মফস্বল সাংবাদিকতার দিনকাল

মাজেদ রহমান

করোনায় মফস্বল সাংবাদিকতায় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এসেছে এমনটি মনে হচ্ছে না। ভার্চুয়াল কিংবা বাসা বাড়ি থেকে সাংবাদিকতা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অনেকটায় উপেক্ষিত মফস্বল শহরগুলো থেকে। করোনার আগে যেমন কোন রিপোর্টের, কিংবা ফটো, ভিডিও সাংবাদিকদের ছবির জন্য বেরোতে হতো এখনো এর ব্যাত্যয় হচ্ছে না। দু’একটি মিডিয়া হাউজ ছাড়া অন্য মিডিয়া হাউজের মফস্বল সাংবাদিকদের আইটি প্রশিক্ষণ এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নেই। আবার হাউজগুলোর চাপ রয়েছে নিউজ এবং ছবির জন্য। তাছাড়া অনলাইন সংস্করণের জন্য প্রতিনিয়তই প্রেসার রয়েছে মিডিয়াগুলো থেকে। তাই তাদের নিউজ এবং ছবির জন্য বেরোতেই হচ্ছে। এছাড়া শখ এবং সামাজিক মর্যাদার কারণে মানুষের ডাকে সাড়া দিয়ে প্রতিনিয়তই সাংবাদিকরা বের হচ্ছেন বাহিরে। তাই সাংবাদিকদের করোনায় ঝুঁকি অনেক বেশী মফস্বল এলাকায়। এছাড়া স্বাস্থ্য নিরাপত্তায় যে সর্তকর্তা সেটিও মানা হচ্ছে না কিংবা অর্থনৈতিক কারণে মানতে পারছেন না মফস্বল সাংবাদিকরা।

সাংবাদিকতা করি তাই রাখঢাক না রেখেই মফস্বল শহরে সাংবাদিকতার ধরন এবং অর্থনৈতিক অবস্থাটা খোলসা করতে চাই। আমরা যারা মফস্বল এলাকায় বিভিন্ন টিভি মিডিয়া ,জাতীয়, আঞ্চলিক এবং স্থানীয় পত্রিকায় কাজ করি এর মধ্যে ৪০ ভাগ সাংবাদিক হয়তো নিয়মিত বেতন পাই। তাহলে ৬০ ভাগের চলে কিভাবে ? এ প্রশ্নের উত্তর করোনাকালীন সময়ে দিতে ইচ্ছে না হলেও কিছুটা না বললে অপূর্ন থেকে যাবে। বলতে পারেন এই ৬০ ভাগের মধ্যে ২০ ভাগই অবস্থার শিকার। তাদের বিদ্যা বুদ্ধি আছে দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতা করছেন কিংবা ফটো সাংবাদিকতায় জড়িত তাদের পেশার প্রতি মমত্ববোধ এবং শখ থেকে এখনো চালিয়ে যাচ্ছেন। মুখ ফুটে বলতে পারছেন না, তারা বেতন পান কি-না কিংবা বেতনের অংকটায় বা কত? এই ২০ ভাগ সাংবাদিকের বাড়ীতে কিছুটা হলেও স্বচ্ছলতা রয়েছে। তাহালে বাঁকী ৪০ ভাগ কিভাবে চলছেন? এর উত্তর পীড়াদায়ক।

বগুড়া জেলার প্রেক্ষাপটে যদি বলি তাহালে শুধমাত্র বগুড়া জেলাতে এই ৪০ ভাগ সাংবাদিকের সংখ্যা নেহায়েত কম হলে ২ হাজারের মত। এসব সাংবাদিকরা কাজ করেন বিভিন্ন নামের টিভি মিডিয়া, স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকা, অনলাইন, ইউটিউব, ফেসবুক, নেতানেত্রীর ব্যাক্তিগত। ফেসবুক এবং নেতানেত্রীর সাংবাদিক বিষয়টি অনেকের কাছে অস্পষ্ট।তাই একটি বিশ্লেশন করে বলি বগুড়াতে ফেসবুক সাংবাদিক প্রশাসনের এবং নেতানেত্রীর কাছে বেশ প্রিয়। কর্তা ব্যাক্তিদের রং ঢং করে ছবি তুলে ফেসবুকে পোষ্ট করতে হয়। ক্যাপশনে নানা প্রশংসা এবং তলৈ মর্দন শ্রুতি বাক্য লিখে খুশী করতে হয়। এ দেখে কর্তারা খুশী হন। বকশসি জোটে। উপরন্ত তদবীর করার ভাগ্য প্রসন্ন হয়। থানা কিংবা অফিস আদালতে তদবির করে উপর্জন হয় বেশ ভালো।

একই ভাবে কিছু অনলাইন সাইট খুলে সুপ্রতিষ্ঠিত টিভি চ্যানেলের নামে যেমন সময়ের সংবাদ, ডিবিসি বাংলা সংবাদ, যমুনা নিউজ, ৭১ জার্নাল, ২৪ ডট কম -এমন সব একাধিক নাম ব্যবহার করা অনলাইন পত্রিকার সাংবাদিক পরিচয়ে সাংবাদিক নামে ব্যবসা চলছে এলাকায়। যদি ফটো সাংবাদিকদের কথা উল্লেখ করি তাহালে বগুড়ায় হাতে গোনা ৮/১০ জন ফটো/ভিডিও সাংবাদিক বেতন পান। বাঁকীদের চলতে হয় প্রোগ্রামরে উপর। স্থানীয় ভাষায় একে বলে ক্ষেপ। এই ক্ষেপ-এ চলে সংসার। কোন অনুষ্ঠান হলে সেখানে দেখা যায় ২০ থেকে ৩০ জন ফটো ও ভিডিও সাংবাদিক। সবাইকে সন্তুষ্ট করেন প্রোগামওয়ালারা। একদিন বগুড়াতে এক এনজিও কর্মকর্তা গল্পে আমাকে বলছিলেন তিনি কিছু ত্রান সামগ্রী গরীবের মাঝে দিবেন। ২ জন ফটো সাংবাদিককে ডেকেছিলেন। অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে ৩০ জন ফটো এবং ভিডিও সাংবাদিক উপস্থিত। প্রোগ্রাম শেষ তবু কেউ যাচ্ছেন না। একসময় একজন বললেন আমাদের বিদায় করেন। বাধ্য হয়ে ২ শ টাকা করে ৬ হাজার টাকা দিতে হয়েছিল। ত্রাণ সামগ্রী ছিল ১০ হাজারের।

করোনার সময় এতসব লিখার উদ্দেশ্য হলো এখন তাহলে কেমন চলছে এসব সাংবাদিকদের। এক কথায় মোটেও ভালো নয়। দুঃচিন্তা সংকোট খেয়ে না খেয়ে চলছে মফস্বল সাংবদিকদের। তিন শ্রেনীর সাংবাদিকদের মধ্যে বেতনভুক্ত সাংবাদিকদের করোনায় চ্যালেঞ্জ সামনের দিনগুলোতে বেতন, চাকুরী থাকবে কিনা? বোনাস ইনক্রিমেন্ট হবে কিনা? দ্বিতীয় শ্রেণির সাংবাদিকরা পেটে গামছা বেঁধে হলেও সাংবাদিক নাম নিয়ে চলার আশাটুকু পাবেন কিনা এ নিয়ে। পত্রিকা মিডিয়া বন্ধ হয়ে যায় কিনা? আর তৃতীয় ধাপের সাংবাদিকদের সংসার চালাতে আরো অপরাধের সাথে জড়িয়ে পরার আশংকা। তবে সবকিছুই জবাব মিলবে কতদিন থাকছে এই মরণঘাতি করোনা কোভিড ১৯। এসব দেখার অপেক্ষা আমাদের সামনে।

লেখক: মাজেদ রহমান, গণমাধ্যমকর্মী