ঘরের নীরব করোনাযোদ্ধা মায়েরা

ফারাহ জাবিন শাম্মী

ওরা থাকে আড়ালেই। এ আর নতুন কি ? বরাবরই তো থাকে। তবুও বলছি এবারের করোনাযোদ্ধা মায়েদের কথা। এ কথা শোনা মাত্রই কেউ আমাকে এক্সট্রিম লেভেলের ফেমিনিস্ট বলে দুচারটা কথাও শুনিয়ে দিতে পারেন, অসুবিধে নেই। তবুও আমি এ যুদ্ধে মায়েদের জয়গান গাইবো। ঘরে শুয়ে বসে মায়েরা আবার করোনাযোদ্ধা হলো কি করে?

সম্মুখসারির করোনাযোদ্ধাদের কথা আমরা শুনেছি, দেখেছি কিন্তু চোখের সামনে দিনরাত ঘরে ঘরে করোনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা মায়েদের কথাটি কি ভেবেছি কখনও? লকডাউনের দিনগুলোতে পাশে নেই সাহায্যকারী, তার ওপর সকাল থেকে রাত অবধি পরিবারের সকল সদস্যকে সুস্থ রাখতে মায়েদের উপর এসেছে বাড়তি অনেকগুলো দায়িত্ব। গুণে শেষ করা যাবেনা। আসলে মায়েদের কাজের কোন হিসেব থাকেনা কারন এর বিনিময়ে মাস শেষে মোটা অঙ্কের একটা বেতন মেলেনা। করোনার প্রাথমিক সমাধান নাকি রান্নাঘরেই । সকল রকমের মশলা দিয়ে চা বানিয়ে খাওয়াও, ভাপ নেয়া, ঘর দরজা জীবানুমুক্ত করা তো আছেই।পাশাপাশি পরিবারের সকলকে সেগুলো মানতে বাধ্য করা সহ করোনাদিনে ঘরে আরও অনেক বাড়তি কাজ যোগ হয়েছে যা আমরা সবাই কমবেশি জানি। আর এসবকিছুই সামাল দিতে হচ্ছে একজন মাকেই।

স্যোশাল মিডিয়ার কৌতুক নারীর মানসিক নির্যাতনের আরও একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। এই কৌতুকগুলো কেবল স্যোশাল মিডিয়ায় শেয়ার হবার মধ্যেই থেমে থাকেনা।পুরুষটি তা আবার সুকৌশলে নারীকে শুনিয়েও ছাড়েন।

১৬ কোটি জনসংখ্যার এ দেশে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাদ দিলে যা থাকে সেই প্রতিটি মানুষকে করোনার থাবা থেকে বাঁচাতে ঘরে ঘরে নীরব যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন মায়েরা। মায়েদের অসুখ হতে নেই , হালকা জ্বর, মাথাব্যথা এসবের জন্য মায়েরা কখনও ওষুধ খাননা । মন চাইলেই মায়েরা ‘আজ রান্না করতে ইচ্ছে করছেনা’ বলে যেতে পারেন না বিশ্রামে। মায়েদের অসুখ হতে নেই বা হলেও অসুখে কাতর হতে নেই।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে করোনাসময়ের ঘরের কাজ নিয়ে বিভিন্নভাবে ট্রল করে একজন মাকে বা নারীকে যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে আপাতদৃষ্টিতে এগুলো হাসির খোরাক মনে হতে পারে। কিন্তু এগুলো যে লক্ষ লক্ষ মায়ের অপমান সেটা যেন আমরা ভুলে না যাই।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে বাংলাদেশে মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে সরকার ‘সাধারণ ছুটি’ ঘোষণা করে, যা কার্যত লকডাউনে পরিণত হয়। ছুটি শুরু হলে পুরুষরাও ঘরবন্দী হতে বাধ্য হয় । প্রথম কিছুদিন মোটামুটি ছুটির আমেজে কাটালেও পরবর্তীতে কয়েকদফা সাধারণ ছুটি বেড়ে যাওয়ায় অধিকাংশ পুরুষেরই ঘরবন্দীর মতো সম্পূর্ণ নতুন একটি বিষয়ের সাথে খাপ খাওয়াতে বেধে যায় গন্ডগোল । পুরুষালি মনকে ঘরে আটকে রাখতে তৈরি হয় মানসিক দ্বন্ধ। সাথে যোগ হয় জীবন ও জীবিকার সংঘাত।

মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোতে কাজের সহায়তার জন্য সাহায্যকারীর উপর অনেকটাই নির্ভরশীল নারীরা। কিন্তু করোনাকালীন অধিকাংশ বাসাই এখন গৃহকর্মীশূণ্য।স্কুলকলেজ ছুটি হওয়ায় সন্তানেরা ঘরে, অনেকের বাসায় আছে ছোট বাচ্চা। সারাদিন হইহুল্লোড়, ছুটাছুটি। এসকল কিছুর চাপে চ্যাপ্টা হচ্ছেন একেকজন মা। সহায়তার জন্য পুরুষটির ডাক পড়লেই বেধে যাচ্ছে গন্ডগোল। কিছুদিনের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার প্রতিফলন ঘটে। বিভিন্নরকম কৌতুকের মাধ্যমে দেখানো হয় একজন অত্যাচারী নারীকে। যিনি কিনা আরাম করে দিনানিপাত করছেন এবং পুরুষটিকে খাটিয়ে মারছেন।

একটি কৌতুকে দেখা যায় নারীটি ফোন করে ভয় দেখাচ্ছেন তার স্বামীকে ‘কাজগুলি কর না হয় ফোন দিয়ে বলব এ ঘরে করোনা রোগী আছে’। অন্য একটিতে দেখা যায় ‘নারীটি কোলে করে তার স্বামীকে অফিস নিয়ে এসেছেন’। এই কৌতুকগুলোর ছবিতে নারীকে দেখানো হয় মোটা , দজ্জাল বা রেগে থাকা খিটখিটে স্বভাবের একজন নারীকে।এরকম অসংখ্য ফেসবুকীয় কৌতুক প্রকাশ্যে একজন নারীকে সর্বোপরি একজন মাকে অপমান করা হচ্ছে হাসিখুশি মনে, নিজেদের খেয়ালে। আপাতদৃষ্টিতে এগুলোকে হাস্যরসের খোরাক মনে হলেও এর প্রতিটি কথা পুরুষ নিজের মনে ধারণ করে, লালন করে এবং বিশ্বাস করে। তারা ঘরের টুকিটাকি কাজ করে নিজে একধরনের মানসিক অশান্তিতে ভোগে। আর এটাকে একসময় নারীর প্রতি নির্যাতনের পর্যায়ে নিয়ে যায় শারিরীক এবং মানসিকভাবে। এমনটা যে শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা নয়।বিশ্বব্যাপী লকডাউনে নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা বেড়ে গেছে। আর আমাদের দেশে এমনিতেই পারিবারিক সহিংসতার মাত্রা বেশি । লকডাউনে এটা আরো বেড়েছে এবং দিন যত যাচ্ছে এ নির্যাতনের হারও বাড়ছে। এখন অনেক অফিস খোলে গেলেও পুরোদমে শুরু হয়নি এখনও। তার উপর রয়েছে এলাকাভিত্তিক লকডাউন।

গত ১০ জুন মনুষের জন্য ফাউন্ডেশান তাদের ‘নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা কোভিড-১৯’ শীর্ষক জরিপ প্রতিবেদনে গত এপ্রিল মাসের তুলনায় মে মাসে নারী ও শিশুর উপর নির্যাতন বেড়েছে ৩১ শতাংশ বেড়েছে এমন তথ্য উঠে আসে। ‘টেলিফোন কুইক সার্ভিস’ নামে এই প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ৫৩টি জেলায় মে মাসে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন মোট ১৩ হাজার ৪৯৪ জন নারী ও শিশু। এর মধ্যে নারী ১১ হাজার ৩২৩ জন এবং শিশু দুই হাজার ১৭১ জন। মে মাসে নতুন করে নির্যাতনের শিকার হয়েছে হয়েছে চার হাজার ১৬০ জন নারী ও শিশু। এর মধ্যে নারী দুই হাজার ৮৪১ জন এবং শিশু এক হাজার ৩১৯ জন। এপ্রিল মাসে শুধু নারী নির্যাতন হয়েছিল দুই হাজার ৪৫৫ জন। এদিকে প্রতি ১০ জনে ছয় জন শিশু নতুনভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আর প্রতি চার জন নারীর মধ্যে একজনের বেশি নতুনভাবে সহিংসতার শিকার হয়েছেন। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী মোট নিপীড়িত ১১ হাজার ৩২৩ জন নারীর মধ্যে ১১ হাজার ২৫ জন অর্থাৎ শতকরা ৯৭ দশমিক ৪ জন নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার। নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে স্বামীর হাতে। দীর্ঘ লকডাউনে অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় নারীর এ শিশুরা নির্যাতনের শিকার হবার কথা বলা হয়েছে এ প্রতিবেদনে। তবে আমাদের দেশে এসব জরিপগুলো অপেক্ষাকৃত নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে কেন্দ্র করে করা হয় বলে প্রকৃত চিত্র উঠে আসেনা। এর ফলে মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোর নারীরা বারিবারিক সহিংসতার বিষয়টি প্রকাশ করেনা। যে কারনে অসংখ্য মানসিক চাপ সামলেই একজন নারীকে সংসারের সকল বোঝা টেনে যেতে হয় । স্যোশাল মিডিয়ার কৌতুক নারীর মানসিক নির্যাতনের আরও একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। এই কৌতুকগুলো কেবল স্যোশাল মিডিয়ায় শেয়ার হবার মধ্যেই থেমে থাকেনা।পুরুষটি তা আবার সুকৌশলে নারীকে শুনিয়েও ছাড়েন।

যে কথা বলছিলাম একজন নারী কি করে করোনাযোদ্ধা হলো? আমি এক্ষেত্রে একটি উদাহারণ তুলে ধরছি মাত্র। কয়েকদিন আগে আমার মেয়ের স্কুলের একজন গার্ডিয়ানের সাথে কথা বলছিলাম । উনার দুই ছেলেমেয়ে, ঘরে আছেন শ্বশুর শাশুড়ি।বাসার সকলের খাওয়ার প্রচন্ড বাতিক। এর মধ্যে সাহায্যকারী ছুটি দিয়েছেন লকডাউনের শুরুতেই। হাজব্যান্ড করছেন হোম অফিস। অগত্যা সকল কাজের দায়িত্ব তার উপরেই । জিজ্ঞাসা করলাম, কি করে সামাল দেন এতকিছু ? তার উপর করোনার জন্য বাড়তি অনেক দায়িত্ব। উনি যা বললেন তার কয়েকটা মাত্র তুলে ধরছি।করোনার জন্য পরিবারের সবাইকে সুস্থ রাখতে তিনি যা করেন :

  • সকাল ছয়টায় ঘুম থেকে ওঠে সকলের জন্য কুসুম গরম পানিতে লেবু , মধু বা আরও যা আমরা যা শুনেছি করোনা প্রতিরোধে কাজ করে সেগুলো একবার সকলের জন্য বানিয়ে দেন এবং ছোট বাচ্চাটা খেতে চায়না কার পেছনেও ছুটতে হয় খানিকটা।
  • তারপর সকালের নাস্তা শেষে আবারো মশলা, আদা, লেবুর চা খাওয়ানো সবাইকে।
  • এই ফাঁকে তিনি ঘরের সকল দরজা লকগুলো পরিস্কার করে জীবানুমুক্ত করে নেন কারন চঞ্চল ছোট মেয়েটা একটু পরই এগুলোতে হাত দিবে।
  • কোন সবজি বা টুকিটাকি বাজার আসলে সেগুলো আগে ধুয়ে মুছে জীবানুমুক্ত তাকেই করতে হয়।
  • বাসার সবাইকে গরম পানি খাওয়াতে হবে এর মধ্যে আছেন বয়স্ক দুজন এবং ছোট মেয়েটি তারা ঠিকমতে খেল কিনা হাত ধুইলো কিনা সে খোঁজও তাকেই নিতে হয় ।

এরকম আরো অনেক কাজ তিনি করে যাচ্ছেন পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে। আর নিজের খেয়াল? ডায়বেটিস কখনও ১৬ কখনও বা ১৪ । ৩৪ বছর বয়সেই । বললেন, “এসবের সময় পাইনা ভাবী? নিজের কথা ভাবিনা।”

এটা আসলের একটি পরিবারের একজন মা বা নারীর কথা হলেও বেশিরভাগ পরিবারের বর্তমান করোনাকালীন বাস্তব চিত্র। প্রতিটা ঘরের একজন মা বা একজন নারী এখন সাহায্যকারী ছাড়া এমন একটা পরিস্থিতির মধ্যে থেকে করোনার বিরুদ্ধে নীরবে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন , সে খোঁজ আমরা কজন রাখি? ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে তবে ব্যতিক্রম কোনকিছুই উদাহারণ নয়। বেশিরভাগ পরিবারগুলোর বাস্তব চরিত্রটা জানা থাকলে বা অনুধাবন করার ক্ষমতা থাকলে এরকম কৌতুক করে একজন নারীকে বা মা কে অপমান করা থেকে আমরা মুক্ত থাকতাম । করোনাকালীন লকডাউনে নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে সুস্থ রাখার স্লোগানটিতেই বেশি জোর দিয়ে বলা হচ্ছে। তাই আমরা যেন এমন দুর্যোগের সময় ঘরের নীরব করোনাযোদ্ধা মায়েদের আর অপমান না করি বরং পাশে থেকে সহযোগিতা করি। না পারলে যাতে মানসিক সাপোর্টটুকু দিতে পারি সবাই সেরকম মানসিকতা তৈরি হোক আমাদের। এসব নীরব করোনাযোদ্ধা মায়েদের কথা সরকারি করোনাযোদ্ধার তালিকায় ঠাঁই পাবেনা, তার কাজের জন্য ঘোষণা হবেনা কোন প্রণোদনা। তাই অন্তত তার পাশে থেকে সম্মান জানাই। ঘরের মা অথবা একজন নারী মানেই নয় ‘জীবন মানে জি বাংলা’ অথবা নাটকের কুটনামি চরিত্রের কেউ। অথবা এমন নয় পাশের বাসায় সারাদিন ‘শুনছেন ভাবী ? ‘

লেখক: ফারাহ জাবিন শাম্মী, সম্পাদক, লুক