সাংবাদিকতার যে স্বাধীনতা সেটা কী আদৌ পাচ্ছি বা পেয়েছি?

কামাল লোহানী

পথিকৃৎ, নির্মোহ এবং সৎ এই তিন গুনের মিশেল সাংবাদিকতায় বিরল। সাংবাদিকতার নানা মন্দাকালে যিনি নক্ষত্র হয়ে ছিলেন, তিনি কামাল লোহানী। কোন ক্ষমতা বলয়ের সঙ্গেই আপোষে যাননি তিনি। বরং তার দৃঢ় ব্যক্তিত্বের কাছে বরাবরই নমিত হয়েছে ক্ষমতার রক্তচক্ষু। বিদায় নিলেন সেই বিরল মানুষটি। মাধ্যমের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা। ৮৫ তম জন্ম দিনে ধানমন্ডিতে মেয়ে বন্যা লোহানীর বাড়িতে সাক্ষাৎকারটি নেয়া। পাঠকদের জন্য সাক্ষাতকারটি প্রকাশ করছে ‘মাধ্যম’-

প্রস্তুতি: দল মনস্কতার বাইরের একজন মানুষ হিসেবে আমি এবং আমরা জানি তাকে। নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শ, দর্শন আছে। কিন্তু যখন সমাজ, রাজনীতি এবং সংস্কৃতিকে দেখেন, তখন তার চোখ নির্মোহ। মুক্তিযুদ্ধ, সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং সমাজ নিয়ে নানা সংকটের কালে মুখোমুখি হয়েছি তাঁর। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এক জায়গায় স্থির থাকেনি। নতুনকে বরন করেছেন পচাঁশি বছরের ‘তরুণ’। পঁচাশিতে প্রবেশের দিন লোভ হলো কথা বলার। স্বভাবসুলভ ভাবে এবারও তিনি ফেরালেন না।

আপনাকে অভিনন্দন পঁচাশিতে প্রবেশ করলেন। এই পঁচাশিতে এসে আপনাকে বলতে হচ্ছে যে, জনগণের ওপর বিশ্বাস রাখুন। কাদেরকে বলছেন?

এটা আমি নিজেকেও বলছি এবং সেই সঙ্গে জনগণকে বা আমরা যারা মানুষের জন্য কাজ করি তাদেরকেও আমাদের বলতে হচ্ছে আজকাল যে, জনগণের ওপরে বিশ্বাস রাখতে হবে। জনগণ বিচ্ছিন্ন হলে রাজনীতি যেমন করা যায় না তেমনি অন্যান্য পেশার কাজও সঠিকভাবে করা যায় না। এটা আমার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।

আপনি বললেন রাজনীতি করা যায় না এবং অন্যান্য কাজও করা যায় না। সেই জায়গা থেকে আপনার কি মনে হয়েছে যে, এই পর্যায়ে এসে আমাদের রাজনৈতিক আন্দোলন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, সামাজিক আন্দোলন সব আন্দোলন কী জন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বা পড়তে যাচ্ছে?

পড়তে যাচ্ছে বলবো না, পড়েছে। তার কারণটা হচ্ছে, রাজনীতি যে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সেটা তো আমরা সর্বক্ষণই প্রত্যক্ষ করছি। জনগণকে নিয়ে যে নৈতিকতার চর্চা করা হয় সেটাই রাজনীতি। সেখানে আমরা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি। তার কারণটা হচ্ছে, আজকে যখন আমি কোনো পদক্ষেপ সরকার গ্রহণ করুক সেটা যদি ভালো হয় আমরা তাকে ভালো বলবার জন্য চেষ্টা করি এবং যদি ভালো না হয় তাহলে আমরা বলি এটা ঠিক হচ্ছে না বা তার সমালোচনা করি। সমালোচনার ভাষাটা কখনো খুব কড়া হয় আবার কখনো মৃদুও হয়। মৃদু হলে সরকার হয়তো সেটা গ্রাহ্য করেন না, কড়া হলে আবার সেটা গ্রাহ্য করেন। এই শব্দ ব্যবহারের মধ্যে যে সরকারের প্রতিক্রিয়াটা ব্যক্ত হয় সেটাতে গিয়ে কিন্তু আমাদের হোচট খেতে হয়। এই জন্যে আমার কাছে মনে হয়, রাজনীতি, সংস্কৃতি সর্বক্ষেত্রেই যে জনবিচ্ছিন্নতা ইদানিংকালে লক্ষ্য করছি এটা খুব পীড়াদায়ক হচ্ছে। মানুষ কেমন যেনো নিশ্চুপ হয়ে গেছে। কোন কিছুতেই তারা কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারছেন না। প্রতিক্রিয়া হয়তো ব্যক্ত করছেন, ভেতরে ভেতরে কিন্তু বাইরে কখনো প্রকাশ করতে পারছেন না। কারণ, নেতৃত্ব নেই। রাজনৈতিক নেতৃত্ব না থাকলে জনগণ তার কথাগুলো কখনোই সরবে বলে না। সেই জায়গাটায় একটা ভীষণ রকমের ঘাটতি আমাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে।

এই রাজনীতিকে যদি আমি কেন্দ্র ধরি তাহলে এই রাজনীতির কাছে আসতে হলে তো সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের দরকার আছে। সেখানেও নেতৃত্বের সংকট আছে?

অবশ্যই। কারণ, রাজনীতি এবং সংস্কৃতি এটাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার থেকেই বলতে পারি যে আমি রাজনীতির সাথেও সম্পৃক্ত, আমি সংস্কৃতির সাথেও সম্পৃক্ত আবার পেশাগতভাবে সাংবাদিকতার সাথেও সম্পৃক্ত। লেখালেখিতো করেই যাচ্ছি। সুতরাং এই যে জিনিসগুলোর সঙ্গে যুক্ত আমরা। আমার তো মনে হয় প্রত্যেকটা জিনিসের সঙ্গেই রাজনীতি জড়িত আছে। এবং জড়িত থাকা মানেই হচ্ছে একটা অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আজকে রাজনীতি এবং সংস্কৃতি কখনোই আলাদা হতে পারে না। এটা পরস্পরের পরিপূরক।

জনবিচ্ছিন্নতা তৈরি হল কেন?

জনবিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে যেটা আমাদের দেশের মানুষের মৌলিক যে জিনিসটা সেটা হল একটা স্ট্যাবলিশমেন্ট বিরোধী মানসিকতা অর্থাৎ সরকার বিরোধী মানসিকতা। আর সরকারে যারা থাকেন তাদের প্রতি সবসময় একটা সমালোচনামূলক দৃষ্টি বা বক্তব্য মানুষ রাখে। সবসময় বলবে হয়তো আগের জামানায় আমরা ভালো ছিলাম। এই জামানায় আমাদের দিনগুলো খুব খারাপ যাচ্ছে। এই যে প্রতিক্রিয়াটা ব্যক্ত করে মানুষ সেটা রাজনৈতিক যে চিন্তাভাবনা ভেতরে ভেতরে মানুষের মধ্যে আছে সেটা থেকেই তারা এটা করেন। সেকারণেই আমার মনে হয় রাজনীতি এবং সংস্কৃতি, সঙ্গে সঙ্গে সমাজটা এখন তো ভাঙতে ভাঙতে এমন একটা অবস্থার মধ্যে গেছে যে আমি সামাজিক আন্দোলন বলতে খুব একটা চাই না। এখন রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক এই আন্দোলনটাই আমরা সঠিকভাবে করতে পারতাম তাহলে কিন্তু জনগণ থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন হতাম না। আজকে রাজনীতিটা একপেশে এবং কুক্ষীগত হয়ে যাওয়ার কারণে আজকে আমাদের এই দূরবস্থাটা মেনে নিতে হচ্ছে

বলছিলেন সমাজটা ভাঙতে ভাঙতে এমন পর্যায়ে গিয়েছে, সমাজকে কি আর একত্রিত করার সুযোগ নেই?

অবশ্যই আছে এবং সময় সেটা ঠিক করবে। কারণ, একটা কথা ঠিক যে আমরা বলি, যেকোনো দল যে কাজই করুক না কেন বলবে যে, জনগণ চায় বলেই আমরা এটা করছি। কিন্তু জনগণের কোন রায় না নিয়েই কিন্তু এই কথাটা বলে। আবার যখন নির্বাচনে জয়ী হয়ে আসে, ভোট চুরি করেই হোক, কারচুপি করেই হোক, নানা কৌশলে যদি তারা নির্বাচিত হয় তাহলেও তারা বলে যে, জনগণের ভোটেই আমরা নির্বাচিত হয়েছি, ম্যানডেট পেয়ে এসেছি ইত্যাদি এগুলো বলে। কিন্তু আসলে তারা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে যান বলেই এই শব্দগুলো ব্যবহার করে জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ দিতে হয়। তা নাহলে কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে যেকোনো দল বা সরকার যারা গঠন করেন বা বিরোধী দলে যারা থাকেন তাদের যে চরিত্র এবং চলাফেরা সেটা দেখলেই বুঝা যায় যে, তারা জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিনা বা যোগাযোগটা আছে কিনা। সেই জন্যই আমার কাছে মনে, জনগণের ওপর বিশ্বাস রাখাটা খুব বেশি প্রয়োজন। কবীগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই জন্য বলেছিলেন মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ। আসলেও কিন্তু আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাই, ১৯৭১ সালে আমাদের জনগণের ওপর কী অসাধারণ বিশ্বাস ছিল। আর সেই বিশ্বাসের কারণেই আমাদের অস্ত্রের দরকার হয় নাই। সমস্ত মানুষ ঝাপিয়ে পড়েছে প্রথমেই তাদের বুকের পাজর দিয়ে লড়াই করতে।

বিশ্বাসের অস্ত্র ছিল…

হ্যাঁ। বিশ্বাস তার অস্ত্র ছিল। এবং সেই বিশ্বাস থেকেই শত্রুর কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে সেই অস্ত্রই আবার শত্রুর বুকে তাক করে ধরেছে। এই যে আত্মবিশ্বাসটা তৈরি হয়েছিল, এটা তো রাজনীতির কারণেই হয়েছিল। সে তো নেতৃত্বের কারণেই হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন একটা অবিস্মভাবিত নেতা হিসেবে আবির্ভুত হয়েছিলেন এবং সে কারণেই কিন্তু তার কথায় সমস্ত কিছু উঠ-বস করছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যে সদস্যরা ছিল তাদেরকেও তিনি অঙুলি হিলনের মাধ্যমে বলতে পারতেন, নির্দেশ দিতে পারতেন যে, তোমরা ক্যাম্পে থাকো কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। এই যে বিষয়গুলো তৈরি করা, জনগণের ওপর বিশ্বাস ছিল বলেই বঙ্গবন্ধু সেই জায়গাগুলো তৈরি করতে পেরেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে একেবারে মৌলিকভাবে যে পার্থক্যটা দেখা দিল, মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা সেই চেতনাটাকে আমরা কেমন যেনো গুলিয়ে খেয়ে ফেললাম। তা থেকে অনেক দূরে চলে গেলাম। আজকে ধর্মনিরোপেক্ষতার স্লোগান দিয়ে এই বাংলাদেশকে স্বাধীন করলাম আমরা, লাখ লাখ মানুষ হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান তারা একসঙ্গে প্রাণ দিয়েছে। সাঁওতালেরা, রংপুরে একসঙ্গে ষোল হাজার সাঁওতাল একসঙ্গে তীর ধনুক নিয়ে লড়াই করেছে। আমি এই মানুষগুলোকে কি করে বাদ দিয়ে কথা বলতে পারি। আজকে তাদের যে ধর্ম আমার ধর্ম এক নয় কিন্তু যখন লড়াই করেছে মুনষের ধর্ম নিয়ে এক হয়ে লড়াই করেছি। আমরা তো তখন এক ছিলাম। সুতরাং হিন্দু মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান পোস্টারে আমরা লিখেছি, আমরা সবাই বাঙালি। কিন্তু এই কথা বলার পরে আজকে যখন সংবিধানে জিয়াউর রহমানের বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম আর এরশাদ সাহেবের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এই শব্দগুলো তারা সংযোজন করে তখন আমরা এর প্রতিবাদ করেছি। প্রছন্ডরকমের সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু, যেহেতু সামরিক জান্তা ছিল সেকারণে তারা এইগুলোর পাত্তায়ই দেয়নি। কারণ, সামরিক জান্তারা যখন আসে তারা জনগণের ওপর কখনোই নির্ভর করে না। তাদের নিজেদের ইচ্ছেমতো কাজ করে যায়। সেইজন্যে এই কাণ্ডটা হল। কিন্তু যখন আমরা বাহাত্তরের সংবিধান পুনপ্রতিষ্ঠার দাবি করতে শুরু করলাম এবং তারপরে সর্বোচ্চ আদালত রায় দিলো যে, একেবারে পূর্ণ বাস্তবায়ন করা সম্ভব তখন কিন্তু দেখলাম এই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ বর্তমান যে সরকার, মাহাজোটর সরকার, চৌদ্দদলীয় সরকার তারাই কন্তু ওই জিয়াউর রহমানের ওই বিসমিল্লাহ আর এরশাদের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রেখে দিলেন। এই যে, বঙ্গবন্ধুর দেয়া এবং তার যে তিনশ সহযোগী ছিলেন তাদের প্রণীত যে সংবিধান বাহাত্তরের সেই সংবিধানটাকে আমরা কলঙ্কিত করলাম না?

আমরা মুক্তিযুদ্ধের সেই জায়গা থেকে সরে আসলাম না? তাহলে আজকে ধর্মনিরপেক্ষতার সেই স্লোগানটি আমাদের কাছে কোথায় রইলো। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তো ধর্ম নিরোপেক্ষতা ছিল, সমাজতন্ত্র ছিল। আমি সমাজতন্ত্রের কথা বাদই দিয়ে দিলাম কারণ, আমরা একাত্তর সালে যে মু্ক্তিযুদ্ধের করেছি সেটাকে আমি বলি জাতীয়তাবাদী যুদ্ধ। এই জাতীয়তাবাদী যুদ্ধের যে পর্যায় এই পর্যায় থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য আমাদের পরবর্তী যে কাজগুলো করা দরকার ছিল আমরা সেগুলো করতে পারিনি। আমি যেমন বলি যে, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী যে শক্তি ছিল আমাদের সবার জানা শোনা, সেই শক্তিটাকে তো নিঃশেষ করে দেয়া উচিৎ ছিল। পৃথিবীতে যেকোনো দেশে মুক্তিযুদ্ধের পর মুক্তিযুদ্ধ উত্তর ওই অঞ্চলে যারা এ ধরণের লোকজন ছিল যারা জনগণ বিরোধী সেই গণবিরোধী শক্তিকে নস্যাত করে দেয়া হয়েছে। আমরা সেই কাজটা করিনি। ওখানে আমরা একটা মানবিকতা দেখিয়েছি যে, সাধারণ মানুষ মারা যাবে। মারা যায়। বিপ্লবের পর দেশে বহু বিপ্লববিরোধী লোককে হত্যা করতে গেলে কোনো কোনো সময় সাধারণ মানুষকেও প্রাণ দিতে হয়েছে। এটা বাস্তব কিন্তু আমরা এই কাজটি করিনি। আমাদের কাছে মনে হয়েছে, মানুষ হত্যা করে কি লাভ। তারচেয়ে বরং সবাইকে বাঁচিয়ে রাখো। বাঁচিয়ে রাখার দুরবস্থাটা আজকে ২০১৮ সালে বসে আমার মুখে এই কথাটা বলতে আমি বাধ্য হচ্ছি যে, আমরা সেই জায়গায় নেই। মুক্তি যুদ্ধের চেতনা থেকে সরে গেছি। ধর্ম নিরোপেক্ষতার স্লোগান আমাদের মুখ থেকে উঠে গেছে।

আপনি সমাজতন্ত্রের কথা বললেন। কিন্তু, এই সমাজতন্ত্র নিয়ে মাঠে গিয়ে যারা রাজনীতি করতেন, মাঠে গিয়ে রাজনীতির দাবিদার হয়তো অনেকেই কিন্তু, এই যে বাম ঘরানার রাজনীতি বাংলাদেশে ছিল তারাও কি জনগণের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারেনি নাকি জনগণ তাদের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারেনি?

জনগণ পারছে না এখন। আগে জনগণ তাদের ওপর বিশ্বাস রেখেছিল। জনগণ কিন্তু এটা ভাবছেন যে, এরা ভালো মানুষ কিন্তু ক্ষমতায় গেলে এরা রাষ্ট্র চালাতে পারবে না। কিন্তু, তারপরেও বামপন্থী এবং প্রগতিশীল শক্তির যে দলগুলো ছিল তাদের একটা গণভিত্তি ছিল এবং জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য যে ধরণের দাবি দাওয়া উত্থাপন করা উচিৎ এবং আন্দোলন সংগ্রাম করা উচিৎ সেইটা তারা করেছেন। কিন্তু দুঃখজনক ঘটনা হল ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর কমিউনিস্ট পার্টি দেখা গেল আওয়ামী লীগের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেল। তারপর যখন বাকশাল হল তখন সমস্ত কিছুকে গুলিয়ে এক জায়গায় নিয়ে আসা হল। এই যে কতগুলো ঘটনা ঘটল একটার পর একটা তাতে আমার মনে হয়েছে এই যে সমাজতান্ত্রিক যে চিন্তাভাবনা এগুলো অনেক দূরে চলে গেছে। আর সমাজতন্ত্রে যারা বিশ্বাস করতেন তারাও কিন্তু তখন বুঝতে শুরু করেছেন যে, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে যারা আজকে ক্ষমতায় আসীন, সেদিন আসীন হয়েছিলেন তারা সমাজতন্ত্রের পথে যাবেন না। সেজন্য তারাও কিন্তু আস্তে আস্তে ১৫/২০ বছর পরে সরে পড়েছেন। তারা এখন দেখবেন একেবারে কট্টর সমালোচক হয়েছেন। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে বিভাজনের পরে চীনা পন্থী এবং সোভিয়েত পন্থী বলে পরিচিত হয়েছিলেন। সোভিয়েত পন্থীরা যখন বোধদয় হলো আস্তে আস্তে সরে গেলেন। আর চীনা পন্থীদের মধ্যে আপোসকামিতা দেখা দিল। আর এত বিভক্ত হল, দশটা বারোটা উপদলে পারিনত হল। যার কারণে, ওই চীনাপন্থীদের মধ্য থেকে দুই একটা আবার এদের সাথে হাত মেলাতে শুরু করলো। আপনি ভাবতে পারেন সাম্যবাদী দলের যে মোহাম্মদ তোয়াহা ছিলেন, অসাধারণ কমিউনিস্ট নেতা, জনগণের মধ্যে যার ভিত্তি ছিল প্রচুর যিনি ডাক দিলে সমস্ত মানুষ এসে একটা বাধ তৈরি করে ফেলতে পারতো এবং তার অঞ্চলকে নদীর প্রবল স্রোত থেকে রক্ষা করতে পারতো সেই মানুষটি শেষ পর্যন্ত খণ্ডিত হয়ে গেলেন। শুধু মাত্র চীনাপন্থী বলে নয়, আবার চীনাদের মধ্যেও আবার বিভক্ত হল কয়েকটা। তোয়াহা ভাই এবং হক সাহেব এক ছিলেন। কিছুদিন বাদে হক সাহেব আলাদা হয়ে গেলেন এবং হক সাহেব এমন এক কাণ্ড করে বসলেন যে, তিনি ভুট্টর কাছে চিঠি লিখলেন, অস্ত্র চেয়ে পাঠালেন মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরেও। এই যে বিভাজনটা বামপন্থীদের মধ্যে হয়েছে তাতে করে চীনাপন্থীই বলেন আর সোভিয়েতপন্থী বলেন এখন কিন্তু সব একাকার হয়ে গেছে।

মস্কো পিকিং এক হয়ে গিয়েছে।

সব এক হয়ে গেছে। মানুষের ওপরে আস্থা আর ওরা রাখতে পারছে না। মানুষও ওদের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। কিন্তু এই যে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আমাদের বৈপ্লবিক মানে এক ধরণের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র এসেছিল।
(হাসি) আসলেও সমাজতন্ত্র তো অবশ্যই বৈজ্ঞানিক এবং সেই জৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগান দেয যারা এসেছিল, আমার কাছে মনে হয় তাদের মধ্যে একটা একপেশে ধারণা যে ধারণাটি নিয়ে তারা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। বিচ্ছিন্ন একটা চিন্তা-ভাবনা ছিল তাদের। এবং সেই বিচ্ছিন্ন চিন্তা-ভাবনা থেকে জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক না রেখে শুধুমাত্র সেনাবাহিনীর লোকজন আর আত্মীয় পরিজন দিয়ে একটা বাহিনী তৈরি করে রাষ্ট্রকে আঘাত করে কিন্তু তারা অপঘাতে মৃত্যুবরণ করলেন। এবং অবশেষে কর্ণেল তাহেরের মতো এমন একজন দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা তাকে জিয়াউর রহমানের কাছে ফাঁসিতে জীবন দিতে হল। যে জিয়াউর রহমানকে কর্নেল তাহের বন্দ্বীদশা থেকে উদ্ধার করলেন। তাহলে একবার চিন্তা করে দেখেন, রাজনীতিটা কোথায় কিভাবে বিবর্তিত হচ্ছে যে, কর্নেল তাহের ত্রাণকর্তা হলেন জিয়ার। সেই জিয়াই তাকে হত্যা করলেন ফাঁসিতে চাপিয়ে। হত্যা করার যে নির্দেশ সেটি হত্যা হওয়ার অনেক পরে জারি করা হল। ওই ধরণের কোন বিধান তখন ছিলও না। এই যে রাজনীতির মধ্যে নানা ধরণের ঘোট এবং ঘুরপাক এগুলো আমাদের রাজনীতিকে ভিষণভাবে কলুসিত করেছে, কলুসিত কেন আমি বলি কলঙ্কিত করেছে। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লিগ হল। মুসলিম লিগের বিরুদ্ধে প্রথম বিরোধী দল হল আওয়ামী মুসলিম লিগ। মুসলিম লিগ কিন্তু ত্যাগ করতে পারলো না। এত জনপ্রিয় শব্দ ছিল ‘মুসলিম লিগ’ যে তখন তার সঙ্গে আওয়ামী শব্দটা ব্যবহার করতে হল। অর্থাৎ জনগণের মুসলিম লিগ। মওলানা ভাসানী এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হলেন। টাঙ্গাইলের শামসুল হক সাহেব হলেন সাধারণ সম্পাদক। আর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হলেন দু’জন। একজন হলেন- শেখ মুজিবুর রহমান, এক নম্বর। দুই নম্বর খোন্দকার মুশতাক আহমেদ। খোন্দকার মোশতাক আহমেদ তখন বসে ছিলেন ওইখানেই। তিনি তখন মওলানা ভাসানীকে বললেন, আপনি শেখ মুজিবের নাম আগে দিলেন। আপনার সামনে আমি বসে আছি আমার নামটা আপনি লিখতে পারলেন না!

শুরু থেকেই…?

মানে আমি এইটেই বলতে চাচ্ছি যে, খোন্দকার মোশতাক তখন যে ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করেছিলেন, মওলানা ভাসানী তাকে স্বভাবসূলবভাবে ধমক দিয়ে তাকে চুপ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, এক নম্বর হল- শেখ মুজিব তখন জেলে সুতরাং তাকে মুক্ত করার জন্য আমাকে এই দাবিটা প্রথম রাখতে হবে। আর দুই নম্বর কথা হচ্ছে, তুমি হতে পারবা মুজিবের মতো অর্গানাইজার? এই যে চিন্তা ভাবনা ছিল, রাজনীতির ভেতরে দলকে শক্তিশালী করা, মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া তার জন্য কাকে কিভাবে কোথায় স্থাপিত করতে হবে সেই জিনিসগুলো কিন্তু আগের রাজনীতিবিদরা চিন্তাভাবনা করতেন। এখন আমাদের দেশে যে অবস্থা হয়েছে, ৪৭ বছর মুক্তিযুদ্ধ হয়ে গেছে তারপরেও আমরা কিন্তু সেই জায়গায় আর নেই। এখন অবস্থাটা এমন হয়েছে যে, আপনি আমার উপকার করেছেন আমি প্রধানমন্ত্রী হয়ে আপনাকে একটা জায়গা দিয়ে দিলাম। এই ধরণের কাজগুলো আমরা করছি। সে যে আমলেই হোক একই ধরণের ঘটনা ঘটছে। এই জায়গাগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত না দূর হবে আমার মনে হয়ে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা এই জিনিসগুলোকে বাদ দিতে পারবো না।

আপনি রাজনীতির কলুসিত হওয়ার কথা বললেন। কিন্তু, বিশুদ্ধতার দিকে কি যাবে না?

যাবে। অবশ্যই যাবে। সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। সময় আসবে এবং জনগণের মধ্যে সেই বোধদয় হবে। জনগণ এখন নিশ্চুপ আছেন। এক সময় তারা কিন্তু কণ্ঠ সোচ্চার করে চিৎকার করতে আরম্ভ করবেন যে, এই রাজনীতি আমরা বিশ্বাস করি না, এই রাজনীতি আমরা চাই না, এই অর্থনীতি আমরা চাই না। এই সংস্কৃতির যে বন্ধ্যত্ব সেটাকে ঘুচাতে হবে। তখন কিন্তু ওই নষ্টামির যুগটা কেটে যাবে। তখন নতুন একটা উত্থানের আমরা প্রমাণ পাবো।

আমি যুদি শুধু রাজনীতির কথা বলি, আপনার যে রাজনৈতিক বিশ্বাস সেই জায়গা থেকে আপনি এই পঁচাশিতে এসে কোথায় আছেন?

আমার বিশ্বাস হয়তো ঠিকই আছে কিন্তু আমি তো আমার বিশ্বাসকে কাজে লাগাবার মতো কোনো জায়গা পাচ্ছি না। কারণ, আমি কোনো দাল, কোনো ব্যক্তি বা কোন নেতৃত্বের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করবো সেই সাহসটা পাচ্ছি না। কারণ, আমার কাছে মনে হচ্ছে, আমি উনার সঙ্গে যাবো কিন্তু উনিতো ওখানে আপোশ করে বসে আছেন। উনার সঙ্গে যাবো, উনিতো রাজনীতিটাই দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। এইরকম কিছু চিত্র আজকে সমাজে দেখা দিয়েছে সেই জায়গায় সামাজিক-রাজনৈতিক যে শক্তি সেই শক্তিটা আস্তে আস্তে ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে। যারা জন্যে আমি ব্যক্তিগতভাবে যাই বিশ্বাস করি না কেন আমার রাজনৈতিক যে বিশ্বাস সেই বিশ্বাসটাকে নিয়ে আমি জনগণের কাছেও যেতে পারছি না, এককভাবে গিয়ে তো লাভ নেই বা আমরা কয়েকজন গিয়েও তো লাভ হবে না। আমাদের একটা নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে। আমি এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলে রাখি যে, নেতৃত্ব তৈরি হতো কোথা থেকে, আমাদের দেশে নেতৃত্বের জায়গা ছিল ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয় এবং আমাদের দেশে যত আন্দোলন হয়েছে, আরম্ভ যদি করি ৪৮-এ ভাষা আন্দোলন, এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই পত্তন হয়েছিল। ৪৯-এ যখন আওয়ামী মুসলিম লিগ হল। তখনও কিন্তু ছাত্রদের একটা ব্যাকআপ ছিল। তখনও কিন্তু পূর্বপাকিস্তান ছাত্রলীগ ছিল, নিখিল পাকিস্তান ছাত্রলীগ ছিল। তারা এই রাজনীতিকে সামনের দিকে ঠেলে দিয়েছেন এবং বিরোধীদলীয় রাজনীতি তৈরি করার ক্ষেত্রে ছাত্রদের একটা বড় ভূমিকা ছিল। তাই পঞ্চাশে যখন লিয়াকত আলী খান সাহেব মূলনীতির রিপোর্ট দিলেন তখন তার বিরুদ্ধে যে কি অসাধারণ একটি আন্দোলন তৈরি হল আমাদের দেশে সে আন্দোলনের কথা ভুলে যেতে পারি না। ৫২ সৃষ্টি করল কারা? এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। সচেতন ছাত্ররা। রাজনীতি যারা করছিলেন তারা কিন্তু ছাত্রদের পেছন থেকে টেনে রাখারা চেষ্টা করেছেন, না এখন পাকিস্তানিদের কিছু বলা যাবে না। ওদের যে শক্তি আমাদের সেই শক্তি নাই। কিন্তু, ছাত্ররা একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল যে, ১৪৪ ধারা জারি করেছে ঢাকা এবং আশপাশে এই ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে আমরা মিছিল করবো। সত্যিই তারা মিছিল করলেন এবং পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক পরিষদ এবং যেটা এখন জগন্নাথ হল যে হলটি ভেঙে গিয়েছিল একবার সেই হলটাই ছিল অ্যাসেম্বলি হল। সেই অ্যাসেম্বলিতে বাজেট সেশন বসবে, তার আগে গিয়ে ছাত্ররা ওখানে বিক্ষোভ দেখাবে এবং স্মারকলিপি পেশ করবে। এটাই তাদের সিদ্ধান্ত ছিল। ১৪৪ ধারা জারি করার পর এটা সম্ভব ছিল না। কিন্তু এই ১৪৪ ধারা জারি হওয়ার পরে ছাত্ররাই সিদ্ধান্ত নিল যে আমরা এই ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবো। অথচ সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ তারা বললেন, ছাত্ররা যখন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবেন ঠিক সেই মুহূর্তে সর্বদলীয় কমিটি বাতিল হয়ে যাবে। হয়েও ছিল তাই। পরবর্তীতে আবার ওলি আহাদকে আহ্বায়ক করে ওটাকে আবার পুনরুজ্জীবীত করেছিল ছাত্ররাই। ৫২’র পরে ৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, আপনি ভাবতে পারেন যে মুসলিম লিগের কি রকম ধ্বস নামলো যে নুরুল আমীন যিনি একজন মুখ্যমন্ত্রী তিনি একজন ছাত্র নেতা খালেক নওয়াজের কাছে, জামানত বাজেয়াপ্ত হল তার। কি অসাধারণ একটি জায়গা। চিন্তা করেন, বাংলাদেশের মানুষ কি অসাধারণভাবে রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনা করতেন। পরে মুসলিম লীগের কাণ্ড দেখে আমরা গান গাইতাম। সেই গানের বদৌলতে হাকিম ভাইয়ের মতো লোক খালি গলায় চিৎকার করে পল্টন ময়দানে গান গাইতেন সেই গান শুনে মানুষ প্রলুব্ধ হত এবং তারা বুঝতে পারতো যে মুসলিম লীগ কিভাবে আমাদের শোষণ করছে, আমাদের সম্পদ অপহরণ করে পশ্চিমে নিয়ে যাচ্ছে এবং কেন্দ্রে এটা থেকে মুনাফা লুটে ওরা বিশাল বিশাল অট্টালিকা, রাস্তা-ঘাট সবকিছু তৈরি করছে কিন্তু ওইটার বেনিফিট আমরা পূর্ববঙ্গের মানুষ পাচ্ছি না। ৫৬তে পাকিস্তানে প্রথম শাসনতন্ত্র হল, সংবিধান। হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদী সাহেব তখন আইনমন্ত্রী। তিনি এটা উত্থাপন করলেন এবং পাশ করলেন এবং ওই শাসনতন্ত্রে বাংলাভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতিও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে এই প্রসেস করতে করতে আইয়ুব খান সাহেব সামরিক শাসন করে ফেললেন। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আমরা সাংস্কৃতিক দলগুলো সেদিন ২১ ফেব্রুয়ারি যখন করেছি ১৯৬০ সালে, কয়েকজন লোক মাত্র আমরা ওখানে দাঁড়িয়ে ২১শে ফেব্রুয়ারিতে গান গেয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছি। তার পরেই তো ৬১ সাল আসলো কবীগুরু রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ, আমরা কিন্তু সামরিক শাসন উপেক্ষা করে রবীন্দ্রনাথের এটা পালন করার জন্য বিভিন্ন জায়গায়, ঢাকা শহরেই তিনটা বড় বড় কমিটি হয়েছিল এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ পালন করার জন্য কমিটি হয়েছিল। এই সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ৬২ সালে ছাত্ররাই প্রথমে কিন্তু বিদ্রোহ করলো। আপনি ভেবে দেখেন, যা কিছু হচ্ছে সবই কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে। তারপরে ৭০ সাল বলেন, ৭১ বলেন, মুক্তিযুদ্ধ বলেন সমস্ত কিছু, এরশাদবিরোধী আন্দোলন বলেন সবই তো ওইখান থেকে হয়েছে। এখন যোগফল, সেই নেতৃত্বটা কোথায়। কেন আসছে না? আজ সাতাশ বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ।

রাজনীতির অনুশীলন করার সুযোগ নাই।
অনুশীলন করার সুযোগই তো নেই। আজকে রাজনীতিটা কিভাবে কলুসিত হয়েছে এগুলো হল কতগুলো জায়গা।
সাংস্কৃতিক অনুশীলনেরও যথাযথ সুযোগ তৈরি হয়েছে বা আছে এখন?
সাংস্কৃতিক অনুশীলনের জায়গা আছে। যারা আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য বা উত্তরাধীকারী হিসেবে আমরা যে লোকসংস্কৃতিটা পেয়েছি বা মুক্তিযুদ্ধপূর্বকালে পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের সময় আমরা যে গণসংগীতের সূচনা করেছিলাম, গণনৃত্য করেছি, গণনাটক করেছি সেইগুলো আজকাল কিন্তু করতে পারছি না।
সেটাই বলছি, সেই ধারাটা নেই…
কেন করতে পারছি না সেটা তো আগেই বললাম যে, আমাদের রাজনীতির যে ধারাবাহিকতা থাকার কথা ছিল সেটা নেই বলেই আজকে ওই সাংস্কৃতিক ধারাহিকতা আস্তে আস্তে চুপসে যাচ্ছে।
যে সংগঠনগুলো ছিল ঢাকাসহ সারা দেশে, জেলা পর্যায়ে বা বড় বড় শহরে সেগুলোও তো আগের মতো…
আগের ফর্মে নেই। এখন বলতে গেলে উদিচী শিল্পীগোষ্ঠি, ওদেরই সারা দেশে এবং দেশের বাইরেও সংগঠন আছে। ৩৭৬টি শাখা এই উদিচীর আছে। এইরকম কোন সংগঠন বাংলাদেশে, বাংলাদেশে কেন পুরো উপমহাদেশে নাই।
কোন কোন সংগঠন সাংস্কৃতিক চর্চা করেছে কিন্তু সেটা রাজধানীভিত্তিক। তারা তৃণমূলে কেন যায়নি?
হ্যাঁ। যেতে পারেনি। ১৯৬৭ সালে, প্রথম তো ৬১’র পরে রবীন্দ্রনাথের শতবর্ষকে উপলক্ষ্য করে যে কমিটি হয়েছিল ঢাকা পূর্ব নামে সেই কমিটি থেকেই কিন্তু ছায়ানট সৃষ্টি হল। ছায়ানট যখন সৃষ্টি হল সেটা কিন্তু সংগঠন হিসেবে সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে তারা শুধুমাত্র বিদ্যানিকেতনে পরিণত হল। সংগঠনের চরিত্রটা চলে গিয়ে প্রতিষ্ঠানে পিরণত হল। স্কুলে পরিণত হল। তেমনি ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠি সৃষ্টি হল ১৯৬৫ সালে পল্টন ময়দানে। গণসংগীতের আসর করল যার নাম ‘ধানের গুচ্ছে রক্তে জমেছে’। আর নাটক হল পশ্চিমবঙ্গের একজন শক্তিশালী একজন অভিনেতা জ্ঞানেস মুখার্জী তার লেখা একটি নাটক। নাটকটা হচ্ছে, আলোর পথের যাত্রী। ওটাকে আমরা ইম্প্রোভাইস করে পূর্ব পাকিস্তানের পারস্পেক্টিভে তৈরি করলাম। আর নৃত্যনাট্য হল ‘জ্বলছে আগুণ ক্ষেতে ও খামারে’ কৃষক বিদ্রোহের ওপরে। এই যে জিনিসগুলো তৈরি হয়েছিল সেই জিনিসগুলো আজকে এই উদীচি বা যে সমস্ত ছোট ছোট সংগঠন আছে তারা কেন করতে পারছে না?
পারছে না কেন?
আজকে এই যে সংগঠনগুলো আছে তারা হয়তো গান গাইবার জন্য যান কিন্তু তাদের রজনৈতিক যে উদ্দেশ্য বা মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে জাগ্রত করার যে চেষ্টা আমার কাছে মনে হয় না খুব একটা আছে।
এটা কি রাজনৈতিক প্রণোদনা নেই বলেই বা রাজনৈতিক আদর্শ থেকে সরে যাওয়ার জন্যেই?
রাজনৈতিক আদর্শ থেকে সরে গেছি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে সরে গেছি। আমাদের যে চারটি স্তম্ভ বলে আমরা গর্ব করি সেই গর্বের জায়গাটাকে কিন্তু আমরা ভেঙে ফেলেছি। আজকে সাম্প্রদায়িকতার যে বিষাক্ত ছোবল চতুর্দিক থেকে আমরা লক্ষ্য করছি আবার যুদ্ধাপরাধীরা যেভাবে শাখা প্রশাখা বিস্তার করছে, এই যে একেকটা জঙ্গি দল আবির্ভুত হচ্ছে, এই জায়গাগুলোকে কী আমরা বন্ধ করতে পারতাম না। আজও পর্যন্ত করতে পারিনি। বর্তমান সরকার গর্ব করতে পারেন যে যুদ্ধাপরাধীর বিচার করেছেন। আমরও কৃতজ্ঞতা জানাই। কিন্তু, যে যুদ্ধাপরাধী সংগঠন হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী আজ পর্যন্ত শুধু মাত্র একটি এক্সিকিউটিভ অর্ডারের মাধ্যমে এই দলটিকে বন্ধ করা যেতে পারতো। করছেন না কেন? একটা খোড়া যুক্তি দেখান যে, ব্যান্ড করে দিলে ওরা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাবে, কোথা দিয়ে কি করবে না করবে। পৃথিবীর ইতিহাসে সবকিছুই তো এভাবেই হয়েছে। তা নাহলে জামায়াতের মতো একটি সংবিধানবিরোধী দলকে এবং তার মতো আরো কতগুলো ধর্মের নামে যে সমস্ত ইসলামীক রাজনৈতিক দলগুলো আছে এগুলোকে লালন করবেন কতদিন!
আমি একটু গণমাধ্যমে আসি। এখনকার গণমাধ্য। গণমাধ্যম কী গণমানুষের আছে?
(হাসি) সেখানেও তো কষ্টকর, মানে দীর্ঘ ৫৫ সাল থেকে সাংবাদিতার সাথে যুক্ত হয়ে এখনো পর্যন্ত আমার কাছে খুব ইয়ে লাগে, এই যে বিবর্তনটা এটা মাঝে মধ্যে আমার যারা জুনিয়র তাদেরকে বলি যে, দেখ বেশিদিন বেঁচো না। বেশিদিন বাঁচলে বুকটা কষ্টে এত ভারী হবে যে, বইতে পারবে না। আজকে আমি এই বয়সে এসে যখন সংবাদপত্রের দিকে তাকাই বা চ্যানেলগুলোর দিকে তাকাই তখন আমার কাছে ভীষণ কষ্ট লাগে যে, আমি বাংলাদেশে একটা বাংলা চ্যানেল চালাই, বাংলা চ্যানেলে এত ইংরেজি প্রোগ্রাম অযাচিতভাবে, অপ্রয়োজিনীয়ভাবে। এফএম রেডিও, কি যে এক উদ্ভট জিনিস তৈরি হয়েছে। এতে ওদেরই আনন্দ আছে। লোজন এ থেকে উপকৃত হচ্ছে বলে আমি মনে করি না। কজন যাত্রাপথে এটা অন করে দেখে যে কোন রাস্তায় কতটা যানজট আছে? বাংলাদেশে কতগুলো রাস্তা আছে যে, আমি ওই রাস্তা অ্যাভয়েড করে অন্য রাস্তা দিয়ে যাবো! এধরণের বাহুল্য কতগুলো জিনিসকে আধুনিকতার নাম দিয়ে এগুলো প্রচার করা হচ্ছে। আর সংবাদপত্র, সংবাদপত্রের চেহারা পালটাচ্ছে। প্রযুক্তিগত উন্নতি হয়েছে। সংবাদ সংগ্রহের নানা রকম প্রকরণ তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমরা কী সেইভাবে সাংবাদিকতা…
সাংবাদিকতা হচ্ছে কিনা?
সাংবাদিকতার যে স্বাধীনতা সেটা কী আদৌ পাচ্ছি বা পেয়েছি? পাচ্ছি না। আমি ধরেন, ছাপ্পন্ন, সাতান্ন, আটান্ন বা মার্শাল ল আমলের কথা বলি, যে আমি মর্শাল ল’র বিরুদ্ধে কিছু লিখতে পারবো না। তখনই এডিটোরিয়ালে লেখা হল ‘বাঁশ’। বাঁশের ওপরে এডিটোরিয়াল লেখা হল বিশাল। কচুরিপানা। এই যে সাবজেক্টগুলো বের করে তীব্র ব্যাঙ্গাত্বক লেখাগুলো তৈরি করা হত, শ্লেষাত্বক লেখাগুলো তৈরি করা হত এটাই তো সাংবাদিকতা। এখন কি আমি পারবো সেটা করতে? আমি পারবো না। আমি যাই লিখি না কেনো, যদি ওই মন নিয়ে নাও লিখি তাহলে যে সরকার থাকবেন তিনি মনে করবেন তাকেই ইঙ্গিত করে এটা লেখা হয়েছে। ওটা না লেখা হলেও তিনি ইঙ্গিতটা ধরে নেবেন। ধরে নিয়ে বিপদে ফেলে দেবেন। এখন সাতান্ন থেকে বত্রিশে নেমেছে কথাবার্তা বলা, লেখালেখি করা, সংবাদ প্রকাশ করার গলাটিপে ধরার জন্য প্রয়োগ করে দেয়া হবে। এই তো আমাদের গণমাধ্যমের বর্তমান অবস্থা। মানে, সাংবাদিকরা সাহস করে কিছু বলবেন, এই চাপের কারণে ব্যক্তিগতভাবেও কিন্তু আমরা সাহস হারিয়ে ফেলেছি।

আপনাদের সময়ও তো পুঁজি ছিল। গণমাধ্যমের বিনিয়োগ তো বুর্জয়া শ্রেণী থেকে আসতো?

আসতো।
এখন তো…
আরো বেশি। কিন্তু, না। আমি একটা কথা বলি, যেমন দৈনিক ইত্তেফাক আগে সাপ্তাহিক ছিল।
পরে দৈনিক হল।

মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এটার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। মানিক মিয়া পরবর্তীকালে এটার ইয়ে করলেন। ওটা দৈনিক যখন হল তখন উনি এটার সম্পাদক হলেন এবং প্রধান সম্পাদক ছিলেন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। হঠাৎ করে একদিন তার নাম মুছে ফেলা হল। যে ইত্তেফাক পাকিস্তানের সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে লিখেছে সেই ইত্তেফাকের অবস্থাটা কি? আমি ইন্ডিভিজুয়াল একটা পত্রিকার কথাই বললাম। যে মানিক মিয়া, জহুর হোসেন চৌধুরী এবং আব্দুস সালাম- এই তিন এডিটর, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুক খান যখন ডেকে পাঠানেন এডিটর্স কনফারেন্সে, পূর্ব পাকিস্তান থেকে মানিক এসেছে কিনা, জহুর এসেছে কিনা এটা আইয়ুব খান খবর নিতেন তথ্য সচিব ছিল আলতাফ গওহর, তার মধ্যমে। যে, ওরা যদি এসে থাকে তাহলে আমাকে আগেই জানিও। মানে, উনাকে প্রস্তুতি নিতে হবে। ভয় পেত কতটা! মানে জহুর হোসেন চৌধুরী, মানিক মিয়া, আব্দুস সালাম- এরা সাংবাদিক হিসেবে যে কি অসাধারণ ইমেজ তৈরি করে ফেলেছিলেন, সম্পাদকের সত্যিকার যে দায়িত্ববোধ, লেখার যে একটা শক্তিশালী চর্চা, এই জিনিসগুলো তারা প্রমাণ করতে পেরেছিল।
আপনি বললেন যে, আপনি একটি আদর্শ নিয়ে আছেন। আপনি যাদের কথা বলছেন, তাদেরও বিভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শ ছিল।
অবশ্যই।
কিন্তু যখন কলম ছিল হাতে বা আপনি গণমাধ্যমের কর্মী তখন তো আপনি দলীয় কর্মীর আচরণ করতেন না। এখন আপনার মনে হয় না যে, আমরা তাই করছি?
না না আমি করতে পারতাম না।
কিন্তু, আমাদের দেখ আপনার তাই মনে হয়, যে আমরা তাই করছি?
আমি ব্যক্তিগত উদাহরণ দিয়ে বলি। আমি প্রথম জীবনে সাংবাদপত্রে যুক্ত হলাম দৈনিক মিল্লাতে। ফরিদপুরের ইউসুফ আলী চৌধুরী মোহন মিয়া, খুব নাম করা মুসলিম লিগ লিডার ছিলেন এবং এই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রশ্নে নুরুল আমীনের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাও এনেছিলেন। আবার তাকে পশ্চিমপাকিস্তানিরা কিং মেকার অব দ্যা ইস্টও বলতো। তার পত্রিকাতে আমি যখন চাকরি নিলাম। তখন উনি কৃষক শ্রমিক পার্টি করেন, শের-ই বাংলার পার্টি। সেই পত্রিকাতে বসে এই নির্বাচনটা কোন পদ্ধতিতে হবে, এই নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে একটা লড়াই চলছিল। আপনি বিশ্বাস করবে না, আমার এক বন্ধু ছিল, আমার সহকর্মী সলিমুল্লাহ। ও আর আমি দু’জনে পকেটে করে কিছু কাগজ নিয়ে চলে যেতাম। আমরা পৃথক নির্বচনের বিপক্ষে, আমরা যুক্ত নির্বাচনের পক্ষে ওই কাগজগুলো, ওই নোয়াখালীর অমুক এলাকায় অমুকের নেতৃত্বে যে বৈঠক হয়েছে এবং তার মধ্যে এই এই বলা হয়েছে এবং তারা যুক্ত নির্বাচন সর্বসম্মতভাবে দাবি করেছে। আর আমাদের যিনি শিফট ইনচার্জ ছিলেন, উনি তখন নেজাম-ই ইসলাম করতেন। ওই নেজাম-ই ইসলামের ওই ভদ্রলোক পৃথক নির্বাচনের নিউজ যতো পেতেন দিতেন। তখন দু’জনের যে কম্পিটিশন, তখন সাংবাদিকতায় এই কম্পিটিশন ছিল। ওখানে কিন্তু আপনোকে দাবিয়ে রেখে আমারটা চাপিয়ে দিবে সেটা ছিল না। একপেশে ভাব ছিল না। দলীয়করণ ছিল না।
আপনারা তো ইউনিয়ানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সাংবাদিক ইউনিয়নও করেছেন কিন্তু এখনকার নেতৃত্ব…
(হাসি) সাংবাদিক ইউনিয়নের কথা বলতে গেলে খুব কষ্টকর লাগে। সেটা হচ্ছে, আমাদের সময় তো পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং ৭১ সালে আমি যখন সাধারণ সম্পদক, একাত্তরের ২৩শে মার্চ আমরা সাংবাদিক ইউনিয়ন সিদ্ধান্ত নিলাম যে, আজ থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কোন সংবাদ কোন খবরের কাগজে ছাপা হবে না। সেই সিদ্ধান্তটা আমরা সবাইকে জানিয়ে দিলাম এবং সবাই সেটা মেনে নিলেন। ২৫শে মার্চ যখন ক্রাকডাউনটা হল তারপর খবরের কাগজগুলো কি অসাধারণ ইয়ের মতো ছিল যে, ‘দৈনিক পাকিস্তান’ কিন্তু সেখানে যারা কাজ করতো তারা প্রগতিশীলতায় বিশ্বাস করে, গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে এমন সব মানুষ। আমি তখন ‘পূর্বদেশ’ চাকরি করি। পূর্বদেশ হল হামিদুল হক চৌধুরীর, মুসলিম লীগ করা মানুষ, তার পত্রিকা। সেখানে কিন্তু আমরা আমাদের মতো করে লিখছি। সত্তরের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার পক্ষেই আমরা লিখছি। আমাদের কেউ বাধা দেয়ার ছিল না। যে, এটা এত বেশি দিও না। মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়ে যাবে। নো। তখন মনে হচ্ছে যে, সত্য সেটাকেই তুলে ধরতে হবে। হ্যাঁ, কিছু কিছু সত্য আছে তুলে ধরা যাবে না। রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়ে যাবে, মানুষের ক্ষতি হয়ে যাবে। ওই সত্যটাকে আড়াল করার চেষ্টা করতাম আমরা। কিন্তু, যা সত্য ঘটেছে সেটাকে প্রায়শই সত্য ঘটনা হিসেবে আমরা তুলে ধরেছি। আমাদের কেউ বাধা দেয়নি। মালিক এসে বাধা দিতো না। মালিক যদি কথা বলতো, প্রথমে এসে সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলতো। সম্পাদক ওযাজ দ্যা মেইন ম্যান হু কন্ট্রোল দ্যা হোল নিউজপেপার। আর আজকে এনিবডি ক্যান পোক হিজ নোট। মালিক যেকোনো সময় ফোন ধরেই শিফট ইনচার্জকে বলে দিলো যে, এই নিউজটা যাবে না। এই সাহসটা তখন কিন্তু মালিকদের ছিল না। পয়সা তারা দিতেন কিন্তু চাইতেন কাগজটা কাগজের মতো হোক। কাগজটা রোকে যেনো গ্রহ্য করে।

সাহসটা হল কেন, কী উপায়ে?

এই সাহসটা হয়েছে, আমি তো বলবো বাংলাদেশ হওয়ার পর আমরা তাদের এই সুযোগটা করে দিয়েছি। পুঁজিপতিদের যে প্রশ্রয় দিয়েছি আমরা সেই প্রশ্রয়ের কারণে। পুঁজি খাটাতে হবে নাহলে শিল্প হবে না, উৎপাদন বাড়বে না। সেগুলো করতেই হবে আপনাকে কিন্তু তারপরেও একটা জিনিস তো থেকেই যায় যে, পুঁজিপতিদের যদি শুধু মুনাফার দিকে নজর দেয়ার সুযোগ করে দেন তাহলে তো তারা শুধু সেদিকেই থাকবে। আপনার তারা চাপতে থাকবে। আপনাকে নানা ভাবে তারা দমন-পীড়নের মাধ্যমে নির্যাশটা কেড়ে নিবে।

এই সময়ে এসে আপনার কি মনে হচ্ছে যে, আমরা যাদের বুদ্ধিবিত্তিক গোত্রের মানুষ বলি তাদের ভূমিকা…

বুদ্ধিবিত্তিক শ্রেণীর মানুষ বলতে তখন যে সমস্ত মানুষ মনে করতাম এখনও তাদেরকে আমরা শ্রদ্ধা করি। যেমন কাজী মোতাহের হোসেন, বৃদ্ধ। হেঁটে হেঁটে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্চেন। গাড়ি নেই, রিকশায়ও চড়ছেন না। এই একটি মানুষ যাকে দেখলে মাথা নত হয়ে আসতো। বেগম সুফিয়া কামাল, কবি জসিম উদ্দিন, অধ্যাপক মনসুর উদ্দিন আহমদ- এরকম আরো অনেকে আছেন, এম এ বারি। তাদের যে ভূমিকা ছিল সেই ভূমিকায় আমাদের মাথা নত হয়ে আসতো।

আর এই সমসাময়িক, এখন কী দেখছেন?

এখন কী দুঃখজনক কথা যে, এই ধরণের নাম উল্লেখ করবার মতো কে আছে! দু’য়েকটা ছাড়া।

বাংলাদেশকে আপনি কোথায় রেখে যেতে চান?

বাংলাদেশকে আমার যে জায়গায়, আমার চৈতণ্যের উদয় ঘটিয়েছিল যে বাংলাদেশ আমি সেই খানেই দেখতে চাই। আমি দেখেছি যে বাংলাদেশের সাড়ে চার কোটি মানুষ যখন লড়াই করে, সাড়ে সাত কোটি মানুষ যখন মুক্তিযুদ্ধ করে দেশটাকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, আজকে ষোল কোটি মানুষ আমরা যে যাই বলি না কেন আমরা সবাই যখন এই দেশেরই মানুষ হিসেবে বাস করছি, আমাদের একটা জিনিস মনে রাখতে হবে যে, জনগণের ওপর থেকে আমরা যদি আস্থা হারিয়ে ফেলি তাহলে আমরা ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ বলে যে গান গাই, সত্যিকার অর্থে ভালোবাসা হবে না। আমি চাই, আমি সগর্বে যেনো বলতে পারি, এদেশ আমার গর্ব। এদেশের মাটি আমার কাছে সোনা। আমি করে যাই তারই জন্মবৃত্তান্ত ঘোষণা।

আপনাকে আবারো পঁচাশির অভিবাদন এবং আপনাকে ধন্যবাদ আজকে আমাদের সময় দেয়ার জন্য।