এ কোন দহনকাল?

পম্পা ঘোষ

২০২০। সহস্রাব্দের শুরুতে এই বছরটাকে নিয়ে কত কত জল্পনা কল্পনা ছিল, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কত উন্নয়ন পরিকল্পনা, কোথায় থাকতে চাই আমরা ২০২০সালে! স্কুলে, কলেজে, টেলিভিশনে কত বিতর্কও হলো সেই নিয়ে।অথচ বছরটা যখন আমাদের ঘরে এলো তখনও আমাদের জানা হয়নি পৃথিবীর অসুখ করেছে,নীরবে ছড়িয়ে পড়ছে ঘাতকব্যাধি।তখনো খবর টাউহান থেকে ছড়িয়ে পড়েনি চারপাশে। সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলএন্ডপ্রিভেনশন (সিডিসি) বলছে কোভিড-১৯ প্রথম শনাক্ত করণ করা হয় ৩১শে ডিসেম্বর ২০১৯, ঠিক যখন আমরা পুরনো বছরকে বিদায় দিয়ে নতুন একটা বছর শুরু করতে চলেছি।এখানে প্রশ্ন থেকে যায় চীনের তথ্যের সরবরাহের স্বচ্ছতা সম্বন্ধে। অনেক দিন ধরে ব্যাপারটি গোপন করে গেছিলো সেরকমও ধারণা করা হয়।

প্রথম দিকে চীনের অবস্থান, রোগ সনাক্তকরণ এবং তার রিপোর্ট করা নিয়ে তদন্তের জন্য বিশ্বের অনেকদেশই দাবি জানিয়েছে এরমধ্যে। সেসব নিশ্চয়ই সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।কূটনীতি, রাজনীতি এবং অর্থনীতির জটিলতা পেরিয়ে সেই প্রশ্নের উত্তর আমরা কোনদিন পাব কিনা জানিনা, কিন্তু আমাদের কাছে এই মুহূর্তে তার থেকেও জরুরী সমস্যা রয়েছে।আমরা পার হচ্ছি দহনকাল, পার হচ্ছি এমন মহামারী যা ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের অজান্তে, টিকে থাকার জন্য যে শ্বাস-প্রশ্বাস টুকু আমরা গ্রহণ করিতারই মাধ্যমে আমাদের শরীরে বাসা বাঁধছে কোভিড-১৯।

প্রতিদিন এর সংক্রমণ এড়িয়ে টিকে থাকাটাই একটি চ্যালেঞ্জ এখন।এর সম্বন্ধে বিষদ ভাবে জানার আগেই এই অনুজীব ছড়িয়ে গেছে বিশ্বের নানাপ্রান্তে, দাবানলের মত।বুঝে ওঠার আগেই ধরাশায়ী হয়ে পড়েছে ইউরোপের সুসংগঠিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গুলোর একেকটি।তখনো সময়ছিল অনেক গুলো দেশের হাতে, কিন্তু মানুষের ইতিহাস সবসময় বলে ঠিক সময়ে ঠিক কাজটি করে উঠতেনা পারার মাশুল আমরা অসংখ্যবার দিয়েছি এবং দেই।অর্থনীতিও রাজনীতির কাছে হেরে গেল মানুষের জীবন। মানুষের জীবন হয়ে গেল সংখ্যা। প্রোবাবিলিটির হিসাব।কোন একভাবে বিশ্বের বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে বার্তা চলে গেল যেহেতু বয়স্ক মানুষ ছাড়া অন্যদের কম মৃত্যুর ঝুঁকি কম সেহেতু আমাদের অত সাবধাননা হলেও চলবে। তারমানে আমরা ঠিক করে নিলাম যে বয়স্ক মানুষের জীবনের দাম আমাদের থেকে কোন না কোন ভাবে কম।এত স্বার্থপর এবং আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা কোথায় কিভাবে লালন হয় কে জানে !!

এখানে যোগ করে রাখা ভালো যে সত্যিকার অর্থে কোভিড-১৯কে এখনও আমরা পুরোপুরি জানিনা। কিন্তু এর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে ব্যক্তিভেদে, সেক্ষেত্রে বয়স দৈনন্দিন জীবনযাপন কিংবা অসুখ-বিসুখের ইতিহাস কিভাবে কখন কোন ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে কেউ বলতে পারেনা।এই কদিন আগে প র্যন্ত সবাই বলে গেল যে বাচ্চাদের ঝুঁকি নেই কিন্তু এখন কিন্তু সেই তথ্যটি আর সত্যি থাকছে নাএখন।সংক্রমণের হয়ে সেরে যাবার পরেও বাচ্চারা বহুমাত্রিক প্রদাহের লক্ষণ নিয়ে শকে চলে যেতে পারে,ঘটতেপারেমৃত্যুও। কোভিড-১৯কে পুরো পুরি বুঝে ওঠার আগেই এমন উচ্চ সংক্রমন ক্ষমতা সম্পন্ন একটি ভাইরাসকে নিয়ে একের পর এক বিভ্রান্তকর তথ্য দিয়ে গেল সিডিসি এবং বিশ্বস্বাস্থ্যসংস্থা।কখনো মাস্কনিয়ে, কখনো গাইডলাইন নিয়ে।কোভিড-১৯ঠিক কতখানি বিধ্বংসী সেটা ধারণা করতেনা পারার ব্যর্থতা বাসময় থাকতে প্যানডেমিক হিসেবে ঘোষণা দিতেনা পারার ব্যার্থতাও বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার রয়েছে বৈকী। সেনিয়েও আলোচনা সমালোচনাও কিছু কম চলছেনা।কিন্তু ক্ষতি যা হবার হয়ে গেছে ততদিনে।এই অপ্রতিরোধ্য অনুজীব ছড়িয়ে পড়েছে সারা পৃথিবীতে।

Source: Internet

এবার কিন্তু আমাদের অবাক হবার পালা, এবার আমাদের হতাশ হবার পালা। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি কোভিড-১৯ এর ধাক্কায় ইউরোপ যেভাবে টালমাটাল হয়ে গেল, সেই উদাহরণ দেখার পরেও এবং হাতে যথেষ্ট সময় পাবার পরেও অনেক রাষ্ট্রই তৈরি হলোনা। তৈরি হলোনা বাংলাদেশ, তৈরি হলো না মহা ক্ষমতাধর আমেরিকা। হিসেবের খাতায় রইল অর্থনীতি, রাজনীতি এবংসরকারের ব্যর্থতা-সাফল্য, আসন্ন ভোট ইত্যাদি নানাবিধ জটিলএবং সূক্ষ্মহিসাব , ব্যক্তিগত লাভেরস্থুল হিসেবটাও বাদ পড়লনা সেখান থেকে।বাদ পড়ল শুধু মানুষের জীবন, মানুষ গুলো সংখ্যা হয়ে গেল, মানুষের জীবনের মূল্য নির্ধারিত হলো মৃত্যুর হারে।এরপরের গল্পটুকু আমরা সবাই জানি। এক –দুই করে শতক, শতক ছাড়িয়ে হাজার, হাজার ছাড়িয়ে লক্ষকোটি সংক্রমনের খবর।মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হলো পৃথিবীব্যাপী। আমরা প্রতিদিন আশঙ্কায় দিন কাটাই যেন কোন বাজে খবর না আসে, যদিও জানি যে কোন সময় আসতেপারে যে কোনো অপ্রিয়সংবাদ।প্রিয়জনদের রক্ষা করতে আমরা প্রিয়জনদের থেকে দূরে থাকি।আমরা সামাজিক জীবন ছেড়ে একলা থাকি।আমরা গৃহবন্দী থাকি।আমরা শিশুদের স্কুলে পাঠাইনা।খেলতে পাঠাইনা বন্ধুদের সাথে।একটা চমৎকার শৈশবকে আমরা আটকে ফেলেছি নিয়মের বেড়াজালে।

Source: Internet

আমেরিকার ফ্লোরিডায় বসে থেকে হঠাৎ একদিন খবর পেলাম প্রথমসং সংক্রমণের।আশঙ্কায় কেঁপে গেল বুক। আজকের আমেরিকায় ফ্লোরিডা সংক্রমণের সংখ্যায় পদোন্নতি পেয়ে সাত নম্বর।আরো উপরে উঠে গেলেও আশ্চর্য হবার কিছু নেই। এদিকে গভর্ণর রণডিস্যান্টিস শুরু থেকেই ফেডারেল সরকারের প্রতিধ্বণিই করে চলেছেন।পোর্টঅফ এন্ট্রিহবার সুবাদে নিউইয়র্ক আমেরিকার প্রথম কভিড-১৯’র হটস্পট।।আমরা প্রতিদিন দেখছি সেখানকার স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, হাসপাতালে জায়গা হচ্ছে না, বিপুল সংক্রমণ চতুর্দিকে।ফেডারেল গভারমেন্ট এর সঙ্গে স্টেট গভারমেন্টের দেন দরবার চলছে, প্রতিটি স্টেট গভারমেন্ট নিজেরমতকরেনিজেরস্টেটেরজন্যনানানরকমেরব্যবস্থানিচ্ছে , যোগাযোগ সীমাবদ্ধকরণ থেকে শুরু করে পরীক্ষার , চিকিৎসার প্রস্তুতি শুরু করেছে।ঠিক সেই সময় নিউইয়র্ক এবং এর আশেপাশের জায়গা থেকে দৈনিক শ’খানেক এরও পরে ফ্লাইট ঢুকছে ফ্লোরিডাতে, কোয়ারিন্টাইন পালন করতে আবার ছুটি কাটাতে।মার্চের তৃতীয় সপ্তাহ স্প্রিংব্রেক আমেরিকাতে আর আবহাওয়াগত কারণেই ফ্লোরিডা ট্যুরিজমের সে সময় হটস্পট।আরো অনেক অঙ্গরাজ্য সংক্রমন ছড়িয়ে পড়া আটকাতে নানান রকমের বিধিনিষেধ দিলেও ফ্লোরিডা নিশ্চুপ।মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে এসে প্রেসিডেন্ট সমগ্র দেশে ঘরে থাকার নির্দেশনা দেওয়া পর্যন্তগভর্ণরের তরফ থেকে কোনো ধরনের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। অতঃপর শুরু হল বাড়িতে থাকা, লোকালয়এড়িয়ে চলা, সামাজিকদূরত্ব বজায় রাখা। এত গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো সব মানুষকে কিন্তু বোঝানো গেল না। ফলে সেটি খুব কার্যকর হলো বলেমনে হয় না।

এদিকে একটা বিষয় উল্লেখযোগ্য, প্রশাসন যেমন সিদ্ধান্তই নিয়ে থাকুক না কেন, মূলধারার গণমাধ্যমে আসা তথ্যের মধ্যে কোন ফাঁক ছিল না। প্রেসিডেন্ট কিংবা ফেডারেল গভর্মেন্টের অনেক বক্তব্য যেগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, গণমাধ্যম সেগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে ডঃএন্থোনিফাউচির (ডিরেক্টর, ইনস্টিটিউটঅফঅ্যালার্জিঅ্যান্ডইনফেকশাসডিসিজ) বক্তব্য তুলে ধরে।যিনি একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবেশুরু থেকে ক্রমাগত ভাবে সাবধান করে যাচ্ছে কোভিড -১৯এর ঝুঁকি নিয়ে এবংআমেরিকার ঠিক কতখানি গুরুত্বের সঙ্গেএকে বিবেচনা করা উচিত। ক্ষমতার রাজনীতির সাথে জড়িত অনেকেই তার প্রতি অপ্রসন্নও হয়েছেন।এই মহামারীর শুরুর থেকেই আমেরিকান গণমাধ্যম ঘটনা গুলো ঘটনার সমান্তরালেই কভার করে গেছে।যে মুহূর্তে যতটুকু জানা গেছে, সমস্ত তথ্য তুলে ধরেছে মানুষের কাছে।অন্তত আমার চোখেতে মনই পড়েছে। এইসব টালমাটালের মধ্যেই সমস্ত মিডওয়েস্ট জুড়ে শুরু হলো “ঘরেথাকারনির্দেশে” এরবিরুদ্ধে আন্দোলন। খোদ প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের মধ্যে এরইন্ধন ছিল বললেও একদমই ভুল বলা হয় না।

এ এক অদ্ভুদ দ্বৈরথ দাঁড়িয়ে গেল।একদিকে হাসপাতালে জায়গা নেই বলে চিকিৎসক এবংনার্সরা কর জোড়ে অনুরোধ করছেন সবাইকে বাড়িতে থাকতে, অন্যদিকে রাজনৈতিক অবস্থানগত কারণে আন্দোলনকারীরা মহামারীকে মিথ্যা প্রচারণা বলে চালিয়ে দিতে চাইলেন, মাস্ক পড়তে বা সামাজিকদূরত্বরক্ষা করতে অস্বীকার করলেন। আমরা দেখলাম হাসপাতাল থেকে বাইরে এসে রাস্তায় দাঁড়িয়ে অবস্থান নিলেন চিকিৎসক এবংনার্সরা।রাজনৈতিক মোটিভেশন ছাড়াও এই আন্দোলন জুড়ে গেছে জনজীবনের আরো একটি করুণদিকের সাথে।দোকানপাট, ব্যবসাপাতি সমস্ত যখন বন্ধ তখন এইসব দোকানপাটে কাজ করা, ব্যবসায় কাজ করা , শ্রমজীবি পেশাজীবি মানুষেরা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কি করবেন!! আন্দোলনে সেরকম মানুষ জন যোগদিলেন অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত কারণেই।টালমাটাল অর্থনৈতিক অবস্থায় কাজ হারিয়েএখনো প্রতিদিন বেকারভাতার জন্য আবেদন করে যাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ।কিন্তু সেই আন্দোলনের ফলাফলটা হল পরবর্তী দু’সপ্তাহে সেই সব অঙ্গরাজ্যে হঠাৎকরে নতুন করোনা পজেটিভ রোগীর সংখ্যা অত্যাধিক বৃদ্ধি, যার আশঙ্কা আগেই করা হয়েছিল।জানুযারী থেকেএই পর্যন্ত মোট কথা আমেরিকান মূলধারার গণমাধ্যমের খবরের কেন্দ্র বিন্দুতে কোভিড -১৯ ছিল এটা বললে অত্যুক্তি করা হয় না।

আমেরিকায় আসা অবধি একটা কথা বারবার শুনেছি , যে বড় বিপর্যয় এই এত বড়দেশের মানুষকে একসূতোতে বেঁধে দেয়। কিন্তু পত্রিকার পাতায় আর টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রেখে আমরা দেখতে পেলাম এইকথাটি এইবারে আর সত্যি থাকছে না।প্রেসিডেন্ট এর সাথে সুস্পষ্ট বিভেদ তৈরি হচ্ছে গভর্ণরের, আন্দোলনকারীদের সাথে হাসপাতলে দাঁড়িয়ে থাকা চিকিৎসক-নার্সদের। এই মহা-মহামারীতে আরো অনেক রকমের লুকোনো মহামারীর খবর পেলামআমরা, মানুষের মাত্রাহীন দুঃসাহস, অগাধ মুর্খতা, সীমাহীন লোভ। বেঁচে থাকার কিংবা জীবন ধারণের জন্য যেমন মানুষ চাইছিল সমস্ত ব্যবসাপাতি খুলে দেওয়া হোক, একই সঙ্গে বহু মানুষের ঔদ্ধত্য ছিল বিজ্ঞান কে অস্বীকার করার, এখনো বহাল আছে সেটা।সত্যি বলতে এই লুকোনো মহামারীর কারণেই বোধহয় আমরা আসল মহামারীর সঙ্গে পেরে উঠছি না। ধীরেধীরে সমস্ত কিছুই চালু হচ্ছে , যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে এইসমস্ত খুলে দেওয়াটাও বড্ড তাড়াতাড়ি হয়ে গেল।ঠিকএই রকম করে দোলাচলে শঙ্কায়-আশঙ্কায় আমরা মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে পা দিলাম। আমাদের গৃহবন্দীত্বের আড়াইমাস। মে মাসের ২৫তারিখ মিনিয়াপোলিসে ৮মিনিট৪৬ সেকেন্ড।গতবছরের গ্রীষ্মকালেই মিনিসোটার শান্ত, সুন্দর গোছানো শহর মিনিয়াপোলিসের রাস্তায় হেঁটে বেরিয়েছি অসীম আনন্দে, পৃথিবীর দীর্ঘতম নদী মিসিসিপি উৎস মুখ থেকে কিছু গড়িয়ে মিনিয়াপোলিসের ভেতর দিয়ে বইছে।শহরের সৌন্দর্যেই হোক, মিসিসিপির মোহেই হোক মিনিয়াপোলিস আমার কাছে বিশেষ হয়ে আছে। এটা ঠিক যে একটা শহরে না থাকলে সেখানকার পরিস্থিতি বোঝা যায় না, তবু আমি কখনো ধারণা করতে পারিনি আমার মুগ্ধতার চোখে দেখা মিনিয়াপোলিসে এমন ৮মিনিট ৪৬সেকেন্ড সময় আসতে পারে।সে সময় এলো একজন জর্জফ্লয়েডের শ্বাসরোধকরে, “ I can’t breathe” !!পুলিশের বর্বর আচরণে একজন নিরস্ত্র মানুষ কী অমানুষিক যন্ত্রণায় প্রাণ দিলেন। সমস্ত আমেরিকা ফুঁসে উঠলো এই ঘটনায়।এমন তো নয় যে এই প্রথম কোন আফ্রিকান আমেরিকানকে এভাবে মেরে ফেলা হলো আবার এমনও নয় যে পুলিশের এমন বর্বর আচরণ কোন নতুন ঘটনা।তাহলে এই উত্তাল গর্জন কীসের এবার !! পার্থক্যটা কী সে।পার্থক্যটাএইবার আপনি,আমি,আমেরিকা, সারাপৃথিবী সবাই একটা ছোট্ট কিন্তু অন্তহীন ভিডিও দেখছি।এইভিডিওটা ৪০১ বছরের নিস্পেষণের প্রতীক হিসেবে বারবার আপনার আমার কাছে ফিরেফিরে আসছে“ Black lives matter” ধ্বণি আছড়ে পড়ছে ঢেউয়ের মতো আগের চেয়ে বহু গুণহয়ে।স্বাভাবিক ভাবেই এরকম একটা ঘটনা গণমাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্র চলে আসে আবার আমাদের অভিজ্ঞতা এটাও বলে যে, যে কোন সমাজে নিষ্পেষিত ( suppressed) জনগোষ্ঠীর প্রতি ঘটে যাওয়া অন্য অনেক ঘটনা ততটা গুরত্ব পায় না গণমাধ্যমে।সুতরাং ধরে নেওয়া যেতেই পারত এই হত্যা আর আন্দোলন গণমাধ্যমে ততটুকু আলোড়ন তৈরি করতে পারবে না, বিশেষ করে আমরা যখন একটি বৈশ্বিক মহামারী পার হচ্ছি এবং আমেরিকার অবস্থা যথেষ্ট নাজুক।তবু সাধারণ কণ্ঠরোধের তত্ত্বটি ক্ষেত্রে সত্যি হয়নি।বরং সময়ের সাথে সাথে এই আমরা আরো জোরালো কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েছি।

আজ প্রায় একমাস হতে চলল ফ্লয়েড হত্যার।এখনো খবরের কেন্দ্র বিন্দুতে ফ্লয়েড হত্যা, আন্দোলন এবং তার বিচার। আন্দোলনের গতি প্রকৃতিগত একমাসে অসংখ্য মোড় নিয়েছে।আন্দোলন সহিংসতায় রূপ নিয়েছে, কোথাও কোথাও এক বর্বর আচরণের বিরুদ্ধে আন্দোলন থামাতে আরও সহিংস আচরণ করছে পুলিশ, আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশের আক্রমণেরশত-শত ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।পুলিশ আহতদেরকে সেবারত চিকিৎসকদের আক্রমণ করছে এমনও দেখা গেছে, মিনিয়াপোলিসে এবংডিসিতে সাংবাদিকদের উপর চড়াও হয়েছে।শুরুর দিকে আপাতদৃষ্টে একটি প্রতিবাদ মিছিল থেকে দু-চারজনের বিচ্ছিন্ন ভাঙচুর জন্ম দিয়েছে বড় সংঘর্ষের, আটলান্টায় সিএনএন ভবন ভাঙচুর এমন একটি ঘটনা। সময়ের সাথে সাথে আমরা দেখেছি নিউইয়র্কসহ দেশজুড়ে বিভিন্ন জায়গায় ভাঙচুর, লুটপাটেরঘটনা নিয়মিত ভাবে ঘটিয়ে চলেছেন বিক্ষোভকারীরা।দাঙ্গার ঘটনাও ঘটেছে, কার্ফিউ ভেঙ্গে।

সাংবাদিকদের শারিরীকভাবে আক্রমনও করেছেন তারা।বড় বড় সবদোকানপাট ভেঙ্গে লুটপাট করেছেন, লক্ষ করুণ শুধু বিক্ষোভের ক্ষণিক উত্তেজনায় ধ্বংস নয়, ব্যক্তি স্বার্থে লুট।ভিডিওগুলো দেখলে বারেবারেই একটা কথা মনে হয়এই নিছক দস্যুবৃত্তির জন্য এতবৃহৎ একটা “কারণ “ এতদীর্ঘকালের মুক্তির আন্দোলন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।রাষ্ট্রের উপরতলা থেকে সন্ত্রাস আখ্যা দিয়ে ব্যবস্থা নেবার আদেশ আশে সেই পুলিশের কাছে যার অমানবিক আচরণে ফ্লয়েডরা মারা যান দমবন্ধ হয়ে ।ঠিক এই জায়গায় দাঁড়িয়ে ভীষণ অস্থির লাগে। কেন যেন মনে হয় এই এত বড় একটা আন্দোলনের গায়ে এই কলঙ্ক লাগিয়ে আসল “কারণ”টাকেই হয়তো ব্যর্থ করে দেবে এরা। গত কয়েকদিন ধরে টানটান উত্তেজনা চলছে রাজধানীতে দাসপ্রথা সমর্থনকারী ভূতপূর্ব প্রেসিডেন্ট এন্ড্রুজ্যাকসনের ভাস্কর্য সরানো নিয়ে।আন্দোলনকারীরা ভেঙ্গে ফেলতে চাইছেন আর পুলিশ আছে পাহারায়।সন্ধ্যের পর সেই ভাস্কর্যের আশেপাশে যাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে।এর মধ্যে আরো বেশ কিছু জায়গায় দাস প্রথা সমর্থনকারী ব্যক্তিদের ভাস্কর্য ভাঙ্গাহয়েছে , সেজন্যই হয়তো বাড়তি পাহারা।লিবারাল আর ডেমোক্রেট রাজনীতিবিদের দ্বন্দ্ব, কখনো শান্তিপূর্ণ সমাবেশে পুলিশের বলপ্রয়োগ আবার কার্ফিউ ভেঙ্গে দাঙ্গা বা লুটপাট আন্দোলনকারীদের, ফলে আন্দোলন চলাকালীন পুলিশের ভূমিকা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠছে আবার কোথাও কোথাও আন্দোলকারীদের সীমাহীন অরাজকতায় পুলিশচাপের মুখেপড়েও প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। এই রকম বিপদজনক অবস্থাতেও বল প্রয়োগের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সংযম প্রকাশ করছে বলেও অনেক ক্ষেত্রে মনে করছেন কেউ কেউ।এতো অস্থির বিপরীত সময় যে, কোন উপসংহার টানা প্রায় অসম্ভব।

গণমাধ্যম গুলো বিবদমান দুই দিককে তুলে ধরলেও এই আন্দোলনের মূল সুরকে ভুলে চলমান অস্থিরতাকেই মুখ্য করে তুলেছে এমনটা আমার মনে হয়নি। বরংরেডিও , টিভি , স্থানীয় ও জাতীয় সংবাদপত্র আন্দোলনের খবর সংবেদনশীলতা আর দায়িত্বশীলতার সাথে প্রচার করছে, রেডিও –টিভিতে কৃষ্ণাঙ্গকৃতি ব্যক্তিদের মিউজিক, আর্ট , সামাজিক অবদান ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে অনুষ্ঠান প্রচারিত হচ্ছে, তাঁদের কাজেরএবংসৃষ্টির প্রতি সম্মান জানাতে, সকল কেমনে করিয়ে দিতে যে তাঁরা এই বহু মাত্রিক জাতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।এত বৈষম্য আর বাঁধা ঠেলে ও তাঁদের অবদান অসামান্য।

গণমাধ্যম গুলো বিবদমান দুই দিককে তুলে ধরলেও এই আন্দোলনের মূল সুরকে ভুলে চলমান অস্থিরতাকেই মুখ্য করে তুলেছে এমনটা আমার মনে হয়নি। বরংরেডিও , টিভি , স্থানীয় ও জাতীয় সংবাদপত্র আন্দোলনের খবর সংবেদনশীলতা আর দায়িত্বশীলতার সাথে প্রচার করছে, রেডিও –টিভিতে কৃষ্ণাঙ্গকৃতি ব্যক্তিদের মিউজিক, আর্ট , সামাজিক অবদান ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে অনুষ্ঠান প্রচারিত হচ্ছে, তাঁদের কাজেরএবংসৃষ্টির প্রতি সম্মান জানাতে, সকল কেমনে করিয়ে দিতে যে তাঁরা এই বহু মাত্রিক জাতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।এত বৈষম্য আর বাঁধা ঠেলে ও তাঁদের অবদান অসামান্য।

মূলধারারগণমাধ্যম ছাড়াও বিকল্প হিসেবে আছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।এর বাইরেই আমার কাছে ভীষণ শক্তিশালী একটি মাধ্যম মনে হয়েছে গ্রাফিতি। বিভিন্ন শহরের দেয়ালে দেয়ালে ভীষণ শক্তিশালী বার্তা ফুটে উঠছে ছবির মাধ্যমে।তার মধ্যে একটি ছবিতে জর্জফ্লয়েডের আকুতি ভরা ভীষণ ভাববেই জানান দেয় একটি অসম সমাজব্যবস্থার অভিশাপের।আমরা ও হঠাৎ টের পাই আমাদেরও নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।আরেকটু শ্বাস নিতে পারলে বেঁচে যাই আমরা সকলেই।

সত্যি বলতে আমার নিজের বাদামী রঙ নিয়ে আমি যে কিছু কম ধাক্কা খাই তা নয়।সেটা দৈনন্দিন জীবনযাপনেও টেরপাই। সাধারন এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে একটা অভিযোগ করলেও টের পাওয়া যায়।কিন্তু আমেরিকার উত্তরের স্টেটগুলোতে এইসমস্যা আরও প্রকট।আর সৌভাগ্য এইযে আমার আমেরিকান বন্ধুরা আদতেই মানুষ এবং তারা বরংএই সব অসমতার বিরুদ্ধে যথেষ্ট সোচ্চার।এছাড়াও গ্র্যাজুয়েট ছাত্ররা মোটামুটি একটা আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলের মধ্যে থাকে বলে কমিউনিটির আবদ্ধ ভাব যদিও বা থেকে থাকে, অতটা চেপে ধরতে পারে না, মেলামেশার কোন সাধারণ জায়গাটাতে মন থাকে না বলে।

ইতিহাসের পুরোনো দিনে না ফিরলেও বোঝা যায় এই বর্তমান আন্দোলনের নানা মুখীদিক আছে।এই আন্দোলনে শুধু কৃষ্ণাঙ্গদের দেখা যাচ্ছে তা নয়, এখানে উল্লেখযোগ্য সংখক নতুন প্রজন্মের শ্বেতাঙ্গদের দেখা যাচ্ছে , দেখা যাচ্ছে হিসপানিকসহ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষ।একদিকে বর্ণবিদ্বেষ উষ্কে দেবার লোকজন যেমন রয়েছে তেমনি আছেন খোদরাজধানী ওয়াশিংটন ডি. সি রমেয়র ম্যুরেল বাউসার , যিনি হোয়াইটহাউসে যাবার পুরো রাস্তা জুড়ে লিখে দিয়েছেন “Black lives Matter”। আমারবিশ্ববিদ্যালয় ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা “ ফ্রান্সিসওয়ালিসএপস” ভাস্কর্য সরিয়ে ফেলার ক’বছরের পুরোনো দাবী নতুন করে গতি পেয়েছে।এপস ব্যক্তিগত ভাবে দাস ব্যবহার করতেন এবং দাস প্রথা টিকিয়ে রাখার জন্যসক্রিয় ছিলেন।এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংগঠন ভাবছে এই ভাস্কর্য দাস প্রথার মত ঘৃণ্য ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে সক্রিয় একজন ব্যক্তিকে মহিমান্বিত করেএবংএকই সাথে তাদের কৃষ্ণাঙ্গ, ছাত্র ছাত্রীওশিক্ষক- কর্মচারীর পক্ষে অবমাননাকর।একই কারণে ভার্জিনিয়ার গভর্ণর সরিয়ে ফেলার আদেশ দিচ্ছেন রবার্টই. লীর ভাস্কর্য।ফ্লয়েডের জন্য পথে নামছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ। এই উত্তাল আন্দোলনের খবরে আপনার মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, ”তাহলেএই যে চলমান মহামারী তার কথা কি লোকে ভুলে গেল ? বিশেষ করেএমন মহামারী যা ছড়ায় নিশ্বাসে, মানুষের কাছে আসাটাই যেখানে দায় সেখানে এই প্রাণঘাতি মহামারীর উপর এই আন্দোলনের প্রভাব কী? গণমাধ্যমের ভূমিকাটা ই বাকী আর বিশেষজ্ঞরাই বা কীভাবছেন?”

ফ্লয়েড হত্যা কিংবা এই বর্ণবাদের বিরুদ্ধে করা আন্দোলনের সাথে মহামারী আরো ব্যাপক আকার ধারণ করার কোন সম্পর্ক আছে কীনা সেটা খতিয়ে দেখছেন অনেকে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ঘরে থেকে আর্থিকএবংমানসিক ভাবে ভঙ্গুর হবার ফলে মানুষের ক্ষোভ, হতাশা, দু:শ্চিন্তা, ভয়, অনিশ্চয়তা এমন কোন জায়গায় চলে গেল কিনা যেখান থেকে বিদ্রোহের স্ফুরণটা খুব সহজাত হয়ে গেছে।নাকি ঠিক এইখানেই লুকিয়ে আছে নতুন দিনের আলো ? আশা?

সংগৃহিত ছবি

এইচ.বি.ও. চ্যানেলের জনপ্রিয় উপস্থাপক বিলমাহের তো বলেই দিলেন, কোভিড-১৯ এর কারণে “ ঘরেথাকা “ নিয়ে দায়িত্বহীন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলেই মানুষ হতাশা আর অস্থিরতার থেকে ফ্লয়েডের মৃত্যুতে অতি-প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।অথচ আন্দোলনে অংশগ্রহনকারীদের সাক্ষাৎকারে দেখা যায়, তারা বলছেন তাদের ভেতর ফ্লয়েডের দমবন্ধ হয়ে যাবার অনুভূতি অনুরিতহয়েছে নিষ্পেষনের কারণে, দীর্ঘকালের নিরাপত্তাহীণতার বোধ আর বঞ্চনার বেদনা সব যেন ফ্লয়েডের জীবনের শেষ ৯মিনিটে এসে প্রতিফলিত হয়েছে।তারা মুক্তিচান আর এই কারণেই বিচারের দাবীতে পথে নেমে আসাটা তারা নৈতিক দায়িত্ব বলেই ভেবেছেন।আমেরিকার উপাত্ত বিশ্লষণকারী প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ (Gallup) বিভিন্ন বিষয়ে উপর জনমত জরিপ করে থাকে, গ্যালপ জরিপে দেখেছে যদিও করোনার প্রাথমিক ধাক্কা কাটাবার পর বেশীর ভাগ মানুষ ইতিবাচক অণুভূতির দিকে মনযোগ দিচ্ছিলেন কিন্তু মে মাসের শেষদিকে জর্জফ্লয়েড হত্যাএবংতার প্রতিবাদ শুরু হবার পর থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আমেরিকান ক্ষোভ , হতাশা , বিষণ্ণতা , দুঃখ, ভয়ের মত নেতিবাচক অনুভূতিগুলো বোধ করছেন বেশী ! ৫0 শতাংশের বেশী মানুষ মানসিক চাপবোধ করছেন। এদিকে কোভিড-১৯এর প্রক্ষাপটে রাজ্যগুলোর সব ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়াতে অপেক্ষাকৃত মধ্য বয়স্ক ও বয়স্করা রাগ ও ক্ষোভ বোধ করছেন।এটা অবশ্য গ্যালপের অন্যান্য সমসাময়িক বিষয়ের উপর জরিপের মতই একটি জরিপ।

এদিকে গণমাধ্যম যেমনি এসব চুলচেরা বিশ্লেষণ প্রচার করছে, আলো ফেলছে বিভিন্ন দিক থেকে, তেমনি এটি যে একটি মহামারীর সময় সেটিও মনে করিয়ে দিতে ভুলছে না।আমেরিকান অর্থণীতি সচল করার জন্য সব অঙ্গরাজ্য থেকে ধীরেধীরে বিধিনিষেধ তুলে নেবার পর এমনিতেই গবেষকরা আশঙ্কা করছেন যে, করোনা সংক্রমনের হার আবার দু’মাস আগের মতই যে যাবে, এমন কি বেশীও হতে পারে।মানে নেট ফলাফল শূণ্য। এখনই ফ্লোরিডা, সাউথক্যারোলাইনা, টেক্সাস , এরিজোনা , অরিগনসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে প্রতিদিন মার্চ-এপ্রিলের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণহারে নতুন সংক্রমন হচ্ছে।ফলে এই গনজমায়েত বিক্ষোভ যে আগুণে ঘি ঢালবেই সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। এদিকে এপ্রিল মাসে “ঘরেথাকার” আদেশের বিরুদ্ধে আন্দোলনটা যখন হয় আন্দোলনকারীরা শুধু অচল অর্থনীতি সচল করার দাবী জানিয়েছেন তা নয়, তারা মহামারীরে প্রতিরোধে সংক্রান্ত সমস্ত নিয়মাবলী মানতে অস্বীকার করেছেন।আপনি যদি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পুণ:নির্বাচনের প্রচারণার দিকে লক্ষ্য করেন , তাহলেও দেখবেন সেখানেও একই কান্ড।গত ২০ তারিখেও কলাহামারটালসাতে ট্রাম্পের প্রথম নির্বাচনী সভায় যেখানে প্রায়১৯ হাজার লোক ইনডোর একটি ভেন্যুতে জড়ো হবেন জেনেও , হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারী ঘোষণা করেছেন , যে তিনি মাস্ক পরবেন না।ফলে যাদের ইশারা পাবার তারা নিশ্চিত ভাবেই তা পেয়েছেন।যদিও সভাটিতে শেষ মুহূর্তে ৬ হাজার সমর্থক উপস্থিত হয়েছেন।প্রত্যাশার তুলনায় এত কম সমর্থকের উপস্থিতি প্রসিডেন্টকে বাক্রুদ্ধ করেছে।কারণ তিনি এই অনুষ্ঠান সফল করে তার “পলিটিক্যালওপেনিং” এর বার্তা দিতে চেয়েছিলেন। এরইমধ্যে যে বিপুল সংখ্যকমানুষ একটি আবদ্ধ জায়গায় এসে মাস্ক ছাড়া কাছাকাছি দাঁড়িয়ে কথা বলছেন সেটিও অত্যন্ত ঝুঁকির কারণ হয়ে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে।প্রসিডেন্ট ট্রাম্পের এই পলিটিক্যঅল ওপেনিং শুরুহলো এমন একসময়ে যখন ঘরে থাকার নির্দেশ তুলে নেবার পর যখন দেশ জুড়ে সংক্রমণে হার আবার উর্দ্ধমুখী, ড. ফাউচি যাকেবলছেন “Disturbing surge in infection “ !! এরই মধ্যে ট্রাম্প পৌঁছে গেছেন এরিজোনায় যেটি এখনকার নতুন কোভিড হটস্পটগুলোর মধ্যে একটি। সেখানে সামিজিক দূরত্বের কোন বিধিনিষেধ না মেনেই সম্পন্ন হয়েছে তার দ্বিতীয় র্যা লী যদিও প্রসিডেন্টের নিজের কোভিড টাস্ক ফোর্সের নির্দেশনাও মানা হচ্ছে না।

রাজনীতির সূতোয় বরাবর নিয়ন্ত্রিত হয় মানুষের জীবন, কিন্তু এই রকম বেপরোয়া ভাবে একটি মহামারীকে তুচ্ছ করার সাহস দেখলে আশ্চর্য হতে হয় বটে!! হয়ত নিকট অতীতে, অন্তত গত দুই প্রজন্মে, এত ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়া কোন মহামারীর স্মৃতি আমাদের নেই বলেই এরবিধ্বংসী ক্ষমতা অনেককে ভাবায় না।পৃথিবীর ঘোরতর দুর্দিনে দুর্বিনীত মানুষ তবু সুযোগ খুঁজে চলে ব্যক্তিগত মুনাফার।কিছুতেই বুঝতে চায়না, বাঁচলে সকলেএক সাথেই বাঁচতে হবে আর বাঁচতে হবে প্রকৃতির সাথে সহাবস্থানে, প্রকৃতিকে আঘাত করে বাঁচার পথ নেই।

দাসপ্রথা বিলুপ্ত হয়েছে দেড়শ’ বছরের উপর, কিন্তু দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে আমাদের মুক্তি ঘটেছেকী ? আমরা আজও আমাদের মনের বিদ্বেষের শেকল পড়ে আছি, পারস্পরিক ঘৃণার দাসত্বে বন্দী হয়ে রয়েছি।এই শেকল না ভাঙলে, ঘৃণা থেকে মুক্ত না হলে আদতেই আমাদের মুক্তির কোন পথ নেই।এই যে এতবড় দুঃসময় পার হচ্ছি আমরা।সবাই ভেঙ্গেপড়ছি রোগে, শোকে,একাকীত্বে,শংকায়-আশঙ্কায় লড়ছি অদেখা এক ক্ষুদ্র অনুজীবের বিরুদ্ধে, যে কীনা যেকোন সময় আমাদের ইশ্বাসযন্ত্রে বাসা বেঁধে আমাদেরই শ্বাসরোধ করবে।কী অসহায় এই সময় যেখানেপৃথিবীর কত মানুষ ন্যুনতম চিকিৎসাও পাচ্ছেন না, অসম্ভব যন্ত্রণায় মারা গেছেন লক্ষ লক্ষমানুষ।কত বড় হবে এই মৃত্যুর মিছিল জানে না কেউ !!!

এই সময় আমাদের একে অন্যে পাশে থাকার কথা, না হয়- দূরে থেকেও পাশে থাকা। অথচ কী নিদারুণ নিষ্ঠুরতায় আমরা এই সময়েও পারি একজন জর্জফ্লয়েডের শ্বাসরোধ করতে!! এই দহনকাল কবে শেষ হবে??

লেখক: পম্পা ঘোষ
সাবেক গণমাধ্যমকর্মী ও
ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভারসিটিতে হাইএনার্জি ফিজিক্স পিএইচডি গবেষণারত।