টানেল দুর্গম তবে ওপাশে আলো আছে

রওশন জামিল

গণমাধ্যমের ভবিষ্যত

হঠাৎ হঠাৎ চমকে যেতেন পারেন আপনি। মনে হতে পারে জোম্বি হামলা হলো নাকি? চারপাশে অদ্ভুত সব মুখোশধারী। পরনে আজব পোশাক। ভাইসর থুতনির কাছে নামানো। হাতে লাঠি, আগায় বুম বাঁধা। একটু লক্ষ করলে বুঝবেন ওরা মিডিয়াকর্মী।

সারা দুনিয়াতেই অবস্থাটা মোটামুটি এক। কোভিড-১৯ অতিমারি মিডিয়ার চেহারা বদলে দিয়েছে। অফিস খাঁ খাঁ। স্টুডিও জনমানবহীন। কর্মীরা বাসা থেকে অনলাইনে কাজ করছেন। পত্রিকা বেরোচ্ছে কিন্তু বিক্রি নাই। টিভি নিউজ চলছে। ভোক্তারা খবরের জন্য সামাজিক গণমাধ্যমে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন।

সামাজিক গণমাধ্যমের উত্থানের সঙ্গে বেশ কয়েক বছর ধরেই ডিজিটাল কনটেন্ট ও মোবাইলে পড়ার অভ্যাস মিডিয়ার প্রথাগত আয়ের মডেলটা চিন্তার বাইরে বদলে দিচ্ছিল। চলমান অতিমারি সেই সংকট তীব্র করে তুলেছে।

এই সংকটে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রিন্ট মিডিয়া। বিক্রিলব্ধ ও বিজ্ঞাপনলব্ধ আয় কমছে। সম্প্রতি বিলেতেরদি গার্ডিয়ানআশঙ্কা প্রকাশ করেছে চলতি বছরে তাদের রাজস্ব প্রায় ১০ শতাংশ কমে যাবে, যা নগদ অর্থে ২০ মিলিয়ন পাউন্ড। বহু প্রতিষ্ঠান কর্মীদের বেতন কমাচ্ছে;কেউ কেউ ছাঁটাইয়ে যাচ্ছে।

বিলেতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনডার্স অ‍্যানালাইসিস জানুয়ারিতে ভবিষ‍্যদ্বাণী করেছিল ২০২০ সালে দেশটির সংবাদপত্র বিজ্ঞাপন থেকে আট শতাংশ আয় হারাবে। কোভিড-১৯ এর প্রেক্ষাপটে এখন তারা বলছে সংখ‍্যাটা ৩০ শতাংশ বা আরো বেশি হতে পারে।

সত্যি, এইসংকট নজিরবিহীন। টোকিও অলিম্পিক্সের মতো বৈশ্বিক অনুষ্ঠান বাতিল হওয়ার বিরূপ প্রভাব গণমাধ্যমে পড়তে বাধ্য, বিশেষ করে টিভি অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপন ও স্পন্সরশিপ চুক্তির ক্ষেত্রে।দি নিউ ইয়র্ক টাইমসখবর দিয়েছে, ১৯৮০-তে যুক্তরাষ্ট্র মস্কো গেমস বর্জন করায়এনবিসি, বিমা থাকাসত্ত্বেও, ৩৪ মিলিয়ন ডলার গচ্চা দিয়েছিল। এবারও সেরকম ধাক্কা আসতে যাচ্ছে। এবং এবার তা আরো বেশি করে অনুভূত হবে।

স্বাধীন গণমাধ্যমের বিকাশে একটা বড় অন্তরায় কর্তৃত্ববাদী ব‍্যবস্থা। ফিলহাল এইস্বাধীনতার ওপর আক্রমণ আরো তীব্র হয়েছে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (Reporters Sans Frontiers)-এর এক সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছে আগামী দশ বছর পাঁচটি সমকেন্দ্রিক সংকটের কারণে সারা দুনিয়ায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়বে। আরএসএফ বলছে ২০৩০ সাল নাগাদ গণমাধ্যমের চেহারা কেমন দাঁড়াবে তা নির্ধারণ করবে এসব সংকট কীভাবে নিরসন করা হচ্ছে তার ওপর। এগুলো হচ্ছে: ভূরাজনৈতিক সংকট (কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলোর আগ্রাসী ভূমিকার কারণে); প্রাযুক্তিক সংকট (গণতান্ত্রিক নিশ্চয়তার অভাবে); গণতান্ত্রিক সংকট (রাজনৈতিক মেরুকরণ ও জবরদস্তিমূলক নীতির কারণে); আস্থার সংকট (সাংবাদিক ও মিডিয়া বিদ্বেষের কারণে); এবং অর্থনৈতিক সংকট (সাংবাদিকতার মানগত পতন)।

ভূরাজনৈতিক সংকট:আরএসএফ বলছেভূরাজনৈতিক সংকট হচ্ছে সবচেয়ে প্রকট সংকটগুলোর একটা। স্বৈরতান্ত্রিক, কর্তৃত্ববাদী অথবা লোকরঞ্জক সরকারগুলো তথ‍্য দমন করে জনগণের ওপর নিজেদের মতটা চাপিয়ে দেওয়ার জন‍্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। এসব জায়গায় বহুমত ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা বলে কোনকিছুর অস্তিত্ব নাই। এক্ষেত্রে চিন, সৌদি আরব ও মিসর বিশেষভাবে এগিয়ে। এই তিন দেশে সবচেয়ে বেশি সংখ‍্যক সাংবাদিক কারাগারে দিন গোনেন।

প্রযুক্তির সংকট: ডিজিটাল-নির্ভর বৈশ্বিক যোগাযোগের যুগে প্রযুক্তি ব‍্যবহারের যথাযথ বিধিবিধান না থাকায় তথ‍্য বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে। প্রচারণা, বিজ্ঞাপন, রটনা ও সাংবাদিকতা সরাসরি একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত।বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক এবং সম্পাদকীয় কনটেন্টের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিভ্রান্তি মত ও অভিব্যক্তি প্রকাশের স্বাধীনতার গণতান্ত্রিক নিশ্চয়তাকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এর সুযোগ পুরোমাত্রায় এস্তেমাল করছে কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো। ‘ফেক’ নিউজ ছড়ানো বন্ধের নামে গণমাধ্যমের উপর খড়্গসহস্ত হওয়ার আইন পাস করিয়ে নিচ্ছে।

গণতান্ত্রিক সংকট: এমনকি গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও পরমতসহিষ্ণুতার অভাব দেখা যাচ্ছে। সাংবাদিকদের প্রতি বৈরী ও বিদ্বেষী মনোভাবও বাড়ছে। ফলে কোথাও কোথাও সাংবাদিকরা হামলা, নির্যাতনের শিকার পর্যন্ত হচ্ছেন। আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট জাইগ বোলসোনারো প্রতিনিয়ত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে চলেছেন। বোলসোনারো কোভিড-১৯ অতিমারির শুরু থেকেই ‘হিস্টিরিয়া’ ও ‘প্যানিক’ সৃষ্টির জন‍্য সাংবাদিকদের দায়ী করে আসছেন।

আস্থার সংকট: অস্বীকার করার জো নাই ব্রেকিং নিউজের আধিক্য থেকে অনির্ভরযোগ‍্য সংবাদ প্রকাশ বেড়েছে। এর ফলে কোনো কোনো মিডিয়া আউটলেটের প্রতি ভোক্তার মনে আস্থার সংকট বাড়বে। এডলমান ট্রাস্ট ব‍্যারোমিটারের এক আন্তর্জাতিক সমীক্ষা অনুসারে, ৫৭ শতাংশ মানুষ মনে করেন তাঁদের মিডিয়া অনির্ভরযোগ‍্য সংবাদ পরিবেশন করে। আস্থার এই সংকট তৈরি হওয়ায় সাংবাদিকরা বহু দেশে গণআক্রোশের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন এবং ভবিষ্যতে তা বৃদ্ধি পেতে পারে।

অর্থনৈতিক সংকট: ডিজিটাল রূপান্তর বহু দেশে গণমাধ্যমকে পর্যুদস্ত করছে। খবরকাগজের বিক্রি হু হু করে কমছে। বিজ্ঞানপনের রাজস্ব আসছে না। উৎপাদন ও বিতরণ খরচ বেড়ে গেছে। অর্থনৈতিক সংকটের সামাজিক পরিণাম আছে যা গণমাধ্যমের সম্পাদকীয় স্বাধীনতায় প্রভাব বিস্তার এক্ষেত্রে আর্থিকভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতার চাপ প্রতিহত করা কঠিন হয়। অর্থনেতিক সংকটের কারণে গণমাধ্যমের মালিকানা কিছু হাতে কুক্ষিগত হয়ে পড়ছে। আর এতে করে নানা ধরনের স্বার্থের সংঘাত দেখা দিয়েছে। এটা সাংবাদিকতার বহুমতপ্রকাশ/প্রচার ও স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করছে। উপরন্তু, মুনাফাই একমাত্র লক্ষ‍্য হওয়ায় গণমাধ্যমে মেরুকরণ ওঅতিরঞ্জনের প্রবণতা বেড়েছে যা খবরের প্রতি আস্থার সংকট তীব্র করে তুলছে।

এ প্রসঙ্গে আরএসএফ মহাসচিব ক্রিস্তফ দেলুয়া বলেন, আমরা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন‍্য সংকটময় দশকে প্রবেশ করছি। করোনাভাইরাস অতিমারি নির্ভরযোগ‍্য তথ্য পাবার অধিকার হুমকিগ্রস্ত করছে এমন নেতিবাচক উপাদানগুলো সামনে নিয়ে আসছে। ২০৩০ সালে তথ‍্য লাভ করার স্বাধীনতা, পরমতসহিষ্ণুতা আর নির্ভরযোগ্যতার চেহারা কেমন হবে—এই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারিত হবে এখন।

আরএসএফ সূচক থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় কোভিড-১৯ অতিমারির প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সম্পর্ক আছে। চিন (১৭৭তম অবস্থানে) ও ইরান (১৭৩) উভয় দেশই নিজেদের দেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার তথ্য ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করেছে। ইরাকে (১৬২) রয়টার্সের লাইসেন্স তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হয় সরকারি করোনাভাইরাস পরিসংখ‍্যান নিয়ে প্রশ্ন তোলায়। এমনকি ইউরোপে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান করোনাভাইরাস সংক্রান্ত ‘ভুল তথ‍্য’ প্রদানের শাস্তি হিসেবে পাঁচ বছরের সাজার ব‍্যবস্থা করে আইন পাস করেন।
সূচকে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫১তম। ভারত ১৪২ এবং পাকিস্তান ১৪৫তম স্থানে রয়েছে।

এসব ছবি দেখে ভাবছেন গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ শেষ? ঠিক?
ভুল।

গণমাধ্যম এর আগেও বিপাকে পড়েছিল, এবং সেখান থেকে ফিরেও এসেছে। এই মহাসংকটের সময়েও কেউ কেউ ভালো করছে। বলতে পারেন সেটা সম্ভব হচ্ছে তাদের বাজার বড় বলে। কিন্তু এটাও সত্যি, এসব মিডিয়া শুধু একটা চ্যানেলের ভরসায় না থেকে নানা চ্যানেলে কন্টেন্ট নিয়ে হাজির হচ্ছে। কেউ হয়ত সময়ের সাথে জনবল ও বেতন মানানসই করে টিকে থাকছে। এক্ষেত্রে স্থানীয় বাজারভিত্তিক মিডিয়াগুলোর সমস্যাই বেশি।

বাস্তবতা হচ্ছে, এত সব সংকটের মধ্যেও একটা বিষয় কিন্তু স্থির: গণমাধ্যমের গুরুত্ব। এটা কেবল ভোক্তাকে অবসর বিনোদনেই সহায়তা করে না; নিজের যাপিত সময় সম্পর্কে অবহিতও রাখে। গণমাধ্যম একটা অভিন্ন সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি করে, যার ভেতর দিয়ে মানুষ হিসেবে একটা জনগোষ্ঠীর পরিচয় ফুটে ওঠে। এজন্যই গণমাধ্যমের এমন আর্থিক কাঠামো দরকার যা একে টিকে থাকার এবং উন্নতি করার সামর্থ্য দেয়।

একাধিক পরিসংখ‍্যান বলছেমানুষ ঘরবন্দি, কিন্তু তাই বলে মিডিয়ার চাহিদা কমে যায়নি; বরং বেড়েছে।দি ফিন্যান্সিয়াল টাইমসজানাচ্ছে, চিন সারা দেশে লকডাউন জারির পর ফেব্রুয়ারির প্রথম দুসপ্তাহে সেখানে সাপ্তাহিক অ্যাপ ডাউনলোড আগের বছরের তুলনায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ওই একই মাসে অ‍্যাপল ডিভাইসগুলোয় গেমস ডাউনলোড বেড়ে যায় ২০১৯ সালের তুলনায় ৮০ শতাংশ।

গণমাধ্যমের গুরুত্ব টের পাওয়ার একটা বড় মাপকাঠি ভোক্তা এর পেছনে গাঁটের পয়সা খরচ করতে রাজি কি না। সামনের দিনগুলোতে একটা গণমাধ্যম আউটলেটের টিকে থাকা বা না-থাকা অনেকটাই নির্ভর করবে এই ইচ্ছার ওপর। এপ্রিলে ওয়ার্ল্ড একোনোমিক ফোরামের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে উন্নত দেশগুলোয় সাধারণভাবে গড়ে অর্ধেকেরও কম ভোক্তা মিডিয়ার জন‍্য অর্থ ব‍্যয় করতে রাজি—৪৪ শতাংশ বিনোদন আর ১৬ শতাংশ খবরের জন্য। তবে সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের জবাবে আশাবাদী হওয়াই যায়। কন্টেন্টের জন্য আগামীতেও পয়সা খরচে রাজি আছেন—খবরের জন‍্য ৫৩ শতাংশ আর বিনোদনের জন্য ৭০ শতাংশ এমনটা বলেছেন।

ওই সমীক্ষায় আরো দেখা গেছে তরুণদের মধ্যেই কন্টেন্ট কিনে পড়ার আগ্রহ বেশি: ১৬-৩৪ বছর বয়সী ভোক্তাদের ৬০ শতাংশের বেশি বিনোদনের জন্য অর্থ ব‍্যয় করে থাকেন। যাঁদের বয়স ৫৫ বছরের বেশি তাঁদের মধ্যে এর হার ২২ শতাংশ। অনুমান করা যায় তরুণরা খবরের জন্যেও অর্থ ব‍্যয়ে রাজি হতে পারেন।

ঠিক, ডিজিটাল বিস্ফোরণ ভোক্তার কাছে খবর সহজলভ্য করেছে। সামাজিক গণমাধ্যমের কল্যাণে অতিদ্রুত মানুষ বহু কিছু দ্রত জানতে পারছেন। বহুক্ষেত্রে ভোক্তা নিজেই কন্টেন্ট তৈরি করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে তা নিমেষে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিচ্ছেন। কন্টেন্ট নির্মাতা ও বিতরণকারীর মধ্যে বিভাজন না থাকায় একটা সমস্যাও দেখা দিয়েছে। কন্টেন্টের মান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মিথ্যা খবর আর নিম্নমানের চটুল কন্টেন্ট অনেক সময়েই মিডিয়ার ওপর ভোক্তার বিশ্বাসহীনতা তৈরি করছে। ভোক্তা-চাহিদা সৃষ্টি ও বৃদ্ধিতে মানসম্মত কনটেন্টের গুরুত্ব তাই অপরিসীম।

কেমন হতে পারে ভবিষ্যৎ?

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সাংবাদিকতার রূপ বদলাতে বাধ্য। উন্নত বিশ্বের গণমাধ্যমে এর ছাপ পড়তে শুরু করেছে। অটোমেটেড জার্নালিজম, ডেটা ভিস্যুয়ালাইজেশন ও অটোমেটেড ফ্যাক্ট চেকিং বেশ কিছুদিন হলো জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। চলমান অতিমারির প্রেক্ষাপটে পয়েন্টার ইনস্টিট্যুট বলছে ভাবী সাংবাদিকতার প্রধান অভিমুখ হতে যাচ্ছে এই তিন প্রবণতা।

অটোমেটেড ব‍্যবস্থার মূল হচ্ছে ইলেকট্রনিক সোর্স থেকে তথ্য সংগ্রহ করে রোবটের লেখা খবর। কিন্তু এতে একজন সাংবাদিকের ঘাবড়ানোর কারণ নাই। ‘বট’ লিখিত খবর যাচাইবাছাই করা দরকার হবে। নয়ত বিপত্তির হতে পারে যেমনটা ২০১৭ সালে ঘটেছিল লস অ্যানজেলেস টাইমস-এর বেলায়, যখন তারা স্বয়ংক্রিয় ব‍্যবস্থা প্রদত্ত তথ‍্য যাচাই না করেই ভূমিকম্পের ভূল খবর ছেপেছিল।

ডেটা ভিস্যুয়ালাইজেশনের মাধ্যমে একটা খবর পাঠকের কাছে অনেক আকর্ষণীয় করে হাজির করা যায়। মূলত উপাত্তের সিম্যুলেটেড অভিক্ষেপ থেকে পাঠক একটা অবস্থার সম্ভাব্য অনেকগুলো ব‍্যাখ‍্যাচিত্র লাভ করেন। এ জন্য রিপোর্টারের গ্রাফিক্স সংক্রান্ত জ্ঞান থাকা জরুরি।

অটোমেটেড ফ্যাক্ট চেকিং দরকার যাতে নানা ধরনের ভুল তথ্য আর অসত্য তথ্যের ভিড়ে আসল খবর হারিয়ে না যায়। সম্প্রতিবিবিসির ‘ট্রাস্টেড নিউজ ইনিশিয়েটিভ’-এর উদ্যোগে করোনাভাইরাস সংক্রান্ত খবরের সত্যতা যাচাইয়ে একটা শেয়ার্ড অ‍্যালার্ট সিস্টেম চালু হয়েছে। এতেবিবিসি, এএফপি, রয়টার্স, দি ফিন্যানশিয়াল টাইমস, দি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, দি হিন্দুএবংসিবিসি/রেডিও-কানাডার সাথে গাঁটছড়া বেঁধেছে সামাজিক গণমাধ্যম ফেইসবুক, গুগল, মাইক্রোসফট ও টুইটার এবং ইউরোপিয়ান ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন, ফার্স্ট ড্রাফট ও রয়টার্স ইনস্টিট্যুট ফর দি স্টাডি অভ জার্নালিজম।

রোজকার জীবনের স্বাভাবিক চলাচলের সাথে গণমাধ্যমের কার্যক্রম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কোভিড-১৯ সেই স্বাভাবিকতা ব‍্যাহত করেছে। গণমাধ্যম কর্মীদের সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কন্টেন্ট তৈরি করতে হচ্ছে, খবর সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে একটা গণমাধ্যম আউটলেটের সাফল‍্য নির্ভর করবে বিদ্যমান অবস্থার সাথে তারা কতখানি নিজেদের মানিয়ে নিতে পারছেন তার ওপর।

কন্টেন্ট বানাতে পয়সা লাগে। যেটা আসে বিজ্ঞাপন থেকে। বিজ্ঞাপন কমে যাওয়ায় নিজেদের টিকে থাকার স্বার্থেই গণমাধ্যম ফেল কড়ি মাখ তেল নীতির দিকে ঝুঁকবে। বলতে কি, বিশ্বের বড় মিডিয়া হাউসগুলো বেশ অনেকদিন হলো এই তরিকা অনুসরণ করে আসছেন। কম আয়ের মানুষদের জন্য এটা একটা সমস্যা। তাদের পক্ষে জীবনের আবশ্যক চাহিদাগুলোর মেটানোর পর কিনে খবর পড়ার মতো অর্থ থাকে না। এর ফলে ধনী ও গরিবের মধ্যে তথ‍্য বৈষম্য দেখা দেওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে। বিত্তবানরা মানসম্মত কন্টেন্ট পড়ার ও দেখার সুযোগ পাবেন। অস্বচ্ছলরা তা থেকে বঞ্চিত হবেন।

কানাডা ও ইউরোপের কিছু দেশে অবাধ তথ‍্য প্রবাহ নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রীয় সহায়তা দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। এই দেশগুলো মনে করে রাষ্ট্রের সুস্বাস্থ্যের জন‍্য স্বাধীন গণমাধ্যম প্রয়োজন। কিন্তু এক্ষেত্রে এটাও মনে রাখা দরকার অর্থানুকূল‍্য দেওয়ার বিনিময়ে রাষ্ট্র মিডিয়ায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে। এজন্য গণমাধ্যম কর্মীদের মধ্য থেকেই রাষ্ট্রীয় সাহায‍্য নেওয়ার বিরোধিতা উঠেছে। এবং এর বদলে পাঠকদের অনুরোধ করা হচ্ছে সামর্থ্য অনুযায়ী অনুদান দিতে, যাতে মিডিয়া পরিচালনার লাটাই রাষ্ট্রের খপ্পরে না পড়ে।

বিনোদন ও গণমাধ্যম, প্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ শিল্প একবিন্দুতে মিলিত হচ্ছে। যারা আগে প্রযুক্তি ও সংযোগের ব্যবসা করত তারা এখন কন্টেন্ট তৈরির দিকে ঝুঁকছে। প্রিন্ট ও ডিজিটাল, ভিডিও গেমস ও স্পোর্টস, ওয়‍্যারলেস ও স্থির ইন্টারনেট সংযোগ, পে-টিভি ও ওটিটি, সামাজিক গণমাধ্যম ও সনাতন গণমাধ্যম—এগুলোর মধ্যে যে বিভাজন একসময় ছিল এখন তা একরকম নাই হয়ে গেছে। এটা হঠাৎ করেই রুগ্ন শিল্প হওয়ার ঝুঁকি থেকে হয়ত একটা গণমাধ্যম আউটলেট রক্ষা করতপারে, শুধুই মিডিয়া হলে যে ঝুঁকি থাকে, কিন্তু এধরনের ‘সুপার-কম্পিটিটর’ সামগ্রিকভাবে মিডিয়া শিল্পে যে প্রভাব ফেলবে ভবিষ্যতে জনমত তৈরির ক্ষেত্রে জনগণকে যথাযথ সজ্ঞাত রাখার বেলায় তা সমস্যা তৈরি করতে পারে এ আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বাংলাদেশ

বাংলাদেশের মিডিয়ার বর্তমান হালহকিকত ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পদ্ধতিগতভাবে আঁচঅনুমান করা কঠিন। এর কারণ এই খাতে নির্ভরযোগ্য গবেষণা কাজের অভাব। বাহ্যিক অবস্থা দেখে আসল চেহারা ভাসা ভাসা আন্দাজ করতে হয়। এটা ঠিক, কোনো শিল্পই একটি দেশের সার্বিক আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিকাঠামোর বাইরে কিছু নয়। এই নিরিখে বলাই যায় যে, বাংলাদেশে গণমাধ্যম শিল্প কখনই পায়ের তলায় শক্ত জমি পায়নি।

কোভিড -১৯ এর অভিঘাতে দেশের গণমাধ্যম একরকম মুখ থুবড়ে পড়েছে। ডিজিটাল বিস্ফোরণে দেশের মিডিয়া এমনিতেই ধুঁকছিল এবং একে বাঁচিয়ে তোলার জন‍্য একটা পরিবর্তন দরকার হয়ে পড়েছিল। করোনাভাইরাস সম্ভবত সেই পরিবর্তন অতন্ত দশ বছর এগিয়ে এনেছে।

ভাইরাস-আতঙ্কে মানুষ ছাপা পত্রিকা পড়া বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বিক্রিলব্ধ আয়ই নয়, বিজ্ঞাপনের আয় থেকেও পত্রিকাগুলো বঞ্চিত হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে একটি পত্রিকা—আলোকিত বাংলাদেশ—ঝাঁপ বন্ধ করেছে, মানবজমিনছাপা কাগজ থেকে পুরো অনলাইনে পাড়ি জমিয়েছে। একাধিক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নাভিশ্বাস উঠেছে কর্মীদের বেতন দিতে গিয়ে। অনেক জায়গায় বেতন না হওয়া বা আংশিক বেতন হওয়ার অভিযোগ আছে। কেউ কেউ ছাঁটাইয়েও যাচ্ছে। জেলা পর্যায়ের পত্রিকা সব বন্ধ হয়ে গেছে।

পরিস্থিতি এত সঙ্গীন, আগে যেখানে একটি মিডিয়ায় বছরে ৯০০ থেকে ১১০০ কোটি টাকার বাজেট ধরা হতো, তা এ বছর অর্ধেকে নেমে এসেছে। বাজার গবেষণা সংস্থা কান্তার বলছে নোভেল করোনাভাইরাসের প্রভাবে দেশীয় মিডিয়ায় প্রায় ৩৯% শতাংশ বিজ্ঞাপন আয় কমে গেছে। তবে সংবাদভিত্তিক চ্যানেলগুলোর অবস্থা কিছুটা ভালো।কান্তার কোভিড-১৯ ব্যারোমিটার বাংলাদেশগবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, বর্তমানে ভোক্তাদের ৬৩ শতাংশ টিভি, ৭৭ শতাংশ সোশ্যাল মিডিয়া, ৫৮ শতাংশ ইনস্ট্যান্ট মেসেজ, ৭০ শতাংশ অনলাইনভিত্তিক স্ট্রিমিং, আর ২৭% শতাংশ ব্যয় করছেন খবরেরকাগজে।

যেহেতু কাঠামোগতভাবে নাজুক, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের সামনে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। বিজ্ঞাপনের বাজার সামাজিক গণমাধ্যমের দিকে ঝুঁকে পড়ায় সনাতন মিডিয়ার বিপাক সহজে কাটবে না। বিশ্বের অন‍্যান‍্য জায়গায় যা হচ্ছে, দেশীয় গণমাধ্যমকে ভোক্তার চাহিদা অনুসারে মানসম্মত নানা ধরনের কন্টেন্ট দিয়েই বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হবে। কাজটা সহজ নয়। দেশে মানসম্মত কন্টেন্টের ঘাটতি আছে। নতুন চিন্তায় উৎসাহ জোগানো হচ্ছে না। মিডিয়া হাউসগুলোর বাজেটে আইডিয়া উদ্ভাবন কল্কে পায় না।

প্রিন্ট মিডিয়ার দিন শেষ, কথাটা খুব জোরেশোরেই উচ্চারিত হয়। বহু দেশে প্রিন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। খোদ ব্রিটেনেই বেশ কয়েক বছর আগেদি ইনডিপেনডেন্ট প্রিন্ট ভার্সন বন্ধ করে শুধু অনলাইন চালু রাখে। তারপরও প্রিন্টের বাজার শেষ এমনটা মনে করার কারণ নাই।দি নিউ ইয়র্ক টাইমসলাভজনকভাবেই প্রিন্ট ভার্সন চালু রেখেছে। এজন্য পাঠকের আগ্রহ জাগাতে পারে এমন নতুন নতুন কন্টেন্ট পরিবেশন করা হয় ছাপা পত্রিকায় যা অনলাইনে থাকে না।

বাংলাদেশে প্রিন্ট মিডিয়াকে সেই রাস্তায় হাঁটতে হবে। দুঃখজনক কিন্তু সত্যি, দেশের পত্রিকায় খুব কমই এমন লেখা চোখে পড়ে যা পাঠকের কৌতূহল জাগাতে পারে। বিশেষ করে আড়াই-তিন হাজার আর কি আরো বেশি শব্দের বড় ফিচার। অবশ্যই এ ধরনের লেখা শ্রমসাধ্য, এবং গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণও দরকার। পত্রিকাগুলো এদিকটা ভেবে দেখতে পারে।

দেশে গণমাধ্যমের সুষ্ঠু বিকাশের পথে একটা বড় বাধা মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় সরকারি বাধা। এটা ঘটতে পারে রাষ্ট্র. সরকার ও দলের মধ্যে ভেদরেখা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়ায়। এই রাষ্ট্রের শুরু থেকেই গণমাধ্যমের ওপর ক্ষমতা বলয়ের প্রকাশ্য এবং/অথবা অদৃশ‍্য চাপ রয়েছে। যা গণমাধ্যমের সুস্বাস্থ্যের জন‍্য কখনই মঙ্গলজনক হয়নি। সাম্প্রতিক দুর্যোগের সময় ত্রাণসামগ্রী নয়-ছয় করার খবর দেওয়ায় রাজধানী ও জেলা পর্যায়ে কমপক্ষে তিন জন সাংবাদিক ডিজিটাল আইনের ৫৭ ধারায় হয়রানির শিকার হয়েছেন। ভবিষ্যতে যে খোলা হাওয়ায় শ্বাস নেওয়া যাবে এমন কথা প্রত্যয়ের সাথে বলা যাচ্ছে না।

তবে এরপরও আশাবাদী হতেই হয়। অতিমারি সংক্রমণ এবং এ থেকে মৃত্যুর ঝুঁকি—এ পর্যন্ত চারজন পেশাগত দায়িত্বপালন করতে গিয়ে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন—আর প্রাতিষ্ঠানিক বাধা-বিপত্তি তুচ্ছ করে দেশের সাংবাদিকরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে জনগণকে চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন রাখার জন‍্য নানা ধরনের খবর দিয়ে চলেছেন। তবে এক্ষেত্রে খবরের বৈচিত্র্য বাড়ানোর সুযোগ আছে। যেমন, সার্বিক স্বাস্থ্য, মাতৃ স্বাস্থ্য, শিশু স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য এগুলোর ওপর দীর্ঘমেয়াদে করোনাভাইরাস কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে তা নিয়ে ভেতরসন্ধানী রিপোর্ট, ফিচার ইত্যাদি।

ঠিক, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অনেক প্রতিষ্ঠানই দৌড় থেকে ছিটকে পড়বে এবং নাই হয়ে যাবে। আগামীতে তারাই টিকে থাকবে যারা দ্রুত পরিবর্তমান পরিস্থিতির সাথে চটজলদি নিজেদের খাপ নিয়ে পারবে। এটা অনেকটাই নির্ভর করে একটা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবনী ক্ষমতার ওপর। এক্ষেত্রে যেসব প্রতিষ্ঠান পরিকল্পিত উপায়ে আগ্রাসী হবে, তারাই অস্তিত্ব লড়াইয়ের দৌড়ে অন্যদের থেকে এগিয়ে থাকবে।

 

রওশন জামিল, লেখক ও সাহিত্যিক