কোভিডকালের সাংবাদিকতা

সৈয়দ ইফতেখার

করোনাভাইরাস বা কোভিড-নাইনটিনের এ সময়ে বদলেছে সারা বিশ্বের গতি-প্রকৃতি। বদলেছে অর্থনীতি, সমাজ ব্যবস্থা এমনকি রাষ্ট্রচিন্তাও। শিক্ষা-দীক্ষার ধরনেও বদল এসেছে বিশ্বব্যাপী। এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই নতুন মোড় নিয়েছে সাংবাদিকতার ধরন-ধারণা।

কোভিডকালের সাংবাদিকতায় সবচেয়ে ‘সেইফ জার্নালিজম’ বলা হচ্ছে, অনলাইন জার্নালিজমকে। নিউ মিডিয়ার যুগে অন্যতম চ্যালেঞ্জিং সংবাদমাধ্যমই বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে নিরাপদ। পক্ষান্তরে সম্প্রচার সাংবাদিকদের ঝুঁকি সর্বাধিক। তাই অনেক স্কলারই বলছেন, সেফটি ফর জার্নালিজমের সময় এখন, পারফর্মিংয়ের নয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানে সাংবাদিক হানা মেস এ নিয়ে বিস্তারিত লেখেছেন। কীভাবে সাংবাদিকরা কোভিড-নাইনটিনের সময়টায় কাজের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছেন, তাই তুলে ধরেছেন তিনি।

কী দিন কী রাত, ২৪ ঘণ্টাই খবর। ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট বা সম্প্রচার সাংবাদিকদের ছোটাছুটি। দেশে সংবাদভিত্তিক টেলিভিশনগুলো এখন শীর্ষে। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের অবস্থাও একই রকম। নিউজরুম ও মাঠ সচল ঝুঁকির পরও। মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন-এর উপস্থাপক করোনা আক্রান্ত হয়েও বাসা থেকে তার অনুষ্ঠান চালিয়ে গেছেন। বিন্দুমাত্র দমে যাননি।

করোনা সংকটে সংবাদ হয়ে উঠেছে আরও শক্তিশালী। যেকোনো বিনোদনের চেয়েও। এ চিত্র যুক্তরাষ্ট্রে কেবল নয়, সারা পৃথিবীতেই একই অবস্থা। বাংলাদেশেও বিনোদননির্ভর চ্যানেলগুলো তাই সংবাদ চ্যানেলের ধারেকাছে নেই। তবে যাদের সংবাদ আয়োজন রয়েছে, অর্থাৎ যারা মিশ্র, তারাও বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছেন এ অংশটিকে। অধিকাংশ মানুষ এখন টেলিভিশনই দেখছেন, মেটাচ্ছেন তথ্যের ক্ষুধা, বাড়ছে যোগাযোগ। তারপর দেখছেন অনলাইন পোর্টালগুলো। বরাবরের মতো অনলাইন মাধ্যমগুলো দুরন্ত গতিতে দিচ্ছে আপডেট। অধিকাংশ খবর পরিবেশিত হচ্ছে মাল্টিমিডিয়া ধাঁচে। কিন্তু টেলিভিশন থেকে তাদের পার্থক্য হলো, সংকট সময়ে কাজের পদ্ধতিতে। টেলিভিশন যা সরাসরি দেখাতে পারছে, ফুজেটসমেত- অনলাইন তা অনেক ক্ষেত্রে পারছে না। অনলাইন সাংবাদিকতা এখন ঘরে বসে করতে হচ্ছে, ‘হোম অফিস স্টাইলে’। এতে শতভাগ সরাসরি বা লাইভ স্ট্রিমিং দেখতে মানুষের শেষ ভরসা চারকোণা বাক্সই। কারণ কোনো কিছু শোনা বা পড়ার থেকে- একের ভেতর তিন অর্থাৎ টেলিভিশনে দেখা-শোনা ও সংবাদের সুপার-টিকার পড়া অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ।

করোনাভাইরাসের ঝুঁকি এড়াতে ঘরে বসেই অনলাইনের জন্য কাজ করা যাচ্ছে, অফিসে বহু মানুষের সমাগম হচ্ছে না একসঙ্গে। ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার প্রশ্নে এদিক দিয়ে তারা চাপ মুক্ত বটে। কিন্তু টেলিভিশন তার পূর্ণ গতিতেই সচল। এ মাধ্যমের কর্মীদের হোম অফিস বলে কিছু নেই। তাই আক্রান্ত হলেও থেমে থাকার জো নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবশ্য ভিডিও বার্তার মাধ্যমে সংবাদের বক্তব্য বা কোটেশন (সট-বাইট-বিশেষজ্ঞ মতামত) আনা হচ্ছে। যা একান্তই বক্তার নিরাপত্তার স্বার্থে।

সাংবাদিকতার আরেগটি অংশ পত্রপত্রিকা বা খবরের কাগজ। দেশে-বিদেশে কয়েকটি বাদে অধিকাংশ পত্রিকা বন্ধ। তারাও এখন অনলাইন নির্ভর। চলছে বাসায় বসে নিউজ আপলোড, প্রতিবেদন তৈরি। স্বল্প লোকবল মাঠে রেখে যারা কিনা পত্রিকা বের করছেন বাংলাদেশে, ৩০ পাতার পত্রিকা গিয়ে ঠেকেছে ১০/১২ পাতায়, মূল্য রয়েছে আগের মতোই। কাগজের পত্রিকার মাধ্যমে হোক বা হকারের হাতের ছোঁয়া কিংবা হাঁচি-কাশিতে- করোনা ছড়াতে পারে বিধায় অনেকেই বাসায় বন্ধ করেছেন পত্রিকা রাখা। তাই পত্রিকা বিক্রি হু হু করে কমেছে। বাড়ির বৃদ্ধ কিংবা পড়ুয়া ব্যক্তিটিও এখন সকালে ঘুম থেকে উঠে টেলিভিশনের সকালের বুলেটিনে চোখ রাখেন। সকালের খবরও তাই পরিণত হয়েছে সন্ধ্যার মতো পিক/প্রাইম টাইমে।

সাংবাদিকতা হলো এমন একটি কাজ যা থেকে পিছু হটার সুযোগ কখনো হয় না। যুদ্ধে সব ধ্বংস হতে পারে। বয়ে যেতে পারে রক্ত গঙ্গা। দুই পক্ষের তুমুল জয়-পরাজয় খেলা। পালিয়েছে সবাই। যেকোনো পক্ষের শেষ সৈনিকটিও মারা যাবে কিছুক্ষণের মধ্যে। তার মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া অব্দি সাংবাদিক ছাড়তে পারেন না মাঠ। মৃত্যু হয়েছে কিনা তা জেনে, তারপর তিনি সেই সংবাদ পরিবেশন করবেন। তুলে আনবেন সঠিক ও নির্ভুল তথ্য। মাঠ পর্যায়ে সাংবাদিকতা এমনই। সত্য ও সঠিক সংবাদের জন্য টিকে থাকতেই হবে। এই টিকে থাকার নামই সাংবাদিকতা। এখানে করোনা ভয় তুচ্ছ। মহামারি মূল্যহীন।

বর্তমানে করোনা ভয় জয় করে, টিকে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন টেলিভিশন সাংবাদিকরা। অল্পবিস্তর অন্যান্য মাধ্যমের সংবাদকর্মীরাও যে মাঠে নেই তা নয়, শতভাগ ঝুঁকি নিয়ে কাজ তারাও করছেন। কিন্তু টেলিভিশন বা ভিজ্যুয়াল মিডিয়ার সাংবাদিকদের মতো ফুল ফোর্সে নয়। এতে টেলিভিশন সাংবাদিকরা বেশি বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন আর আইসোলেশনে যাচ্ছেন, সংস্পর্শে আসারা যাচ্ছেন কোয়ারেন্টিনে। কিন্তু তবুও থেমে থাকে না জার্নি।

সাংবাদিকতা না থাকলে করোনায় আরও মৃত্যু বেশি হতো, যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম মিরর ইউকে’তে কলামে এ কথা বলা হয় মহামারির শুরুর দিকে। সাংবাদিকতা ছাড়া গুজব লাগামহীন হয়ে পড়তে পারে- তাও বলা হয়। দেশের গুজবের পরিস্থিতিও আমরা জানি। তাই সোর্স-নির্ভর সত্য, সঠিক খবরে গুরুত্ব দিতে হবে। দর্শক-পাঠককে মজবুত করতে হবে বিশ্বাসের জায়গা। এতে কোভিডকালের সাংবাদিকতা হয়ে উঠবে আরও প্রাণবন্ত। ঝুঁকিবাজ গণমাধ্যমকর্মীদের কাজ হবে সার্থক।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।