খবরের ‘শিরোনাম’ ও গণমাধ্যমের ভূমিকা

সুব্রত আচার্য

আপনি যদি সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যু নিয়ে গুগলে একটু সার্চ করেন, আমি নিশ্চিত কমপক্ষে শতাধিক খবরের লিঙ্ক খুঁজে পাবেন, যেখানে লেখা হয়েছে সুশান্ত সিং রাজপুত আত্মহত্যা করেছেন, আত্মঘাতি হয়েছেন বা কোথায় লেখা আছে অবসাদে আত্মঘাতি অভিনেতা! এই সব বিশেষণে পুরো খবরটি পড়তে হবে আপনাকে। ভারতের অনেক বড় বড় হাউজের ডিজিটাল ভারসনে যেমন এই এরকম খবর প্রকাশিত হয়েছে; বাংলাদেশেরও অনেক গণমাধ্যমে তাদের বরাদ দিয়ে খবরটি প্রকাশিত হয়েছে। ওই অভিনেতার মৃত্যু ”আত্মহত্যা” কিংবা ”অবসাদ” এর কারণে তিনি আত্মঘাতি হয়েছেন; এসব কি সত্যিই প্রমাণিত হয়েছে। কিংবা এটা কি সত্যিই আমরা মৃত্যুর ৪ ঘন্টা কিংবা ৪০ দিন পরও বলতি পারি।

অনেকে বলতেই পারেন, কেন ময়না তদন্ত রিপোর্ট তো বলছে ফাঁসিতে ঝুলে মৃত্য হয়েছে অভিনেতার। একদমই ঠিক, ফাঁসিতে ঝুলেই মৃুত্য হয়েছে। তাতে কোনও সন্দেহ নেই আমার। কিন্তু সেটা যে ”আত্মহত্যা” এটা কোথায় বলা হয়েছে ? ময়না তদন্তে ? মোটেও ময়না তদন্তে সে-রকম কিছু বলা থাকে না। ময়না তদন্তে বলা থাকে মৃত্যুর কারণ। ফাঁসিতে ঝুলে মৃত্যু সেটা নিশ্চিত করা হয়েছে মাত্র। মৃত্যুর কারণ বলা হয়েছে ময়না তদন্তে। কিন্তু কেউ তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিয়েছে কিনা। কিংবা তিনি নিজেই ফাঁসিতে ঝুলে ”আত্মঘাতি” হয়েছিলেন কিনা। সেটা পুলিশ-গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত করে নিশ্চিত হবে। এবং সেটা বিচাররকও নিশ্চিত করে রায় দিতে পারেন। তবেই আমরা বলতে পারবো, আমরা মানে অবশ্যই গণমাধ্যম তো বটেই সাধারণ মানুষও বলতে পারো যে, হ্যাঁ ওই অভিনেতা ”আত্মঘাতি” হয়েছেন। এখানেই আমার দুটো কথা বলার আছে। প্রথমত, শুধু তথাকথিত গণমাধ্যম নয় ভারতের অনেক বড় হাউসও দায়িত্বশীল সাংবাদকিতা করেননি। দ্বিতীয়ত, আত্মঘাতি প্রমানিত না হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আত্মঘাতি হওয়ার কারণটাও অনুমান নির্ভর করে প্রকাশ করে দিয়েছে অনেক বাজার চলতি টেলিভিশন, পত্রিকা এবং তাদের ডিজিটাল ভার্সন।

মোটের ওপর গণমাধ্যম একটি বড় অংশ দায়িত্বশীল ভাবে এই খবরটাকে প্রচার করেনি। বরং খবরের শিরোনামকে বিকৃত করে শুধু পাঠক ধরার লোভে নীতি আদর্শ ছেড়ে উত্তেজক ”শিরোনাম” ব্যবহার করেছে। শুধু আত্মহত্যা শব্দটি নয় বরং আত্মহত্যার কারণটাও গণমাধ্যমের এক অংশ তুলে এনেছে। কোনও তদন্ত ছাড়াই শুধুমাত্র অনুমান নির্ভর মনগড়া তথ্য দিয়ে শিরোনাম এবং খবর প্রকাশ করে তারা পেশার সঙ্গে তো বটেই পাঠকের সঙ্গেও প্রতারণা করেছে। একজন মানুষের অবসাদ তার ব্যক্তিগত বিষয়। অবসাদ যে কোনও ধরণের আত্মঘাতি হওয়ার অন্যতম কারণ সেটা নিয়ে কোনও তর্ক বির্তক নেই। কিন্তু একজন ব্যক্তি যার মৃত্যুর পর ময়না তদন্তও হলো না, এর আগেই গণমাধ্যমের একটি অংশ বলে দিলো ওই অভিনেতা অবসাদ আত্মঘাতি হয়েছেন। এতে প্রয়াত ওই অভিনেতার পরিজনদের মানসিক অবস্থা কি হতে পারে সেটা গণমাধ্যমের ওই অংশ কি আদৌ বুঝতে পেরেছে?

অন্যদিকে পৃথিবী জুড়ে মহামারী করোনা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। মানুষ এমনিতেই অনেক ক্ষেত্রেই অবসাদ গ্রস্থ হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে তরুণ সমাজের মধ্যে ওই অভিনেতার গ্রহনযোগত্য থাকায় তরুণ সমাজের মনে এই মৃুত্যটা নাড়া দিয়েছে। অনেক তরুণ-তরুণী পাঠক এই ধরণের শিরোনাম দেখে অনুপ্রাণিত হতে পারেন। আমি এমন বেশ কিছু ফেসবুক পোস্ট দেখেছি গত কয়েক দিন ধরে। ফলে, এই ধরণের মৃত্যু খবর পরিবেশন করার সময় অনেক কিছু মাথায় রাখাটাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এবং গণমাধ্যমের কাজ।

আমি মনে করি, মানুষের মৃত্যু নিয়ে গল্প বানানো সহজ। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা করা সহজ নয়। গণমাধ্যমের একটি অংশ বর্তমানে সেই রুচিহীন সাংবাদিকতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। শিরোনামের সঙ্গে খবরের ভেতরে কোনও অংশের মিল নেই। প্রতিনিয়ত পাঠকরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। খবরের শিরোনাম দেখে ক্লিক করে ভেতরে পড়ে প্রতারিত হচ্ছেন।

কদিন আগে আমাদের একজন সাংবাদিক বন্ধু প্রখ্যাত ”অভিনেতা আসাদ্দুজ্জামান নূর আর নেই” শিরোনামের একটি খবর পোস্ট করেছিলেন। এই খবরটি যারা নূর ভাইকে ব্যক্তিগত ভাবে চেনেন বা জানেন তার কাজ সম্পর্ক-এ যারা খবর রাখেন, সন্দেহ নেই তারা প্রত্যেকেই ক্লিক করবেন। কিন্তু ক্লিক করে পড়লাম তিনি একটি অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু তিনি সেখানে যেতে পারেননি বা যোগ দেননি। একই রকম ভাবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দুজন অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিক এবং অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তীকে নিয়েও এই রকম শিরোনাম দিয়ে বহুবার খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে এটাও ঠিক এই সব খবর যারা করেছেন, কেউ মূলধারার গণমাধ্যম নয়। তবুও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে এখন মূলধারার চেয়ে তথাকথিত গণমাধ্যমের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। আর খবরের শিরোনামের কারণে পাঠকরা যত বেশি ক্লিক করছেন ততই ভাইরাল হচ্ছে খবরটি।

একজন মানুষ ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি হলে তার মুখ মন্ডল যদি ৫ ইঞ্চির হয়; তবে দেখতে কেমন দেখাবে মানুষটিকে। খবরের ক্ষেত্রেও একই রকম। খবরের মুখ ”শিরোনাম”। আর মুখ দেখে খবরের প্রবেশ করেন পাঠক। তাই এ ক্ষেত্রে আমাদের যারা গণমাধ্যমের সঙ্গে জড়িত তাদের অনেক বেশি সর্তক হতে হবে। একটু ভুলের জন্য গোটা প্রতিষ্ঠানের গ্রহনযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে যাবে।

লেখক: সুব্রত আচার্য, গণমাধ্যমকর্মী