মহামারী মর্দিনী ও প্রযুক্তির প্রয়োগ

বিধান রিবেরু

কোভিড ঊনিশকে কেউ শাসন করার বিদ্যা এখনো আয়ত্ত্ব করতে পারেনি, রাষ্ট্রীয়ভাবে। তাই উল্টো আমরাই এখন শাসিত হচ্ছি। এই শাসনের কারণে প্রশাসনিক কিছু নিয়ন্ত্রণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তো আরোপিত হচ্ছেই, সামাজিকভাবেও মানুষ স্বেচ্ছায় সেসব মেনে চলছে। আমরা তো জানি এই করোনাকালে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে, তাদের মধ্যে ইতালি একটি, তো সেই দেশের নামজাদা দার্শনিক জর্জিও আগামবেন সাম্প্রতিক এক লেখায় বলছেন, আজকালকার এই ক্ষয়িষ্ণু ভাবাদর্শিক ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের যুগে, স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রয়োজনে লোকজন নিজেদের স্বাধীনতা জলাঞ্জলি দিচ্ছে, যা আগে ভাবাই যেতো না, কিন্তু এই জৈবনিরাপত্তা দেখিয়ে দিলো কি করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তো বটেই, সামাজিক মেলামেশাতেও রাশ টানতে হয়। এমনতর স্বাধীনতা হরণের কথা খোদ ফ্যাসিবাদের স্বপ্নেও কুলাবে না বলে মনে করেন আগামবেন।

আগামবেনের আরেকটি অগ্রিম ভাবনাও ফেলে দেয়ার মতো নয়, বরং অনেক বেশি গুরুত্বের দাবি রাখে, তা হলো সামাজিক দূরত্বের কথা বলে মানুষকে যে শারীরিকভাবে একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে, সেই শূন্যস্থান পূরণ করবে ডিজিটাল প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি, আর এখান থেকে ফায়দা নেয়ার চেষ্টা হবে। মুখোশে ঢাকা থাকার কারণে চেহারা তো দেখা যাবে না, তাতে সমস্যা নেই, আগে থেকেই বাধ্যতামূলকভাবে তথ্য নিয়ে গড়ে তোলা ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডারে থাকা জীবনবৃত্তান্ত দিয়েই চিহ্নিত হবে মানুষ এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকির দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক সমাবেশ হোক আর নিছক বন্ধুদেরপূনর্মিলনী, সেসবকেও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হবে।

আরও পড়ুন


করোনাকালে গণমাধ্যম ও আমরা

তবে আধুনিক দুনিয়ায় প্রযুক্তি দিয়ে মানুষকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা নতুন কিছু নয়, সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে ভোটারদের আচরণ, পছন্দ-নাপছন্দ ডিজিটাল ডাটার মাধ্যমে সংগ্রহ করে বা বলা ভালো চুরি করে জাতীয় নির্বাচনে কাজে লাগানোরঘটনা। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে এমন কারচুপি ছাড়াও, প্রশাসন যেমন অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করে, উল্টো দিকে সরকারের শাসন নিরঙ্কুশ রাখতে দমন-পীড়নও চলে। এখানে বড় বা ছোট দেশের ভেতর কোন তফাৎ নেই, সকল দেশই পারলে সর্বোচ্চ প্রযুক্তি নিযুক্ত করে বিরোধী মত ও বিশ্বাসকে দমনের জন্য।নয়া করোনা ভাইরাসও অনেকটা এমনই, কৌশলী। সেও চায় বেঁচে থাকতে, যে কোন উপায়ে, তাই ধনী বা গরীব ধর্তব্য নয়, মানুষের শরীর হলেই হলো। তাই সে বাংলাদেশেই সম্ভবত নয়বার নিজের চরিত্র পরিবর্তন করেছে।

মরিয়া ভাইরাসটিকে চীন বা ভিয়েতনাম অথবা ভারতের কেরালা রাজ্য যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে বা করছে, তাতে প্রযুক্তির ভূমিকা অনেক বড়।কোভিড ঊনিশে আক্রান্ত ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা শুধু নয়, সেই ব্যক্তি কার কার সংস্পর্শে এসেছে সেসব তথ্যের জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা, মোবাইল ফোন ট্র্যাকার, এমনকি ফেইস রিকগনিশন সফটওয়্যারও ব্যবহার করা হয়েছে, হচ্ছে। এতদিন‘বড় ভাই সুলভ’ নজরে রাখাই প্রধান কাজ ছিলো এসব প্রযুক্তির। এবারই বোধহয় প্রথম, মানুষকে স্বাস্থ্য ঝুঁকি থেকে বাঁচাতে এই ধরনের প্রযুক্তির ‘উল্টো’ ব্যবহার হলো।

না, এখানে‘বোধহয়’ বলাটা ঠিক হচ্ছে না, কারণ ভারতের কেরালাতে এমনটা হয়েছে ২০১৮ সালে। তখন নিপাহ ভাইরাস মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছিল রাজ্যটিতে। বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনের নজরে আসার পরপরই স্বাস্থ্যমন্ত্রী কে কে শৈলজা দ্রুত কমিটি গঠন করে মহামারীর উৎস ও এর যাত্রাপথ সনাক্ত করার চেষ্টা চালান। এই লড়াইয়ে তিনি কাজে লাগান সিসিটিভির ফুটেজ, সাধারণ ব্যবহারকারীদের মোবাইল ফোনের তথ্যাদি ও জনে জনে জিজ্ঞাসাবাদের কৌশল। আক্রান্তরা কিভাবে আক্রান্ত হয়েছেন, আক্রান্ত হওয়ার পর কোথায় গিয়েছেন, কারা তাদের সংস্পর্শে এসেছেন এবং সংক্রমণ কোথায় কোথায় হতে পারে—এসব তথ্য সংগ্রহ করেছেন। আক্রান্ত ও সম্ভাব্য রোগীদের আলাদা করে চিকিৎসা দেয়া, চিকিৎসকদের নিরাপত্তামূলক সরঞ্জামাদি দেয়া, মৃতদের সৎকারের যথাযথ ব্যবস্থা করা—সবটাই করেছেন।

এবার করোনাকালেও তারা একইরকম নিষ্ঠা নিয়ে কাজ করেছেন। কেরালায় শিক্ষিতের হার বেশি, এটাও একটি কারণ এই রাজ্যে ‘লকডাউন’ কার্যকরী হওয়ার। গরীব খেটে খাওয়া মানুষ সরকারের কথা শুনে ঘরে থেকেছেন, তাদের জন্য সরকার তিনবেলা খাবারের ব্যবস্থা করেছে। ছয় সপ্তাহ ধরে এই ব্যবস্থা চালু ছিলো। সংক্রমণ তাই এখন নিয়ন্ত্রণে। আরো একটি কথা না বললেই নয়, তা হলো দীর্ঘদিন ধরেইকেরালায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে।গ্রামীণ চিকিৎসা কেন্দ্র থেকে শুরু করে তারা ধাপে ধাপে বড় হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছে। এসব কারণেও মহামারী ঠেকাতে পেরেছে কেরালা।

কেরালায় নিপাহ ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও জয়ের কাহিনী নিয়ে ২০১৯ সালে একটি ছবি তৈরি হয়,ছবিটি পরিচালনা করেন আশিক আবু। মালায়লাম ভাষার ‘ভাইরাস’ছবিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চরিত্রকে বেশ শঙ্কিত ও ভীত দেখা যায়। সিনেমার শৈলজাকে দেখে সত্যিকারের শৈলজা বলেন, প্রকৃতপক্ষে সেসময় তাঁর পক্ষে চেহারায় শঙ্কা বা ভয় আনাটাও সম্ভব ছিল না। কারণ লোকজন এমনিতেই প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গিয়েছিল, এলাকা ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু তখন তড়িৎ পদক্ষেপের কারণে মানুষ আশ্বস্তহয়, ভরসা পায়। শৈলজা নিজেও মড়ক লাগা গ্রামে সশরীরে গিয়েরোগের ধরন ও সংক্রমণ রোধ নিয়ে কথা বলেন।এবারের কোভিড যুদ্ধে সাফল্য পাওয়ার পেছনে এই নিপাহ যুদ্ধের অভিজ্ঞতাকাজে লাগার কথাই বলেন শৈলজা।

কেরালার কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য শৈলজা জন্মগ্রহণ করেন এক সংগ্রামী পরিবারে। ছিলেন মাধ্যমিক শ্রেণীর বিজ্ঞানের শিক্ষক, তাই সাধারণ মানুষ তাঁকে চেনে শিক্ষক হিসেবেই। ২০১৬ সালে যখন তাঁর পার্টি ক্ষমতায় আসে, তখন থেকেই তিনি দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। ২০১৮ সালের নিপাহ ভাইরাস তাঁকে এই শিক্ষাই দিয়েছে, যে রোগের প্রতিষেধক নেই, তা নিয়ে হেলাফেলা করা যাবে না। তাই এই ২০২০ সালে সাড়ে তিন কোটি মানুষের রাজ্যে সরকারি হিসেব মতে মৃতের সংখ্যা মাত্র চার। আক্রান্তের পরিমাণ ৫২৪ জন। শৈলজা ও তাঁর দল জানুয়ারি মাসেই খবর শুনে জলদি সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা, চিহ্নিত ও বিচ্ছিন্ন করা এবং আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসা দেয়া, এই পদ্ধতিতে কাজ শুরু করে দেন। বিমান বন্দরকে রাখেন সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ভেতর। জ্বর থাকলেই তাকে আলাদা করে ফেলা হয়। সতর্কতামূলক প্রচারপত্র ছাপিয়ে বিলি করা হয় সর্বত্র। আর একটি বড় ব্যাপার, ৪৮ ঘন্টার ভেতর কোভিড পরীক্ষার ফল দিতে সক্ষমতা অর্জন করে কেরালা। যেখানে অন্য দেশে তিন থেকে সাতদিন পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে, সেখানে এই কম সময়ে ভাইরাস নির্ণয় তাদের এগিয়ে দেয় অনেক দূর।

হাসপাতালগুলোকে শুধু নয়, হোটেল, এমনকি কমিউনিটি সেন্টারগুলোকেও প্রস্তুত রাখার পরিকল্পনা নেয় কেরালা সরকার। আর এসকল প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার অভাবে করোনা যখন অন্য সব দেশে রীতিমতো ত্রাস হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কেরালায় গিয়ে সে হয়ে পড়েছে অবলা। আর এ কারণেই কেরালার মানুষ শৈলজার নাম দিয়েছে ‘করোনাভাইরাস মর্দিনী’। ‘ভাইরাস’ নামের মেডিক্যাল থ্রিলারেও শৈলজা ও তাঁর টিমের কর্মতৎপরতা দেখা যায়। ছবিতে সকলেই নিষ্ঠার সাথে দিনরাত কাজ করে রুখে দেন নিপাহ ভাইরাসকে।

তবে সেই যুদ্ধ খুব সহজেই জেতা হয়েছে, তা কিন্তু নয়। ছবিতে আমরা দেখি, মৃতদেহের সৎকারে সমস্যা হচ্ছিল। পরে সমস্যার সুরাহা হয়। যেহেতু অধিকাংশ মানুষ শিক্ষিত, তাই হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও মানুষ নিপাহ ভাইরাসের জন্য মৃতব্যক্তির লাশকে কবর দিয়েছে, পোড়ায়নি। রাজ্যের চিকিৎসক, সেবক ও স্বেচ্ছাসেবীদের ভূমিকাও অনেক বড় করে দেখানো হয়েছে ছবিতে। এই যোদ্ধাদের আন্তরিকতা ছাড়া এধরনেরভাইরাস মোকাবেলা করা কঠিন। সত্যিকার অর্থেই একটি শিক্ষিত ও মানবিক সমাজের সহায়তায় কেরালার সরকার সঠিক পদক্ষেপ নিতে পেরেছিল দুই বছর আগে। তারা জানতো না,আবার এমন ভাইরাসের মুখোমুখি হবে কিছুদিনের ভেতরেই। তাতে কি, বাড়িরকাজটি তারা ঠিকঠাক করে রেখেছিল। এমন তো নয়, নিপাহ শুধু কেরালাতেই হানা দিয়েছিল, আশপাশের রাজ্য, এমকি রাষ্ট্রেও নিপাহ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছিল। তখন নীতিনির্ধারকদের আজকের মতো হেলদোল হয়নি।

নভেল করোনা আমাদের আবারো দেখিয়ে দিলো মহামারী পৃথিবীতে বারবার আসে এবং বারবারই অধিকাংশ জনপদ নিরুপায়ের মতো মৃত্যুর তাণ্ডব দেখে। কথা হলো উন্নত তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে যতটুকু আমাদের সাফল্য পাওয়ার কথা ছিলো, এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে, তা কিন্তু আমরা পাইনি। আমরা মোটা দাগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়েছে হীন স্বার্থে। ফোনে আড়িপাতা, ফেসবুকে উঁকি মারা, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা ইত্যাদি হয়েছে মানবতার সুরক্ষার জন্য নয়, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে উদ্ধারের জন্য, কখনো বা মুনাফার জন্য। আমরা দেখেছি, এই করোনাকালেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে লেখক ও শিল্পীদের গ্রেফতারের ঘটনা। দোষ: তারা মহামারী ঠেকাতে সরকারী প্রচেষ্টার সমালোচনা করেছেন। সমালোচনা থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করি না, ক্ষিপ্ত হই এবং কালা কানুন প্রয়োগ করি।

এখন এই অসহিষ্ণু রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও অসচেতন সমাজের ভেতর যখননয়া করোনার মতো ভাইরাস ঢুকে পড়ে এবং মৃত্যুকে ডেকে আনতে থাকে, তখন স্বাধীনতাহীনতার চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়, মানুষ পরাধীনতার জোয়াল কাঁধে নিয়ে মানসিকভাবে পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক, এই তিন ক্ষেত্রেই এক সীমিত গণ্ডির ভেতর সে আটকে যায়। জর্জিও আগামবেনের কথায় ফিরে যাই, তিনি প্রশ্ন করছেন, এমন সমাজকে কি আদৌ মানবসমাজ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায়?

মানুষ কতদিন আসলে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নামে সংবেদনশীল সম্পর্ক, মুখোশবিহীন মুখ, বন্ধুত্ব ও প্রেমকে বর্জন করে চলবে? অক্ষমের জন্য বোধহয় একটিই পথ খোলা থাকে, তা হলো আত্মহত্যা, যার ডাকনাম ইদানিং হয়েছে ‘হার্ডইমিউনিটি’, বাংলায় বলা যেতে পারে‘গড্ডলিকা মুক্তি’!

দোহাই:
১. Biosecurity and Politics, Giorgio Agamben, link: https://bit.ly/3elH8Gc (date: May 26, 2020)
২. The coronavirus slayer! How Kerala’s rock star health minister helped save it from Covid-19, Laura Spinney, link:https://bit.ly/2X1BYth (date: May 26, 2020)

লেখক: বিধান রিবেরু, চলচ্চিত্র গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মী