বদলে যাওয়া স্বাস্থ্য সাংবাদিকতা

তানজিনা হোসেন, চিকিৎসক ও সাহিত্যিক

কোভিড ১৯ আরও অনেক কিছুর মত পালটে দিয়েছে আমাদের সাংবাদিকতার ধরণও। সন্দেহ নেই যে করোনা আসার পর মিডিয়া, টেলিভিশন বা অনলাইন গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আগ্রহ আর ঝোঁক শতগুণ বেড়েছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের একটি গবেষণা বলছে দেশ ভেদে এই করোনার সময় টেলিভিশনে সংবাদ দেখার হার বেড়েছে ১২ থেকে ১৭ শতাংশ।

আরেকটি গবেষণা বলছে দুনিয়ার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে অন্তত ২৪ ঘন্টা করোনা সংক্রান্ত নতুন সংবাদ অন্বেষণ করতে সময় কাটাচ্ছেন। আমাদের দেশে এরকম কোন গবেষণা হয়েছে কিনা জানি না, তবে অন্তত প্রতিদিন দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্রিফিং যে বর্তমানে মানুষের অন্যতম দুর্মর আকর্ষণ হয়ে উঠেছে তাতে সন্দেহ নেই। মিডিয়াগুলো নিরবচ্ছিন্ন ভাবে প্রকাশ করে চলেছে আক্রান্ত, সনাক্ত বা মৃতের হিসেব। যখনই নতুন কোন হাইপ উঠছে তখনই বেড়ে যাচ্ছে টিআরপি। রাজনীতিবিদদের বদলে চ্যানেলে চ্যানেলে টানাটানি বিজ্ঞানী, গবেষক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকদের নিয়ে। স্বাভাবিক ভাবেই সব ধরণের সংবাদমাধ্যম বা মিডিয়ার মূল নজর এখন এক দিকেই-স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সাংবাদিকতায়।

অথচ এই কিছুদিন আগেও কি ছিল। স্বাস্থ্য সংবাদ ছিল সবচেয়ে অবহেলিত ও উপেক্ষিত দিকগুলোর একটি। পত্রিকার লিডগুলো সব পূর্ণ থাকতো রাজনৈতিক আর প্রশাসনিক খবরে। সরকার দলীয় মন্ত্রী বা এমপি কোথায় কি উদ্বোধনে গিয়ে কি বললেন, সংসদে কি নিয়ে বাক বিতন্ডা হল, বিরোধী দলীয় নেত্রীর মামলার কি অবস্থা, পদ্না সেতুর কতটি স্প্যান বসলো-জনসাধারণের এসব বিষয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ থাকুক কি না থাকুক-এগুলোই ছিল লিড স্টোরি। আর দর্শক পাঠকও অবশেষে বিনোদন, সিনেমা, ঘর সাজানো, ক্রীড়া বা রান্নার পাতাগুলোতে চোখ বুলিয়ে পত্রিকা ভাঁজ করে রাখতেন অলস ভাবে। কালে ভদ্রে পত্রিকার স্বাস্থ্য বিট এর কারো ক্ষুদ্র আইটেম ভেতরে বা পেছনের পাতায় জায়গা পেতো-তাও আবার কোথায় কোন হাসপাতাল ভাংচুর হল বা ভুল চিকিৎসায় রোগি মারা গেলেন জাতীয় খবরের বাইরে কিছু নয়। আমাদের হেলথ বিট-এর সংবাদকর্মীরাও ছিলেন অবহেলিত।

রাজনৈতিক সংবাদ, প্রশাসন, অর্থনীতি বা ক্রাইম বিট এর সাংবাদিকদের যোগাযোগ চলাফেরা ছিল সমাজের ওপরের লেভেলে; গণভবন, সচিবালয়, দূতাবাস সহ নানা উচ্চ পর্যায়ে তাদের অবাধ যাতায়াত ও নিমন্ত্রণ, তাদের ঠাটবাটই আলাদা। উল্টো দিকে হেলথ বিট যিনি দেখেন তার কেবল পরিচয় থাকে গুটি কয়েক চিকিৎসক বা হাসপাতাল প্রশাসনের সাথে, মাঝে মাঝে চিকিৎসকের এপয়েন্টমেন্ট বা হাসপাতালে একটা সিট যোগাড় করে দেবার জন্য বড়জোর তাদের খোঁজ পড়তো। করোনা এসে সব উল্টে পাল্টে দিল। হেলথ বিট হয়ে উঠলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। রাজনীতি, ক্রাইম, পররাষ্ট্র সংবাদের পাত্তাই নেই। বিনোদন বা ক্রীড়ার প্রতি কারো কোন আগ্রহ নেই যেখানে খোদ বিনোদনকর্মী বা ক্রীড়াবিদরাই কর্মহীন। সামনের পাতা থেকে শুরু করে সম্পাদকীয়, আর্ন্তজাতিক ও জাতীয় সংবাদ, খেলার পাতা বা পেছনের পাতা-সর্বত্র করোনার মাতামাতি।

আশ্চর্যে বিষয় যে দেখা গেল স্বাস্থ্য খাত নিয়ে আসলে কত কত কিছু চোখের আড়ালে রয়ে গেছে-কখনো দেখাই হয় নাই চক্ষু মেলিয়া। মিডিয়ার চোখেই দেশবাসী অবাক হয়ে প্রত্যক্ষ করলো দেশের স্বাস্থ্য খাতে এত দুর্নীতি, এত অনাচার, এত অব্যবস্থাপনা; সরকারি বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এত বৈষম্য, এত তুঘলকি কান্ড-অথচ এর আগে এসব গুরুতর বিষয় কারো চোখেই পড়ে নি! অথচ এটা মানুষের একেবারে মৌলিক, প্রাথমিক আর জীবন মৃত্যুর সাথে ঘনিষ্ঠ ভাবে ওতপ্রোত একটা বিষয়! কোভিড১৯ এর বিচিত্র দিক উন্মোচিত করতে গিয়ে মিডিয়াগুলো নিজেরাও যেন আবিস্কার করলো যে হেলথ বা এ সংক্রান্ত সংবাদ সংগ্রহ বা পরিবেশনের জন্য অভিজ্ঞ কর্মীরও কত অভাব।

দেশে দেশে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, নীতি নির্ধারকদের দ্বিধা দ্বন্দ আর সিদ্ধান্তহীনতা, পরিকল্পনা ও বাস্তাবায়নের দৈন্য, দুর্নীতি ও মিথ্যাচার, অস্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব, দরিদ্র ও ভালনারেবল গোষ্ঠীর নিরাপত্তহীনতা থেকে শুরু করে পরীক্ষা কিটের যথার্থতা, নানা রকম ওষুধের ট্রায়াল আর বাতিল ট্রায়াল , এপিডেমিওলজির জটিল গাণিতিক হিসেব, হার্ড ইমিউনিটি না মিটিগেশন, বা ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স এর গতিপ্রকৃতি-এত বিচিত্র বিষয় একসাথে কভার করা সত্যি মুশকিলের ব্যাপার। বিশেষ করে যদি বিজ্ঞান বা মেডিকেল বিষয়ে খানিকটা পড়াশোনা করা, বৈজ্ঞানিক টার্মগুলো বোঝা আর ব্যাখ্যা করার মতো অভিজ্ঞ কর্মী না থাকে। তার ওপর এর মধ্যে রাজনীতি তো আছেই।

রাজনীতি ও পুজিঁবাদ এ সুযোগে সফলতার সাথেই মিডিয়াকে নিজেদের ক্রীড়নকে পরিণত করার চেষ্টা করেছে বার বার। এর একটা চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন ভারতীয় সাংবাদিক ভুপেন সিং-দিল্লীর তাবলিগ জামাত মারকাজে অংশগ্রহণকারীদের করোনা সংক্রমণ নিয়ে নেতিবাচক সংবাদ পরিবেশনকে তিনি বলেছেন করোনা কালে মিডিয়ার ‍ “আগলিয়েস্ট মোমেন্ট” বা কুৎসিততম পর্ব। পৃথিবীর কোথাও কোথাও মিডিয়া এই মহামারিকে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে চীনা ষড়যন্ত্র হিসেবে। গণমাধ্যমক ব্যবহার করে কোথাও বর্ণবাদকে উসকে দেয়া হয়েছে, কোথাও বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা হয়েছে, কোথাও আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে সত্য তথ্য। আমাদের দেশেও জনগণকে ধোঁকা দেবার জন্য, সত্য আড়ালের জন্য ভিন্ন দিকে নজর ফেরানোর চেষ্টা করা হয়েছে বার বার। তবে সুখের বিষয় গণমাধ্যম করোনা সংক্রান্ত সংবাদ পরিবেশন থেকে বিচ্যুত হয় নি কখনো।

তবে আমার মতে করোনা কভার করতে গিয়ে গণমাধ্যম সবচেয়ে বেশি হঠকারিতার শিকার হয়েছে এর চিকিৎসা সংক্রান্ত সংবাদ পরিবেশনের সময়। এটা কেবল এদেশেই নয়। দুনিয়ার সর্বত্র করোনার নানা রকমের ওষুধ বা চিকিৎসা নিয়ে হাইপ উঠছে ক্রমাগত। বিজ্ঞানের জগতে এই প্রথম গবেষণা বা ট্রায়ালে ব্যবহৃত পদ্ধতির ফলাফল প্রমাণিত হয়ে পিয়ার রিভিউড জার্নালে প্রকাশিত হবার আগেই দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়েছে নানা গণমাধ্যম আর সামাজিক মাধ্যমে; আর যথাযথ তথ্যপ্রমাণের আগেই মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ছে সেই সব চিকিৎসার ওপর। ওষুধের নাম, ডোজ বা উপকারিতা প্রচার করার মত  নজিরবিহীন অনৈতিকতা হয়েছে কম বেশি সব জায়গায়।

বিজ্ঞানী, গবেষক, চিকিৎসক, রাষ্ট্রপ্রধান, রাজনিতবিদ থেকে শুরু করে যে কেউ বৈজ্ঞানিক গবেষণা আর তথ্য উপাত্ত নিয়ে মনগড়া বিশ্লেষণ করতে শুরু করেছেন আর মিডিয়া তা পরিবেশন করেছে কোন দ্বিধা না করেই। অ্যালকোহল দিয়ে ফুসফুস পরিস্কার করা থেকে শুরু করে জীবাণুনাশক ইনজেকশন দেবার মত খবরও ভাইরাল হয়েছে কোন বাছ বিচার ছাড়াই।  “করোনার চিকিৎসায় অভাবনীয় সাফল্য” বা “যে ওষুধে করোনা সেরে যাবে মাত্র চার দিনে”-জাতীয় সংবাদ এমনকি মূলধারার মিডিয়াও প্রচার করেছে প্রতিযোগিতামূলক ভাবে। এতে করে সাধারণ মানুষের আতংক আর ভোগান্তি বেড়েছে বই কমে নি। মাঝখানে যার মুনাফা লুটে নেবার কথা সে ঠিকই লাভবান হয়েছে।

তবু বলবো-এই করোনাকাল আমাদের সংবাদমাধ্যমগুলোকে আগের চেয়ে অনেক বেশি জনবান্ধব ও গণমুখী করে তুলেছে। সাধারণ মানুষ আর  মিডিয়ার দৃষ্টিভঙ্গির মিলন ঘটেছে কোথায় যেন। তথাকথিত উন্নয়ন আর অগ্রগতির স্বপ্নময় বর্ণিল জগত থেকে বেরিয়ে এসে মিডিয়াই রূঢ় বাস্তব চিত্রগুলোকে তুলে ধরেছে আমাদের সামনে, দেখিয়ে দিয়েছে কত বৈষম্যে ভরা আমাদের সমাজ এখনো। আমাদের উন্নয়নের মডেল কত ঠুনকো আর বস্ত্রহীন-তা আপামর জনসাধারণের সামনে তুলে ধরেছে সংবাদমাধ্যমগুলোই। এই প্রথম আমাদের সংবাদপত্রের মুখ্য সংবাদ বা লিড হয়ে উঠেছেন অসহায় অসুস্থ দরিদ্র মানুষেরা, পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় মন্ত্রী এমপি বা তারকাদের বদলে জায়গা করে নিয়েছেন করোনা পরীক্ষার  জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে রাস্তায় শুয়ে পড়া মানুষটি। করোনা পরবর্তী সময়েও আমরা এই জনমানুষের সংবাদ মাধ্যমই চাই, চাই এই অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার মিডিয়া, আরা চাই বৈষম্যহীন কল্যাণকামী এক সমাজ ব্যবস্থার দাবিতে আমাদের মত সাধারণ মানুষের কাতারে গণমাধ্যমগুলোও এসে দাঁড়াক।