যুক্তরাষ্ট্রে বিক্ষোভ: সাংবাদিকদের জন্যে নতুন ঝুঁকি

শামীম আল আমিন

আগে কখনো দেখেনি; এমন অনেক কিছুই এখন দেখছে গোটা বিশ্ব। করোনা মহামারীর এই সময়টায় মানুষ কতটা অসহায়, কতটা নিরুপায়; সেটাও বুঝতে পারলো সবাই। যদিও বলা হচ্ছে, এক’শ বছর পর পর এমন মহামারীর কবলে বেশ কয়েকবার পড়েছে পৃথিবী। কিন্তু কথা হচ্ছে সভ্যতার অগ্রগতির এমন সময়ে মানুষ কি একবারও ভাবতে পেরেছিল এইভাবে তাদেরকে গণমৃত্যু চেয়ে চেয়ে দেখতে হবে!

যেকোন অস্বাভাবিক পরিস্থিতিই গণমাধ্যমকর্মীদের জন্যে সংবাদের উৎস। করোনাকালও তাই। কিন্তু ভাইরাসের সংক্রমণের ধরণ যেমন ঝুঁকিতে ফেলেছে সবাইকে; তা অনেক বেশি সংবাদকর্মীদের জন্যে। এই লেখাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে।

করোনাকাল এখনো যায়নি। তার মধ্যে হঠাৎ করেই নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন। পুঞ্জিভূত ক্ষোভের হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটেছে মিনেসোটার মিনিয়াপোলিসে পুলিশের হেফাজতে জর্জ ফ্লয়েড নামে একজন কৃষ্ণাঙ্গের করুণ মৃত্যুর ঘটনায়। “ব্ল্যাক লাইভ ম্যাটার” এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ এক পর্যায়ে রূপ নেয় সহিংসতায়। আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে একদল দূবৃৃর্ত্ত শুরু করে লুটপাট আর জ্বালাও পোড়াও। একদিকে ন্যয়বিচার ও সংস্কারের দাবি; অন্যদিকে সহিংসতা; গোটা পরিস্থিতি হয়ে ওঠে অশান্ত। এমন সময়ে নতুন ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি পড়ে যায় সাংবাদিকরাও।

অনেকেরই হয়তো মনে আছে, মিনিয়াপোলিসে চলা বিক্ষোভের লাইভ সম্প্রচারের সময় সিএনএনের এক সাংবাদিককে আটক করেছিল পুলিশ। ওমর জিমিনেজ নামে ওই সাংবাদিককে আটকের ঘটনায় গোটা যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। এমনকি সঙ্গে তার ক্যামেরাম্যান ও প্রযোজককেও পুলিশ আটক করে। অবশ্য পুলিশ পরে তিনজনকেই ছেড়ে দেয়। ভুল বোঝাবুঝি বলে দু:খও প্রকাশ করে। কিন্তু এই ঘটনাটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সুষ্পষ্ট লংঘন বলে উল্লেখ করেছে সিএনএন। কেবল তাই নয়, বিক্ষোভের সময় আটলান্টায় সিএনএন এর কার্যালয়কেও আক্রান্ত হতে দেখেছি আমরা।

দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতা ও লুটপাট ঠেকাতে নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন শহরে কারফিউ পর্যন্ত দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। এমন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয় সাংবাদিকদের। বিশেষ করে ভয়াবহ সহিংসতা, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটে সংবাদ সংগ্রহের বিষয়টি ছিল ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। লুটপাটকারীদের উদ্দেশ্যে ক্যামেরা তাক করে রোষানলে পড়তে হয়েছে অনেককে। বাংলাদেশের সময় টিভির সাংবাদিক হাসানুজ্জমান সাকী এবং আইটিভির প্রধান মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে বিক্ষোভ, লুটপাট ও সহিংসতার খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে লাঞ্ছনা ও মারধরের শিকার হন। অবস্থা এমন হয়ে উঠেছিল প্রাণটাই খোয়াতে বসেছিলেন তারা! বলা চলে ভাগ্যগুণে বেঁচে গেছেন এই দুই সংবাদকর্মী। কেননা গোটা শহরজুড়ে তখন এমন পরিস্থিতি চলছিল যে পুলিশের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। ফলে কোন সাংবাদিক অতর্কিতে আক্রান্ত হলে তাকে উদ্ধার ও বাঁচানোর চেষ্টা করা পুলিশের পক্ষে তখন হয়তো সম্ভব হোত না। যদিও এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্র কঠিন আইনের দেশ। যেকোন ধরণের ঘটনায় সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে চলে আসে। কিন্তু সহিংসতার এই পরিস্থিতিতে এটা সম্ভব নয়।

সাংবাদিকরা নিজেদের নিরাপত্তার জন্যে বিভিন্ন ধরণের ব্যবস্থা নিচ্ছে এখানে। বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটসহ যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যেমন প্রস্তুতি থাকে, অনেককে তেমনটাই নিতে দেখা গেছে। সেই সাথে টেলিভিশন সাংবাদিকরা মাইক্রোফোনে পরিচিতিমূলক ফ্ল্যাগ বা লোগো ব্যবহার করছেন না। কেননা কোন প্রতিষ্ঠানের খবর কারা পছন্দ করছেন না; কি ধরণের ঝুঁকি তৈরি হয়; এসব কারণকে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। এরপরও জীবণের ঝুঁকি নিয়েই সাংবাদিকরা কাজ করে গেছেন। বিশেষ করে ক্যামেরাম্যান ও ফটো সাংবাদিকরা।

কারফিউ চলার সময় জনমানুষের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। এরপরও বিভিন্ন শহরে সমাবেশ ও বিক্ষোভ অব্যাহত রাখে আন্দোলনকারীরা। রাতের অন্ধকারে হেলিকপ্টার দিয়ে সেইসব সংবাদ সংগ্রহ করতে দেখা গেছে সংবাদকর্মীদের। হেলিকপ্টারে ঘুরে ঘুরে সরাসরি সংবাদ সম্প্রচারও করেছে বিভিন্ন টেলিভিশন।

সবচেয়ে বড় কথা দেশজুড়ে চলা এই আন্দোলনে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ আবারো বেড়ে যাওয়ার আশংকা করা হচ্ছে। আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে মাঠে থাকতে হয়েছে সাংবাদিকদের। অনেক সময় চাইলেও সুরক্ষা সামগ্রী ঠিকমতো পড়া সম্ভব হয়নি; সোশ্যাল ডিসটেন্স রক্ষা করার বিষয়টিও প্রায় অসম্ভব ছিল। কঠিন এই সময়ে এতসব ঝুঁকির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে সাংবাদিকদের। সাংবাদিকের ঝুঁকির বিষয়টি নতুন কিছু নয়। সময় ও অবস্থানে কেবল এর ধরণ বদলায়। তবে এবার যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদবিরোধী বিক্ষোভের দাবানল ও সহিসংতা অনেক নতুন বিষয়কে সামনে এনেছে। যে কারণে সাংবাদিকের ঝুঁকির বিষয়টি নিয়েও হয়তো নতুন করেই ভাবতে হবে।

শামীম আল আমিন, লেখক ও সাংবাদিক