‘নিউ নর্মাল জার্নালিজম’ ইন দ্যা টাইম অফ করোনা

রাজীব নন্দী ও জাওয়াদ হোসাইন

ল্যাটিন আমেরিকার বিখ্যাত উপন্যাসিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ লিখেছেন ‘লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা’। উপন্যাসটি পড়ে কিংবা এই নামে সিনেমাটি দেখে তীব্র মানসিক টানাপড়েনে ভুগেননি এমন সাহিত্য সমঝদার বিরল। করোনাকালে ‘বদলে যাওয়া সাংবাদিকতা’ নিয়ে আমরা একটি গবেষণা করছি। তারই ক্ষুদ্র একটি অংশ (নিবেদন) এই নিবন্ধটি। আমরা এর বাহারি নাম দিয়েছি করোনাপরবর্তী নিউ নর্মাল যুগে সাংবাদিকতা। বিশ্বসাহিত্যের একটি সমৃদ্ধ উপন্যাসসের নামের সাথে উপমা টেনে, আমাদের এই প্রচেষ্টা। কেন এই প্রচেষ্টা?

 

কারণ, ঘরে ঘরে আজ করোনার সঙ্গনিরোধ অবস্থা। যে অরণ্যপ্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য দূরে ঠেলে মানুষ আজ স্বেচ্ছ্বাবন্দী হয়েছে। সেই মানুষ যেন কিছুটা শিকড়ে ফিরে যাওয়ার সংগ্রাম করছে। কিন্তু যে মানুষ স্বভাবতই  অরণ্যচারী, সে কি ঘরবন্দী থাকার? সবাই চাইছে ঘর থেকে মুক্তি। সকলের চাওয়া, দ্রুত করোনা গ্রাফের এই অতিদ্রুত ক্রম ঊর্ধ্বমুখী বৃদ্ধিকে একটু চ্যাপ্টা করে দিয়ে পৃথিবীকে সুস্থ করে তোলা। সেরকম একটি দিন ১৭ই জুন, বুধবার। ভোরে হাতে এলো দেশের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকা। প্রথম পৃষ্ঠার লেআউট দেখে কিছুটা অবাক হলাম! অবিশ্বাস্য ডিজাইন! আবারো প্রমাণিত হলো, করোনাক্রান্তিতে সাংবাদিকতাটা বদলে গেলো! করোনা অভূতপূর্ব এক অবস্থা। এটি শুধু এপিডেমিক বা প্যানডেমিক পরিভাষাতেই সীমিত নয়, একটি জ্বাজ্জল্যমান ইনফোডেমিকের উদাহরনও বটে! জনস্বাস্থ্য এবং যোগাযোগবিদ্যার পরিসর থেকে দেখলে এটি ঐতিহাসিক ডিজাইন। কমিউনিকেশন স্টাডিজে আগ্রহীরা জানেন, সাংবাদিকতার মানেই হচ্ছে মানুষকে নতুন কিছু বলা, এমন কিছু বলা যেটা মনোযোগ আকর্ষণ করবে, তাদের ধরে রাখবে।

 

প্রথম আলো তাঁদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজে জানায়, ‘দেশে করোনায় মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। যাদেরকে আমরা হারিয়েছি তাঁদের সবার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা। বিশেষ করে সম্মুখ সারির যোদ্ধা ডাক্তার, নার্সসহ সকল স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ, সেনাবাহিনী, আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সদস্য, সাংবাদিক এবং অন্যান্য পেশাজীবী যারা নিজের জীবন বাজি রেখে লড়ে যাচ্ছেন তাঁদের প্রতি আমারদের বিশেষ কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধার্ঘ। তাঁদের আত্মত্যাগ, পরিশ্রম ও সাহসকে আমরা বিনম্র সম্মান জানাই। আমরা যাঁদেরকে হারিয়েছি তাদের প্রতি সম্মান জানাতে প্রথম আলোর এই বিশেষ আয়োজন’। ১৭ই জুন আমরা দেখি দেশের বিশিষ্টজন বিশিষ্ঠজন এবং নানান শ্রেণি-পেশা ও বয়সের মানুষের মধ্য থেকে ১২০ জনের নাম-ছবি প্রকাশ হলো। প্রথম আলোর চার দিনব্যাপী বিশেষ আয়োজনের এটি প্রথম পর্ব। এই মহাসংকটে সামনের সারির সাহসী যোদ্ধাদের জন্য পরের পর্বগুলোথে থাকছে আলাদা বিশেষ সংখ্যা। পরেরদিন ডাক্তার-নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ নিয়ে দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশের ঘোষণা দেয়া হয়।

 

নিউ নর্মাল লাইফে প্রবেশমুখে একে পুরোপুরি ‘বদলে যাওয়া সাংবাদিকতা’ বলতে পারি না। কারণ, এর আগে বিশেষ ইস্যুতে ‘মোড়ক সংখ্যা’ প্রকাশ করার নজির আছে। খোদ প্রথম আলোই ২০০৪ সালে ছাত্র রাজনীতি ইস্যুতে এবং পরবর্তীতে সারা দেশের ‘সেতু অব্যবস্থাপনা’ নিয়ে সেতু সংখ্যা করে চমক সৃষ্টি করেছিলো। কিন্তু আজ সামাজিক যোগাযোগসাইটে দিনভর এ নিয়ে সমালোচনাও কম দেখা যায়নি।

 

সামাজিক যোগাযোগ সাইটে কোন সম্পাদনা প্রক্রিয়া না থাকায়, এখানে মত প্রকাশ অনেকটা স্বেচ্ছানিয়ন্ত্রিত। আমরা আমাদের চলমান গবেষণা প্রকল্পের অংশ হিসেবে আজকের দিনে সামাজিক যোগাযোগ সাইট বিশেষত ফেসবুকে এই ইস্যুতে নজর রাখি। নিচের কিছু পর‌্যবেক্ষণ  আমাদের নজরে আসে। যেমন:- পুলিশ সদস্যরা যারা নিজের জীবন বাজি রেখে মানুষকে সাহায্য করেছেন তাদের ছবি কোথায়? এই তালিকায় কোন ডাক্তারের নাম নাই কেনো? এটা অত্যন্ত দুঃখ জনক। প্রথম পর্বেই সকল স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ, সেনাবাহিনী,আনসার সহ সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীদের রাখা উচিত ছিলো। এই লিস্টে ডাক্তার মরহুম মইনুদ্দিন স্যারের নাম কেনো নেই  করোনার লিস্ট নিয়েও  আওয়ামী লীগের কারসাজি? নিম্ন শ্রেণীর লোকজনের ছবি প্রকাশেষ প্রয়োজন হয়নি? কেউ কেউ লিখেছেন, এই লিস্টটা আরো ১৫ দিন পর করলে ভালো হতো। এরকম আলোচনা ছাড়াও অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান এর ছবি ও নাম স্থান না পাওয়া নিয়ে।

 

উপরের মন্তব্যগুলো ফেইসবুকের একটি মন্তব্যঘর থেকে নেওয়া সাধারণ মানুষের কিছু কথা। করোনার ১০০ তম দিন পার হওয়ার পর বাংলাদেশ ১,৩০৫ জন নাগরিক হারিয়েছে। এতে রয়েছেন সাধারণ মানুষ সহ দেশের প্রথম সারির যোদ্ধা যারা ডাক্তার-নার্স, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, চাকরিজীবী সহ আরো অনেকে। এই হারিয়ে যাওয়া প্রাণগুলোর স্মরণে দেশের অন্যতম জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো একটি বিশেষ উদ্যেগ নিয়েছে যেখানে করোনায় মারা যাওয় শহীদদের নাম ছবি সহ প্রতিদিন তারা তাদের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশ করবে চারটি সংখ্যায়। এ নিয়ে দেশে মোট ৩৮ জন ডাক্তারের করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার কনফার্ম কেস পাওয়া গেছে এবং আরো ৬ টি সাসপেক্টেড কেস রয়েছে। প্রথম আলো তাদের অফিসিয়াল পেইজে এই ঘোষণা দেওয়ার পরও থেকে ‘পাঠক মন্তব্য’র ঘরে বিভিন্ন রকম মন্তব্য দেখা গিয়েছে। এক কথায় ‘তালি এবং গালি’ দুটোই পাওয়া যাচ্ছে মানুষের প্রতিক্রিয়ায়। এখানে সেই মন্তব্য ঘর থেকে ১০ টি সমালোচনামূলক মন্তব্য তুলে আনা হলো যেগুলোর বিশ্লেষণে দেখা যাবে—

 

এদের বেশিরভাগেরই দাবি প্রথম সংখ্যায় ডাক্তার এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ছবি প্রকাশ হয়নি কেন৷ চিকিৎসকরা অবশ্যই দেশের প্রথম সারির প্রথম যোদ্ধা যারা জীবন বাজি রেখে করোনার সাথে লড়াই করছেন। আক্রান্ত হচ্ছেন, সুস্থ হচ্ছেন আবার কাজে যোগ দিচ্ছেন – সেই চিকিৎসকদের নাম প্রথম সংখ্যায় রাখার দাবী করছেন কেও কেও। অনেক চিকিৎসককে কড়া ভাষায়ও মন্তব্য করতে দেখা গেছে।দ্বিতীয়ত যারা আছেন তাদের মতে শুধু চিকিৎসক নয় সকল সম্মুখ যোদ্ধাদের নামই প্রথম সংখ্যায় থাকা উচিত ছিলো। ডাক্তার, পুলিশ, সেনাসদস্য, স্বাস্থ্যকর্মী এদের কথা মাথায় রেখে প্রথম সংখ্যা ঢেলে সাজানোর প্রস্তাব দিচ্ছেন তারা।

 

তবে গবেষকের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে, এইধরনের কিছু সমালোচনা মূলক মন্তব্যসহ আদতে দিনব্যাপী প্রথম আলোরই প্রচারণা ঘটতে থাকলো। প্রথম আলোর এই উদ্যেগটি অনেক বেশি  প্রশংসনীয় হয়েছে সাধারণ মানুষ দ্বারা। মহামারীতে প্রাণ দেওয়া মানুষদের সম্মানে এতটুকু করা যেতেই পারে! একজন মানুষের ক্ষতিপূরণ অবশ্যই কখনো একটি ছবি/নাম দিয়ে হয় না। করোনার সাথে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়ে যাওয়া এসব মানুষদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনই আসল উদ্দেশ্যে; কোন সংখ্যায় প্রকাশ পেলো তা মূল উদ্দেশ্য নয়। তাছাড়া মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির জন্যও একটি পদক্ষেপ বলা যেতে পারে। এখনো সময় আছে এই  মৃত্যুর মিছিলের তালিকা দেখে যাতে মানুষ সতর্ক হয় এবং করোনার প্রকৃত ভয়াবহতা বুঝতে পারে।

এর আগে চোখ ফেরাই গত ২৪শে মে, ২০২০ তারিখে। সারা পৃথিবীতেই তখন ঘোরতর করোনাক্রান্তি চলছে। সেদিন নিউ ইয়র্ক টাইমস পুরো পৃষ্ঠাজুড়ে করোনাক্রান্তির ব্যতিক্রমী ডিজাইন হাজির করলো। ইন্দো-বাংলা মিডিয়া এডুকেশন নেটওয়ার্কের মিডিয়া গবেষক, যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ সরকারের তথ্য কমিশনের সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার অধ্যাপক ডঃ গোলাম রহমানের মতে, নিউইয়র্ক টাইমসের সেদিন সাংবাদিকতার ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য একটি কাজ করেছে। তারা কোভিড-১৯ এই মহামারীটিকে ঐতিহাসিক তাৎপর্য দেওয়ার লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক লক্ষ প্রাণ হারানো জনগনের একটি নতুন উপস্থাপনা হাজির করেছে। ইতিহাসের এমন এক বিরাট বিয়োগান্তক ঘটনা যা বিশ্ব পরিস্থিতিকে মারাত্মক এক ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির সম্মুখীন করেছে।

 

অর্থাৎ বঙ্গদেশের প্রথম আলো থেকে শুরু করে মার্কিন মুলুকের নিউইয়র্ক টাইমসের প্রথম পৃষ্ঠাটি আজ একটি ঐতিহাসিক ‘যোগাযোগ টুলস’ হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিলো। এইসব উদ্ভাবনী পৃষ্ঠা ডিজাইনের মাধ্যমে, কাগজটি বড় আকারের মানববিপর্যের  দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছে। মৃতরা যে কেবল সংখ্যা নয়,  তাঁরাও মানুষ- যেমনটি আপনি, আমি, আমরা সকলে, তারই প্রতিফলন হয়েছে এখানে।  একই দিন পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের দৈনিক সংবাদপত্রও বৈশ্বিক এই জনস্বাস্থ্যের সংকটকে গুরুত্ব দিয়ে বৈচিত্র্যময় উপস্থাপনায় সাজিয়েছে। পরদিন ছিলো মুসলিমদের বড় ধর্মীয় উৎস ঈদ। কিন্তু করোনাক্রান্তির ঈদ নিয়ে আসছে না কোন উৎসবের আমেজ। বাংলাদেশের ‘আমাদের সময়’ পত্রিকা একটি অভিনব কাণ্ড ঘটিয়েছে। পত্রিকার লোগো (নামাঙ্কন)-তে মধ্যে কয়েকটি শব্দ জুড়ে দিয়ে পত্রিকাটির নামকরণের যথার্থতা প্রমাণ করেছে। যেমন: পত্রিকাটির মাস্টহেডে লেখা হয়েছে- আমাদের (প্রিয় জনের সঙ্গে এই ঈদে ঘরে) সময় (কাটাবো আনন্দে)।

 

অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী ‘স্টে হোম’কে পপুলার করার চেষ্টা। সমসাময়িক ইস্যুতে মাস্টহেড পরিবর্তন করা বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে নবতর সংযোজন। প্রায় একই কাজটি করেছে বাংলাদেশের প্রচারসম্মানীয় অপর একটি দৈনিক ‘সমকাল’।  এখানে ‘স ম কা ল’ চারটি বর্ণকে পৃথক করেছে তিনটি বার্তা। যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে জনমনে তৈরী হওয়া সচেতনতাকে ইঙ্গিত দেয়। দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ যেন বলে দেয়া হলো মাস্টহেডেই। যেখানে সমকাল এর প্রতিটি অক্ষরের পরপর লেখা হয়েছে ‘সঠিক তথ্য জানুন’, দূরত্ব বজায় রাখুন’, ঘরে থাকুন সুস্থ থাকুন’। পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম জনপ্রিয় ‘সংবাদ প্রতিদিন’ ব্যানার শিরোনামের চাইতেও দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছে খোদ পত্রিকারই লোগোটি। যা মেকাপটিকে প্রথাগত সাংবাদিকতা থেকে আলাদা করেছে ‘সংবাদ’ এবং ‘প্রতিদিন’ এই দুটি শব্দের মাঝে সোশ্যাল ডিসট্যান্স রাখার অভিনব আইডিয়াও সাংবাদিকতার নবতর সংযোজন। এরকম মাস্টহেডের বৈচিত্র্য একইসাথে সচেতনতামূলক বার্তা ও সৃজনশীলতাকে নির্দেশ করে।

 

সেই করোনাক্রান্তিতে আক্রান্ত পৃথিবীর সংবাদপত্রগুলোও। এই অভিনব যুদ্ধের আঁচ পড়েছে সমাজের সবকিছুতেই। বাদ পড়েনি সাংবাদিকতা, নিউজপেপারের ফ্রন্ট পেইজেও রেখে গেছে কভিড-১৯ তথা করোনাভাইরাসের প্রভাব। জনস্বাস্থ্যের এই বৈশ্বিক সংকট উঠে আসছে দেশে দেশে সংবাদপত্রগুলোর প্রথম পাতায়। সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠা একটি সংবাদপত্রের প্রাণ। সকল পাঠক প্রথমেই নজর দেয় পত্রিকার প্রথম পাতায়। সারা দুনিয়াজুড়ে খবরের কাগজের প্রথম পাতার কদর বেশি, কেননা দিনের খবরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় সংবাদগুলো প্রথম পৃষ্ঠায় থাকে।  তাই সংবাদ জগতের প্রবেশদ্বারই হল পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠা। সেই প্রথম পৃষ্ঠা তৈরিতে সংবাদ কর্তৃপক্ষকে দিতে হয় বাড়তি মনোযোগ।

আমরা জানি, The Daily Telegraph পত্রিকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে টুইন টাওয়ার হামলার  ছবির সাথে War on America শিরোনাম ব্যবহার করেছিলো।  তৎকালীন সময়ে সেই ইস্যু আমেরিকার সর্বস্তরের মানুষদেরকে অনেক বেশি প্রভাবিত করেছিলো, যা পরবর্তীতে সেখানকার মানুষদেরকে মুসলিম বিদ্বেষীও করে তুলে। ঠিক তারই আদলে ৬,৭৬০ দিন পরে Sunday Mail পত্রিকাও একটি ব্যানার লিড করে WAR ON CORONA লিখে। দু’টি শিরোনামের মধ্যে ছন্দবদ্ধ মিল রেখে  ভিন্ন দু’টি যুদ্ধের সাদৃশ্য আমরা মেলাতে পারি। প্রথমটি ছিলো অস্ত্রধারী জঙ্গী সংগঠনগুলোকে নির্দেশ করে, পরবর্তীটি এই করোনাকালে মানুষ বৈশ্বিক এই সংকট কাটাতে যে যুদ্ধে নেমেছে তা উল্লেখ করা হয়েছে।

 

এবার চোখ ফেরাই নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড শহর থেকে প্রচারিত দৈনিক পত্রিকা The New Zealand Herald এর  সাপ্তাহিক একটি সংস্করন WeekendHerald-এর প্রথম পাতায়। নিউজিল্যান্ডে সর্বপ্রথম করোনা রোগী সনাক্ত হওয়ার পরের দিন ২৯শে ফেব্রুয়ারি উইকেন্ড হেরাল্ডের এই পেইজটি অকল্যান্ড জুড়ে নাগরিকদের মাঝে একটি  অস্থিতিশীল আচরনের জন্ম দেয়। পত্রিকাটির ব্যানার  শিরোনামে করা হয় ‘প্যান্ডেমনিয়াম’! এই ‘প্যান্ডেমনিয়াম’ শব্দটি আতংক ও ভীতিকর পরিস্থিতিকে বুঝাতে ব্যবহার করা হয়।

এই শব্দটির ব্যবহার সে দেশের নাগরিকদের প্রতি শান্ত থাকার বার্তাটিতে ব্যাঘাত ঘটায়। আতংকিত নাগরিকেরা সব সুপার মার্কেটে গিয়ে জিনিসপত্র মজুদ করতে ভিড় জমায় যাকে যাকে ‘এপোক্যালিপস’ বলা হচ্ছে। সাথে শিরোনামের  নীচে একটি ভূগর্ভস্থ ট্রেনকে প্রতিরক্ষামূলক কাপড় ও যন্ত্রে  থাকা এক ব্যক্তি  জীবানুমুক্ত করছে এমন  একটি বড় ছবি ছিল। যেটি অকল্যান্ডের ব্রিটোমার্ট স্টেশনে নেওয়া হয়নি- এটি ইরানের রাজধানী তেহরান থেকে নেয়া। পৃষ্ঠার নীচে একটি ছোট ছবিও ছিল যেখানে একটি নামহীন অকল্যান্ড সুপার মার্কেটে খালি তাক দেখানো। ক্যাপশনে দেয়া হয়েছিল যে “অকল্যান্ড জুড়ে তাক” পরিষ্কার করা হচ্ছে। এরকম কাছাকাছি যোগাযোগ বার্তার ব্যানার লিড করতে দেখি ভারতের সর্বাধিক বিক্রিত ও পাঠক নন্দিত বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকাকে। ‘সাবধান’ শব্দটি দিয়ে তারা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি পাঠককে লকডাউন ও করোনা ভাইরাসের প্রতি সতর্কতাকে তুলে ধরেছিলো।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারত হয়ে চট্টগ্রামের দিকে চোখ ফেরাই। চট্টগ্রামের বিশেষ ঐতিহ্যবাহী দৈনিক পত্রিকা ‘পূর্বকোণ’র ১৭ই জুন, ২০২০ তারিখের প্রথম পাতার দৃশ্যপটও খানিকটা চমকে যাওয়ার মতো! ‘শ্বাস নিতে চায় চট্টগ্রামঃ অধিক নমুনা পরীক্ষার জন্য চট্টগ্রামের ল্যাবগুলোর দক্ষতা বাড়াতে হবে’- এমন একটি বাক্য  সম্পূর্ণ ৬ কলাম জুড়ে। সাংবাদিকতার প্রথাগত ও আভিধানিক অর্থে আমরা একে শিরোনামের কোনো প্রকারের মধ্যেই ফেলতে পারছি না। তবে এই বিশেষ বাক্যটিকে আমরা করোনায় বিপর্যস্থ চট্টগ্রামের সকল জনসাধারণের পক্ষ থেকে প্রশাসনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় জরুরি বার্তা হিসেবে দেখতে পারি।

করোনার শুরু থেকে চট্টগ্রামের সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি হাসপাতাল রোগীদের পর্যাপ্ত সেবা দিতে পারেনি। আর এখন যখন রোগীর চাপ আরো বেশি পরিমাণে বেড়েছে তাদের সেবা ব্যবস্থা আরো ভেঙ্গে পড়েছে । জরুরি অক্সিজেন সেবাটূকুও তারা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।  দৈনিক পূর্বকোণ চট্টগ্রামের মানুষের কথা বলে, চট্টগ্রামের সংকটের কথা তুলে ধরে। আর এই সংকটে তাদের এই ধরনের একটি সংযোজন পত্রিকার সৃজনশীলতার পরিচয়। যে দাবিটি এখানে উচ্চারিত হয়েছে তা মার্কিন সমাজে সর্বসাম্প্রতিক ছড়িয়ে পড়া ‘আই কান্ট ব্রেথ’ এর সাদৃশ্য। অর্থাৎ করোনা এসে আমাদের বৈশ্বিক থেকে স্থানীয় দৃষ্টিতে একই নজরে তাকাতে বলছে। রবীন্দ্রনাথ যেমনটি বলেছেন- ‘আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া, বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া’!

আমরা জানি, সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠা একটি সংবাদপত্রের প্রাণ। সকল পাঠক প্রথমেই নজর দেয় পত্রিকার প্রথম পাতায়। সারা দুনিয়াজুড়ে খবরের কাগজের প্রথম পাতার কদর বেশি, কেননা দিনের খবরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় সংবাদগুলো প্রথম পৃষ্ঠায় থাকে।  তাই সংবাদ জগতের প্রবেশদ্বারই হল পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠা। সেই প্রথম পৃষ্ঠা তৈরিতে সংবাদ কর্তৃপক্ষকে দিতে হয় বাড়তি মনোযোগ। জনস্বাস্থ্যের হুমকি বিবেচনায় রেখে বলা যায়- বদলে যাওয়া সাংবাদিকতা আমাদের ফলপ্রসু যোগাযোগবার্তারই ইঙ্গিত দেয়। এসব নতুনতর ভাবনা নিয়ে আরো আলোচনা হওয়া দরকার, দরকার বহুমুখী গবেষণা। আমাদের প্রত্যাশা- কমিউনিকেশন, ইনফরমেশন, পাবলিক হেলথ এবং মহামারি নিয়ে যারা কাজ করেন তারা এগিয়ে আসবেন আরো বেশি। দেশের সরকারকে, পত্রিকাকে বা সমাজকে দু’টো ‘নিন্দামন্দ’ করার আগে আমরা নিজেদের ‘দায়’টা যত বেশি অনুভব করবো, ততই মঙ্গল।

 

সভ্যতাঘাতি দুটো বিশ্বযুদ্ধ সাংবাদিকতার জগতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। যুদ্ধের ফলাফল দ্রুত পৌঁছে দিতে সংবাদ পরিবেশন পদ্ধতিতে এসেছিল পরিবর্তন। মানুষের কাছে কত আগে যুদ্ধের সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ খবরটি পৌঁছে দেওয়া যায় সেজন্য ইউরোপ-আমেরিকার কাগজে দেখা দিয়েছিল পৃষ্ঠসজ্জার নানান রূপরেখা। বিশ্বব্যাপী চলমান সমস্যাটি মূলত অদৃশ্য ভাইরাস মোকাবিলায় ব্যক্তিদের আচরণ ও মনোভাবের ভিত্তিতেই মোকাবেলা করতে হবে। যোগাযোগবিদ্যার জায়গা থেকে মানুষের  আচরণগত দিক যেমন এখন নতুন করে ভাবনার দাবি রাখে, তেমনি  এই সংকটময় পরিস্থিতিতে জনগণের আচরণ পরিবর্তনের জন্য আমাদের মিডিয়া কতটা কার্যকরভাবে বিষয়টি সামাধান করতে পারে, সেটাও দেখার বাকি রয়ে গেছে।


যারা লিখেছেন…


রাজীব নন্দী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। সমন্বয়ক, ইন্দো-বাংলা মিডিয়া এডুকেটর্স নেটওয়ার্ক,rajibndy@gmail.com

জাওয়াদ হোসাইন, মোজো স্টোরি টেলার ও শিক্ষার্থী; যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চবি। সহ-সমন্বয়ক, ইন্দো-বাংলা মিডিয়া এডুকেটর্স নেটওয়ার্ক

 

কৃতজ্ঞতায়: ডঃ পর্ণালী ধর চৌধুরী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অফ পাবলিক হেলথ এর মহামারী গবেষক এবং অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান, সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। বিশেষ ধন্যবাদ, চবি যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী কাজী সানজিদাকে, যিনি আমাদের চলমান গবেষণা প্রকল্পে এবং এই নিবন্ধে তথ্য বিশ্লেষণে সহযোগিতা করেছেন।