প্যান্ডেমিক প্রভাবে গণমাধ্যম

টেলিভিশন যাত্রা শুরু ১৯৬৪ সাল থেকেকালক্রমে নানানচড়াই উৎরাইপেরিয়ে আজবাংলাদেশে সংবাদ ও বিনোদন ভিত্তিক সরকারী-বেসরকারী মিলিয়ে চ্যানেল সংখ্যা প্রায় ৩৫টা۔ সাথে আরো কিছু নবজাতকের অপেক্ষায় বাংলাদেশিরা۔ আর হবেই না কেন? আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গর্বিত বাংলাদেশীরা বিশ্বের সপ্তম বহুল প্রচলিত ভাষায় কথা বলে ۔যদিও বাংলাদেশ টা আয়তনে ছোট একটি দেশ কিন্তু মনোবল ও সাহসিকতার দিক থেকে আমরা অনেক বড় তাই হয়তো আমাদের চ্যানেল এর সংখ্যাও একটু বেশ।

বিশ্বায়নের দ্রুতরথে তাল মিলাতে যেয়ে বাংলাদেশ টিভি চ্যানেলগুলো কিছুদিন থেকে এমনিতেই একটি বড় ক্রাইসিস এর মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল যা বিভিন্ন সংগঠন গুলোর সমন্বয় ও মালিকদের সহযোগিতায় কাটিয়ে উঠার চেষ্টা ও চলছিল,কিন্তু এরই মধ্যে বৈশ্বিক মহামারীর ছোবল দুহাজার বিশ সালে ‘কোভিড- ১৯’ বিষে জর্জরিত করে দিলো ۔ মিডিয়ার টানাপোড়ন আবার শুরু হলো।

এমনিতেই চ্যানেল গুলো দিন আনি দিন খাই তার উপর আবার এই মহামারী. কোভিড- ১৯ শুধু যে আমাদের বিজ্ঞাপনের উপর প্রভাব ফেলছে তাই না এটি আমাদের মনোবলও ভেঙ্গেদিচ্ছে। চাকরীর অনিশ্চয়তা ঘিরে রাখছে সব সময়।

এই মহামারীতে আমরা কিন্তু থেমে নেই, থেমে নেই আমাদের পথ চলা। বাংলাদেশের ডাক্তার, নার্স, পুলিশ,র‌্যাব, সেনাবাহিনী, ব্যাংকার পরিচ্ছন্ন কর্মী, ও কিছু জরুরি সেবায় নিয়জিত কর্মীদের পাশপাশি মিডিয়া কর্মীরাও কাজ করে যাচ্ছি দিনরাত।

যদিও এত কিছুর মধ্যে ভয় রয়েই যাচ্ছে, সামনের দিন গুলোয়, আমাদের পরিবার আগের মতো হাসবে তো? পাশে পাবে তো? জানি না কি হতে যাচ্ছে! এরই মধ্যে ১৩৮ জন গণমাধ্যমকর্মী  আক্রান্ত হয়েছেন ৩ জনকে চিরতরে হারিয়েছি।

চ্যানেল গুলো তে সকল বিভাগ মিলিয়ে কমবেশি ৮৭০০ কর্মী হবে, আর একই সাথে তাদের পরিবার ভাবতেই আমার ভয় হয় যতটা না হয় এই “করোনা” কে। এই চ্যানেল গুলোতে বেতন না দেওয়া আর কর্মী ছাটাই আগে থেকেই ছিল। তার উপর এখন এই অবস্থা। দিন দিন চ্যানেল গুলোর একমাত্র আয়ের উৎস বিজ্ঞাপন কমতে শুরু করেছে। মিডিয়া কর্মীরা পরছে অনিশ্চয়তায়।

Kantar এর একটি Analyses দেখা গেছে কোভিড- ১৯এর প্রভাবে, বাংলাদেশে প্রায় ৩৯% শতাংশ বিজ্ঞাপন আয় কমে গেছে (COVID-19 Impact on TV viewing)| Gক্ষেত্রে সংবাদ ভিত্তিক চ্যানেল গুলো কিছুটাব্যতিক্রম । যেখানে বিগত বছর গুলোতে মিডিয়া ব্যাজেট থাকত ৯০০-১১০০ কোটি টাকার মধ্যে, সেখানে এই বছর মাত্র ৫০০-৬০০ কোটি টাকা হবে।দেশীয় চ্যানেল গুলো ফ্রি টু এয়ার বলে বিজ্ঞাপনই আমাদের একমাত্র চালিকা শক্তি ।

যেহেতু বর্তমান প্রেক্ষাপটে মানুষ অনলাইনে বেশি সময় ব্যয় করে থাকে, তাই বিজ্ঞাপন দাতারাদের ডিজিটাল সেক্টরে বিজ্ঞাপন দেয়ার প্রবনতাটাও বেশি, আর তারপরই বেঁছে নেয়া হয় সংবাদ ভিত্তিক চ্যানেল, তাই সংবাদ ভিত্তিক চ্যানেল গুলোতে উপচে পরা বিজ্ঞাপন।

এক্ষেত্রে বিনোদন ভিত্তিক চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপন নাই বললেই চলে। করোনার ছোঁয়াছুয়ি বাছবিচারে সচেতনার কারনে কমেছে বাড়িতে খবরের কাগজের ব্যবহার এরই মধ্যে দুটি পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেছে। আরো বেশকিছু পত্রিকা বন্ধ হওয়ার পথে। এক্ষেত্রে অন- লাইন নিউজের কাটতি কিন্তু ভালো۔ মানুষ যেহেতু গৃহবন্দী থাকছে এই অস্থির অবস্থায় তারা টেলিভিশনের চেয়ে ডিজিটাল মিডিয়াতে বেশি সময় থাকছে। ফলে দেখা যাচ্ছে বর্তমানে ৬৩% শতাংশ টিভি, ৭৭% শতাংশ সোশ্যাল মিডিয়া, ৫৮% শতাংশ ইনস্ট্যান্ট ম্যাসেজ, ৭০% শতাংশ অনলাইন ভিত্তিক স্ট্রিমিং,আর ২৭% শতাংশ ব্যয় করছে প্রত্রিকায়। (তথ্য সূত্র : KANTAR COVID-19 Barometer Bangladesh)

বর্তমান প্রেক্ষাপটে কিছু বিজ্ঞাপন তুলনামূলক বেড়েছে যেমনঃ মানি ট্রান্সফার, স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, লিকুইড সাবান, বার সাবান, ডিস ওয়াস, ফ্লোর ক্লিনার, ওয়াশিং পাউডার, ভোজ্য তেল, লবন, আটা, গুড়ো দুধ, খাদ্য দ্রব্য ইত্যাদি। তেমনি মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের তালিকায় এদের ব্যবহারও বেড়েছে আগের তুলনায় ১০% শতাংশ। (তথ্য সূত্র: COVID-19 Impact on TV viewing)

কিন্তু অপরদিকে বাকি সকল ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন এবং পণ্যের ব্যবহার কমে এসেছে যেমনঃ রূপচর্চা সামগ্রী, বিভিন্ন প্যাকেটজাত খাবার, চিপস, সফট ড্রিংকস, সুপ,তরল দুধ ইত্যাদি। (তথ্য সূত্র : COVID-19 Barometer Bangladesh)

চলমান মহামারীর ফলে থমকে গেছে রেস্টুরেন্টে খাওয়া, ভ্রমন, হেয়ারড্রেসিং, বিউটি পার্লার, ফিটনেস ক্লাব, পোষাক,বিলাসিতার পণ্য, রূপচর্চা সামগ্রী, আবাসন, শেয়ার বাজার, ইলেক্ট্রনিক বাজার ইত্যাদি। এই সকল ক্ষেত্রে মানুষের ব্যয় হ্রাস পেয়েছে। অপরদিকে এই মহামারী মানুষের অন্ন ও স্বাস্হ্যজনিত নিয়ামককে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রভাবিত করেছে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে যেমনঃ মৌলিক মহামারী প্রতিরোধের পণ্য, বাসস্থান পরিষ্কারের পণ্য, খাদ্য ও পানীয়, ঔষুধ, চিকিৎসা, পুষ্টি এবং স্বাস্থ্য,ইন্টারনেট, অনলাইন বিনোদন ইত্যাদি।

তবে আমরা যদি একটু খেয়াল করি, বাংলাদেশে বিদেশী চ্যানেল গুলোর যেই দাপট ছিল তা কিন্তু অনেকাংশেই কমে গেছে। বাংলাদেশের দর্শকদের কাছে এখন দেশীয় চ্যানেল গুলোর জনপ্রিয়তা অনেক বেশি । এখন দর্শক বিদেশী চ্যানেল এর চেয়ে ১৬৩% শতাংশ বেশি দেশীয় চ্যানেল দেখছে।

দেশি চ্যানেলগুলি ও ইফতার ও সেহেরীর সময় অনুসরণ করে প্রোগ্রাম সাজিয়েছে۔ এক উপাত্তে উঠে এসেছে টিভির রিমোট এখন দীর্ঘ মেয়াদিক্ষণ পুরুষদের দখলে۔ যা করোনাকালীন ক্রমবর্ধমান ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সজনিত নারী নির্যাতনবৃদ্ধির বৈশ্বিক চিত্রের সাথে অদৃশ্য ভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এখন সরকারের উদার প্রণোদনাই পারে টেলিভিশন মিডিয়াকে বাঁচাতে। তাহলেই হয়তো ঘুরে দাঁড়াবে এই শিল্প আর আমরা নিজেরা ও যদি এখন থেকেই কোন পদক্ষেপ না নেই তার পরিনতি হবে ভয়াবহ। এখনই আমাদের মিডিয়া শিল্পকে বাঁচাতে নিতে হবে সম্মিলিত উদ্যোগ এইক্ষেত্রে সব চাইতে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন অনুষ্ঠানের মানউন্নয়ন,۔ না হলে আবার টিভি দর্শককে ঘিরে ধরবে বিদেশি চ্যানেল, জনপ্রিয়তা হারাবে দেশিয় চ্যানেল ।

তাই বন্ধ করতে হবে বিজ্ঞাপন দাতা ও বিজ্ঞাপনী সংথা আধিকরতার মতানুসারে চলা, উদ্যোগ নিতে হবে সরকারি নিতিমালা বাস্তবায়নের , বিজ্ঞাপনের মুল্য নির্ধারণ , অতিমাত্রাই বিজ্ঞাপন বন্ধ করা, বিজ্ঞাপনের টাকা সময় মত পরিশোধ করা আর বাংলাদেশ এর চ্যানেল গুল কে প্রে চ্যানেল উন্নত করা। আমাদের টেলিভিশনের পাশাপাশি ডিজিটাল মিডিয়াতেও বেশি মাত্রায় ফোকাস করতে হবে।

বেতন ভাতা ও টেলিভিশন পরিচালনার ক্ষেত্রে, বিজ্ঞাপন নির্ভর না হয়ে, প্রে- চ্যানেল এর মাধ্যমে কেব্ল অপারেটরের দর্শক প্রদেয় মাসিক ফী নির্ধারণ।

সময় মত বিজ্ঞাপনের বকেয়া টাকা নিশ্চিত করে, মিডিয়া কর্মীদের বকেতা বেতন ও বোনাস পরিশোধেরউদ্যোগ,  জানি না এই মহামারী আমাদের কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে! কিন্তু এইটা বুঝতে পারছি এখনেই যদি আমারা পদক্ষেপ না নেই আমাদের মিডিয়াগুলো ধুকে ধুকে মরবে। আর এর প্রভাব পড়বে এই ৮৭০০ কর্মী ও তাদের পরিবারের উপর।

২রা সেপ্টেম্বর ১৯৪৫ এর পর (২য় বিশ্বযুদ্ধ) থেকে আজ মে ২০২০ প্রজন্তু জীবন জীবিকা এবং অর্থনীতির উপর সবচেয়ে বড় হুমকি বিবেচ্য হচ্ছে করোনা ভাইরাস। ইতি মধ্যে সমাজে মানুষের আচরণে, কাজে এর প্রভাব পরিদৃষ্টি হচ্ছে। গত এপ্রিল বৈশ্বিক এক তৃতীয়াংশ চলাচল স্থিবির হয়ে গেছে মানুষ। আজ pandemic-এর জন্য গৃহ বন্দী। সংকট আতিতেও আসছে ভবিষ্যতে ও আসবে। কিন্তু মানব সভ্যতা বার বার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, আমারা করোনা করবো জয় একদিন, বিশ্বাস হারাব না। আমারা আমাদের পাশে থাকবো।

মোহাম্মাদ আক্তার হোসেন (আক্তার বাবু)

গণমাধ্যমকর্মী

ইমেইল : ahbabu123@gmail.com