করোনায় কমিউনিটি রেডিওর ভূমিকা ও একটি প্রস্তাবনা

মাহফুজ ফারুক

দেশে সম্প্রচারে রয়েছে ১৭টি কমিউনিটি রেডিও। রেডিও স্টেশনগুলো সারাবছর সম্প্রচার কার্যক্রম অব্যাহত রাখলেও দুর্যোগের সময় একটু আলাদাভাবেই আলোচনায় উঠে আসে। সক্ষমতার উপর ভিত্তি করে একেকটি রেডিওর সম্প্রচার সময় একেক রকম। কোনো কমিউনিটি রেডিওই ২৪ ঘন্টা চলে না। কিন্তু দেশে যখনই কোনো দুর্যোগ এসেছে তখনই এ রেডিওগুলো নিরবচ্ছিন্ন ২৪ঘন্টা সম্প্রচার অব্যাহত রেখেছে। সম্প্রতি আম্পানে উপকূলের কমিউনিটি রেডিওগুলোর ভূমিকা কমবেশি সবার জানা। এছাড়া গত প্রায় এক দশকে বিভিন্ন দুর্যোগ মোকাবিলায় কমিউনিটি রেডিওর প্রয়াস অনস্বীকার্য।

করোনার আগে বন্যা/খরাসহ অন্য দুর্যোগগুলো ছিল এলাকাভিত্তিক। সে অনুপাতে একেকটি রেডিওর ছিল একেক রকম ভূমিকা। কিন্তু করোনা যেহেতু সব এলাকার জন্যই সমান উদ্বেগের; তাই শুরু থেকেই ১৭টি রেডিওই একে গুরুত্ব দিয়ে সম্প্রচার সূচী প্রণয়ন করেছে এবং সে অনুযায়ী তা বাস্তবায়নও করছে। এই ১৭টি রেডিও প্রতিদিন ৪০ঘন্টারও বেশি সময় করোনা বিষয়ক তথ্য ও সচেতনতামূলক বার্তা ও অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে। যার আওতায় রয়েছে ১৬টি জেলার ৬৮ লাখেরও বেশি মানুষ।

ইতোমধ্যে জাতীয় গণমাধ্যমেও করোনা জয়ে কমিউনিটি রেডিওর ভূমিকা নিয়ে একাধিক সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। অন্যান্য অনেক বিষয়ের মতো করোনা নিয়েও এমন কিছু তথ্য রয়েছে যা হয়তো জাতীয় গণমাধ্যমের কাছে সংবাদমূল্য বহন করে না। কিন্তু ওই কমিউনিটির মানুষের সাথে যেহেতু বিষয়টি সম্পৃক্ত এবং তারা তা জানতে চান; এক্ষেত্রে কমিউনিটি রেডিও সে ভূমিকাটি পালন করছে। স্থানীয় ভোক্তার করোনাকালীন এ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার আগে থেকেই করোনা বিষয়ক সচেতনতাধর্মী পিএসএ, আরডিসি, জিঙ্গেল ও স্পট সম্প্রচার শুরু করে। এর মধ্য দিয়ে কমিউনিটির মানুষকে সচেতন করার কাজটি শুরু করে কমিউনিটি রেডিওগুলো।

বাংলাদেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্তের দিন থেকে প্রতিদিন করোনার সর্বশেষ স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান ও চলমান অবস্থা নিয়ে নিউজ বুলেটিন সম্প্রচার করে আসছে।

এছাড়া করোনার ব্রেকিং নিউজ, ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম, এক জেলা থেকে অন্য জেলায় সরকারিভাবে ধান কাটার জন্য কৃষক প্রেরণের বিষয়সহ করোনা বিষয়ক নানা ধরণের তথ্য নিয়মিত সম্প্রচার করে আসছে। জেলা প্রশাসন, সিভিল সার্জন, পুলিশ বিভাগ, স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসহ সিভিল সোসাইটির মানুষদের করোনা বিষয়ক বিভিন্ন পদক্ষেপ প্রভৃতি বিষয় নিয়ে সরাসরি তাদের কণ্ঠে বার্তা প্রদানের কাজ করছে। এর ফলে একদিকে যেমন সচেতনতা ও সতর্কতা তৈরী হচ্ছে অন্য দিকে তৈরী হচ্ছে জবাবদিহিতাও। প্রচার করা হচ্ছে হাত ধোয়ার পদ্ধতি, হ্যা-স্যানিটাইজার বা সাবান ব্যহারের গুরুত্ব, ঘরে থাকার প্রয়োজনীয়তার কথাসহ গুরুত্বপূর্ণ আরো অনেক নির্দেশনা।

জরুরী প্রয়োজনে বাইরে বের হতে হলে সামাজিক দূরত্ব যেন নিশ্চিত করা হয় তার উপর জোর দিয়ে চলছে প্রচারণা। সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তি, সংগঠন ও বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক গৃহীত ত্রাণ প্রদান কার্যক্রমকে উৎসাহিত করার জন্য নেয়া হয়েছে প্রচারণা ব্যবস্থা। টেলিমেডিসিন বিষয়ক অনুষ্ঠান, স্থানীয় মানুষের মুখের ভাষায় সচেতন তামূলক বার্তা প্রদান, কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করণের তথ্য প্রদানসহ স্বাস্থ্য-খাদ্য-আইনশৃংখলা বিভাগসহ জরুরী সেবা প্রাপ্তির সংযোগকেন্দ্র হিসেবেও ভূমিকা পালন করছে কমিউনিটি রেডিওগুলো। যা ইতোমধ্যে সম্প্রচার এলাকার মানুষের মাঝে ইতিবাচক সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছে ।

কমিউনিটি রেডিওর কাজের স্বীকৃতির অংশ হিসেবে সম্প্রতি গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মতিন এক ভিডিও কনফারেন্সে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট কমিউনিটি রেডিওর ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। করোনার প্রভাবে জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের আয়ের জায়গাটি যেমন সংকুচিত হয়ে এসেছে। তারচেয়েও বেশি সংকুচিত হয়ে এসেছে কমিউনিটি রেডিওর আয়ের ক্ষেত্রটি। এ অবস্থায় সরকার যদি কমিউনিটি রেডিওগুলোর কাছ থেকে নির্ধারিত একটি সময় ক্রয় করে করোনা বিষয়ক সম্প্রচারের জন্য ব্যবহার করেন। তাহলে একদিকে যেমন দুর্গম চর ও প্রান্তিক পর্যায়ে খুব সহজেই তথ্য ও সচেতনতামূলক বার্তা পোঁছানো সম্ভব হবে; অন্যদিকে কমিউনিটি রেডিওগুলোও তাদের টিকে থাকার লড়াইয়ে কিছুটা হলেও গতি ফিরে পাবে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী