করোনায় গণমাধ্যম: ভূমিকা ও বাস্তবতা

জাফর সাদিক

বিশ্বব্যাপী অতিদ্রুত ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসজনিত মহামারী বাংলাদেশে সনাক্ত হয় একটু দেরিতেই। ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী সনাক্তের পর মধ্য মে থেকে  এ ভাইরানে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকে লাফিয়ে লাফিয়ে। সম্পূর্ণ নতুন ধরণের এই ভাইরাসের চরিত্র সনাক্ত, গতি-প্রকৃতি নির্ণয় ও বিস্তারে একটু যেন হতবিহ্বল হয়ে পড়ে পুরো দেশ। বিস্তাররোধ, সনাক্তকরণ পদ্ধতি, চিকিৎসা প্রদান ইত্যাদি নানা বিষয়ে নীতি নির্ধারকরাও যেন খানিকটা সিদ্ধান্তহীনতায় পড়েন, তেমনি জনগণও পরিস্থিতি ভালভাবে বুঝতে পারার আগেই কয়েক দফা সাধারণ ছুটি আর অঘোষিত লকডাউনের কবলে হতচকিত হয়ে উঠে।

করোনার এ সময়কালে সার্বিক পরিস্থিতি বুঝতে এবং সরকারি নানা সিদ্ধান্ত জানতে গণমাধ্যমের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল হয়ে উঠে পুরো দেশ। বিশেষ করে প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সরবরাহকৃত আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য, সরকারের বিভিন্ন আদেশ-অনুশাসন, সার্বিক করোনা পরিস্থিতি, বিভিন্ন স্থানের বিস্তারিত চিত্র সম্পর্কে জানতে গণমাধ্যমের বিকল্প হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিছুটা ভূমিকা রাখলেও সংবাদ উৎস এবং বস্তুনিষ্ঠতার প্রশ্নে গণমাধ্যমের বিকল্প তৈরী হয় নি। গণমাধ্যমের বিপরীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পুরো আস্থা গড়ে উঠে নি অধিকাংশেরই। এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সংবাদ উৎস হিসেবে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদেরই!

কিন্তু করোনাকালীন এই সময়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা আসলে কি? গণমাধ্যম কি গণমানুষের মাধ্যম হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পেরেছে নির্মোহভাবে? সঠিক তথ্যের অবাধ সরবরাহের পাশাপাশি গণমাধ্যম কি পেরেছে ক্ষমতাশীলদের জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে? এসব প্রশ্নের একবাক্যে উত্তর দেয়া কিছুটা কঠিন হলেও একথা নির্দি¦ধায় বলা যায় যে, করোনাকালের সাংবাদিকতা যতটা কঠিন সময় পার করছে সাম্প্রতিক অতীতে এরকম নজির নেই।

একদিকে ভাইরাসটির বিস্তারে সংবাদমাধ্যমের সংবাদ সংগ্রহ পদ্ধতি যেমন পাল্টে গেছে অন্যদিকে নূন্যতম নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিয়েই সংবাদ সংগ্রহ করছেন সংবাদকর্মীরা। দায়িত্ব পালনকালে ইতিমধ্যে প্রায় শত সাংবাদিকের দেহে ভাইরাসটির বিস্তার ঘটেছে। নূন্যতম ৫ জন সংবাদকর্মী এরইমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন। অন্যদিকে গণমাধ্যমের আয়ের প্রধান উৎস অধিকাংশ বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম আর্থিক সংকটে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। গত ৩ এপ্রিল ওয়াল স্ট্রীট জার্নালের এক প্রতিবেদনে প্রকাশ, করোনাভাইরাসের এই দুর্যোগের সময়ে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর দর্শকসংখ্যা অনেক বাড়লেও আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে বিজ্ঞাপনের হার। ভাইরাস-সংক্রান্ত কোনো সংবাদের পাশে নিজেদের বিজ্ঞাপন দিতে চাচ্ছে না বড় বড় ব্র্যান্ডসহ অনেক প্রতিষ্ঠান। ব্যবসা সংকুচিত হওয়ায় বিজ্ঞাপন দেয়ার মত অবস্থায়ও নেই অনেক প্রতিষ্ঠান। এ অবস্থায় বন্ধ হয়ে গেছে বেশ কিছু পত্রিকা। কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান। দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া ঝুঁকিভাতা তো অলীক কল্পনা, নিয়মিত বেতন ভাতাই পরিশোধ করতে পারে নি দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যম।

এতসব প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও এখন পর্যন্ত কাজ করে যাচ্ছে গণমাধ্যমগুলো। সম্প্রচার বন্ধ করে নি কোন টেলিভিশন চ্যানেল, প্রকাশিত পত্রিকাগুলোও তার ছাপা কিংবা অনলাইন প্রকাশনা বন্ধ করে নি। কিন্তু ঝুঁকি নিয়ে চললেও গণমাধ্যম কি নির্মোহভাবে সঠিক তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করতে পারছে? পারছে কি করোনাকালে গণমানুষের মুখপাত্র হয়ে উঠতে?- এ প্রশ্ন থেকেই যায়। আর এ প্রশ্নের উত্তরে ইইউ অবজারভারকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টের শীর্ষ পরামর্শক টম গিবসনের একটি মন্তব্য বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন, “সাংবাদিকতা পেশাটি এমনিতেই অনেক বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আর বর্তমান বৈশি^ক মহামারিতে বিপর্যস্ত অর্থনীতির মাঝে বিচ্ছিন্ন কর্মক্ষেত্রে প্রকৃত এবং ঘটনার অন্তরালের খবর তুলে ধরা একজন সাংবাদিকের জন্য অনেক বেশি জটিল ও দুরূহ হয়ে উঠেছে।”

টম গিবসনের এই মন্তব্যের আলোকে যদি আমরা বাংলাদেশের গণমাধ্যমের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই, এখানে করোনা বিস্তারের সূচনালগ্ন থেকেই গণমাধ্যমকে বিভিন্ন বিধি-নিষেধ আর নিবর্তনমূলক নানা আইনের যাঁতাকলে বন্দী রাখার প্রয়াস চলমান। গণমাধ্যমে করোনাকালীন গুজব প্রচার প্রতিরোধে এমনকি তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে গুজব মনিটরিং কমিটিও করা হয়েছিল এই তো কয়েকদিন আগেই, যা ব্যাপক সমালোচনার মুখে প্রত্যাহার করা হলেও ডিজিটাল সিকিউরিট আইন বা অন্যান্য নিবর্তনমূলক আইন প্রয়োগে সাংবাদিকদের হয়রানি বন্ধ করা যায় নি। সারাদেশেই গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধে হামলা, মামলা, হুমকি ও ভয়-ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটেছে। শুধু এবছরের শুরু থেকে মে পর্যন্ত প্রায় বিশোর্ধ্ব সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে। করোনা নিয়ে তথাকথিত ‘গুজব ছড়ানো’, ‘ত্রাণ নিয়ে অনিয়মের মিথ্যা অভিযোগে’ সাংবাদিকদের হেনস্থা ও আটক করা হয়েছে। এজন্যই বোধহয়, বিশ^ স্বাধীন গণমাধ্যম সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫১তম!

এসব না হয় গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধে নেয়া স্বার্থবাদীদের হঠকারী পদক্ষেপের ফল! কিন্তু গণমাধ্যমও কি পেরেছে ‘জনগণের কাছে তথ্য পৌঁছে দেয়া’র মহান দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে! যদি বলি, করোনা ভাইরাস বিস্তার ও প্রতিরোধে করণীয় নানা সচেতনতামূলক প্রচারণায় গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্যভাবে অতুলনীয় তাহলে একথাও প্রাসঙ্গিকভাবেই বলতে হয় যে, করোনা পরিস্থিতির বাস্তব চিত্রায়নে প্রকৃত তথ্যের অনুসন্ধানের তুলনায় সরকারী ভাষ্য প্রচারই প্রাধান্য পেয়েছে বেশি। বিশেষ করে, আক্রান্ত ও মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে জনমনে বিদ্যমান কঠিন ভ্রান্তি বা সন্দেহ দূর করতে গণমাধ্যমের প্রচেষ্টার ঘাটতি আছে। আবার সরকারের তাৎক্ষণিক নানা সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় গণমাধ্যমের তুলনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন মহলের প্রচ্ছন্ন চাপটাই বেশি শক্তিশালী প্রতীয়মান হয়েছে। গণমাধ্যম মূলত প্রচারমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তসমূহ যতটা নির্মোহভাবে প্রচার করতে পেরেছে ততটা পারছে না অন্তরালের ঘটনা অনুসন্ধান করে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন ও প্রচার করতে। অর্থাৎ প্রচারমাধ্যম হিসেবে সফল হলেও গণমানুষের মুখপাত্র হিসেবে, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যমের ভূমিকাকে কোনভাবেই প্রশ্নাতীত রাখা যাচ্ছে না।

তবে একথাও সত্য যে, করোনকালীন ত্রাণ ও সহায়তা সরবরাহে বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়ে যা কিছু জানা গেছে তা এই গণমাধ্যমের কল্যানেই। যদিও হামলা, মামলা, নির্যাতন আর হয়রানিতে এর মাশুল দিতে হয়েছে অনেক সংবাদকর্মীকেই। আবার প্রচ্ছন্ন রাষ্ট্রীয় প্রভাবেও অনেকসময় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশে অনাগ্রহী হয়েছে গণমাধ্যম। বিশেষ করে গণমাধ্যমের বৈধতা বিনষ্টের প্রবণতায় নানা সময় সরকারী উচ্চ পর্যায় থেকে অযাচিতভাবে গণমাধ্যমের সমালোচনা হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই বিভিন্ন অনুসন্ধান কিংবা সংবাদ প্রকাশে গণমাধ্যম আগ্রহ হারিয়েছে এমনটাও মনে করেন অনেক দর্শক। আবার বিভিন্ন গণমাধ্যমে যাচাই বাছাই ছাড়া বিশ^াসযোগ্য শব্দের ব্যবহারে অপ্রমাণিত বা ধারণাপ্রসূত গবেষণা প্রকাশ বা প্রচার কিংবা করোনার প্রতিষেধক বিষয়ে একেক সময় একেক ধরণের তথ্যের প্রচার এই সময়ে এসে গণমাধ্যমকে পাঠক-দর্শকের কাছে কিছুটা হলেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। দুর্নীতির অভিযোগ, করোনা পরীক্ষা ও সনাক্তকরণ এবং ত্রাণ বা চিকিৎসা সেবায় ঘাটতি, বিভিন্ন দায়িত্বশীলদের মাঝে সমন্বয়হীনতা কিংবা যথাযথ দায়িত্ব পালনের ব্যর্থতার বিষয়ে গণমাধ্যমের কাছে সাধারণ পাঠক-দর্শকদের যে প্রত্যাশা ছিল অনেক ক্ষেত্রেই তা পূরণে ঘাটতি দেখা গেছে। বিশেষ করে হঠকারি ও সমন্বয়হীনভাবে নেয়া সরকারি নানা সিদ্ধান্তের সমালোচনায় কেমন যেন গা বাঁচিয়ে চলেছে গণমাধ্যম!

তারপরও করোনাকালে জনগণের কাছে তথ্য সরবরাহ এবং সচেতনতামূলক প্রচারণায় গণমাধ্যমের যে অবদান, তার যথাযথ স্বীকৃতি দিতে কার্পণ্য দেখানোর যেমন সুযোগ নেই, তেমনি একথা বলতেও দ্বিধা নেই যে, রাষ্ট্রের উচিৎ এমন পরিবেশ তৈরী করা- যাতে গণমাধ্যম স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্টভাবে তথ্য প্রকাশ করতে পারে। কারণ বাস্তব তথ্যের সাথে প্রকাশিত তথ্যের যত বেশি পার্থক্য হবে, তত বেশি আতঙ্ক ও সংকট বাড়বে এবং ভুল পরিকল্পনার সম্ভাবনা তৈরী হবে।

লেখক: উন্নয়নকর্মী