার হলেও তারা ব্যাখ্যা চায় অথবা সাংবাদিককে ডেকে পাঠান দপ্তরে। আর কে না জানে বাংলাদেশে বিরুদ্ধ মত প্রকাশ করতে গিয়ে কতো সাংবাদিকের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে। সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলকে প্রায় দুই মাসের অজ্ঞাতবাসের পর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আটকে রাখা হয়েছে। দেশের আরও কয়েকটি জেলায় কথিত মানহানির মতো ঠুনকো অভিযোগে আটক হয়ে আছেন আরও বেশ কয়েকজন সাংবাদিক। মুক্ত গণমাধ্যমের বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫১ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সবার নিচে।

লেখক: শান্তনু চৌধুরী
বার্তা সম্পাদক, সময় টেলিভিশন ও সাহিত্যিক
shantanu.reporter@gmail.com