আমার চাকরি হারানো সহকর্মী

আজহার লিমন

ইতস্তত হচ্ছিলো খুব। কী করে জিজ্ঞেস করি, কেমন আছেন? সংবাদকর্মী থেকে সদ্যই বেকার হয়েছেন যে সহকর্মী তাকে কী করে জানতে চাওয়া যায়, কেমন আছেন?? তবে দায়িত্ব পড়েছে গণমাধ্যম শিল্পে করোনা সংকটের প্রভাব নিয়ে স্টোরি করার। কেইস স্টাডি স্টোরিকে সমৃদ্ধকে করে। এ গল্পের কেইস স্টাডি আমার বেকার সহকর্মী!

করোনাকালের শুরুতেই চাকরি হারিয়েছেন সহকর্মী। এমন যেন দুর্ভাগ্য একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিলো। খুশি কিংবা অখুশি মনে কিংবা ঠাট্টাচ্ছলে যে পরিবার প্রতিবার ফেরার পর তাকে “এই যে সাংবাদিক আসছেন” বলে সম্বোধন করতেন। কিংবা প্রতিবেশিরা যখন রাজধানী ফেরত সাংবাদিকের কাছে উৎসাহ ভরে করোনার অবস্থা জানতে চাইলো-
তখন কেমন অনুভূত হয়েছিলো তার?

কিংবা বেতনহীন, বেকার বলে প্রতিবারের মতন বৃদ্ধ পিতামহের জন্য এক কেজি মাল্টা কিংবা হাফ কেজি আঙ্গুর নিতে না পারার বেদনাটা তার কোথায় আটকে ছিলো। মায়ের হাতের লেবুর শরবতটা কি গলা বেয়ে নামতে চাচ্ছিলো তার?
সামাজিক দূরত্বের কিংবা সঙ্গনিরোধের সুযোগে গ্রামের সবুজ মাঠের আইলে নির্মিত অপরাহ্নের বন্ধুমহলে হাজিরা দিতে হয় নি তার। সেহিসেবে বাঁচা গেছে হয়তো সে লজ্জা থেকে।

বলা হয়ে থাকে, সংবাদ শিল্প আর দশটা শিল্পের মত বিকাশমান শিল্প, চাকরি হিসেবে সাংবাদিকতাও বেসরকারি একটা চাকরি। কিন্তু গণযোগাযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে এর সামাজিক পরিসর অন্য আর দশটা বেসরকারি চাকরির মত নয়। বন্ধুদের মাঝে খবরওয়ালা হয়ে থাকে সংবাদকর্মী; যেভাবে চিকিৎসক কিংবা পুলিশ সহপাঠী থাকে না। পাড়া প্রতিবেশি, শিক্ষক কিংবা স্বজন প্রতিদিনকার সংবাদ সেবার মাঝে খুজেঁ পান তাদের সামনে বড় হওয়া সে ছেলে বা মেয়েটিকে। সঙ্গত কারণেই একজন সংবাদকর্মীর চারপাশ অনেক বিস্তৃত হয়ে যায়। নানাভাবে মনে রাখে তাকে।

কিন্তু সামাজিক এই মর্যাদার সমানুপাতে কতটা পেশাগত নিরপত্তা আছে সংবাদ শিল্পে?
এই নিয়ে কোন গবেষণা কিংবা প্রক্ষেপণ আছে কি না জানা নেই। তবে অন্তত সংবাদ মাধ্যমে যে এ নিয়ে আলোচনা নেই তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। ভেতরে ভেতরে অসন্তোষের খবর পাওয়া যায়। সামাজিক মাধ্যমে ভাসে, গ্রুপগুলোতে ঝড় উঠে। কিন্তু সংবাদ শ্রমিকদের আক্ষেপ নাই এমন গণমাধ্যমও কি এ নিয়ে কথা বলে? কতটা?

অধিকারবঞ্চিত শোষণের শিকার সংবাদকর্মীরা নিভৃত হয়, গার্মেন্টসকর্মীদের মত মাঠে নামা তার মানায় না। কিংবা নামলেও তার কথা পৌছবে কি, কতদূর পৌছলে কতটা কাজ হবে তা আর সংশয় নয়, হতাশার বিষয়। তথ্যমন্ত্রীর দেয়া সবশেষে তথ্যমতে, দেশে দেশে দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা ১২শ’র বেশি। অনলাইন অগুনিত। কিন্তু গণমাধ্যম শিল্প হিসেবে কতটা দাড়িয়েছে?

সাংবাদিকতাকেও পেশা হিসেবে নেয়া যায়। আর ৮-১০টা পেশার মত সম্মানের সঙ্গে জীবিকা করা যায়। এসময়টা এখনও এসেছে কি?

ডাকসাইটে পরিচিত এমন ৭-৮টা পত্রিকাও বন্ধ হয়ে গেছে এ সংকটকালে, ফিরেছেও তার কিছু। তবে সেবার ছলে কিংবা ছায়ার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত যে শতশত সংবাদ দোকান; তাতে কী পরিমাণ তরুণ সংবাদকর্মী বিদীর্ণ হলো কিংবা হতাশা-লজ্জায় নিভৃতে গেল। তার কোন হিসেব আছে কি কিংবা কোন আলোচনা যুগাবে কি জিরো টলারেন্ট খ্যাত গণমাধ্যমগুলো?

এর উত্তর জানা নেই, তবে সাক্ষাতকার দেয়া বন্ধুটি আমাকে জানিয়েছিলো; আসলে গ্রুপ অব কোম্পানীর সে পত্রিকার কর্ণধাররা একটা সুযোগের অপেক্ষার ছিলো বন্ধ করার। অনুরোধ করে বলেছিলো, ভয়েসটা চিনে ফেললে পাওনার যে অংশটা দেবে বলেছে, তাও দেবেনা।

দু’মাস হয়ে গেল! জানি না, চাকরি হারানো সে সহকর্মী পাওনার ঐ অংশটুকুই পেয়েছেন কি না?

আজহার লিমন, গণমাধ্যমকর্মী