গণমাধ্যমের মারাত্মক ‘শ্বাসকষ্ট’

ফরিদ কবির

পত্রিকাগুলো এখন ধুঁকছে। টিভি চ্যানেলগুলিও। এগুলো যে মারাত্মক শ্বাসকষ্টে ভুগছে তার কারণ একটাই, এগুলোতে ক্রিয়েটিভ লোকের অভাব। মেধাবী লোকের অভাব। এমন নয় যে দেশে মেধাবী লোকের অভাব আছে। তারা সেসব জায়গায় পাত্তাই পাননি।

আমি অতোটা মেধাবী নই, তবু দৈনিক জনপদ-আজকের কাগজ-ভোরের কাগজ-আমাদের সময়-এ কাজ করার সূত্রে আমার যেটুকু সুনাম তখন তৈরি হয়েছিলো, তাতে আমার ধারণা ছিলো, মিডিয়া আমাকে অন্তত ডাকবে। কারণ প্রায় প্রতিটি কাগজের এ-টু-জেড আমার জানা। আমি মোটামুটি বাংলা লিখতে পারি। ইংরেজিও খানিকটা। আজকের কাগজ ও ভোরের কাগজের সম্পাদকীয় বিভাগ দেখলেও নিউজ-রিপোর্টিং-ফিচার সর্বত্রই আমার কিছুটা আনাগোনা ছিলো। আমি যদিও সম্পাদকীয় বিভাগ দেখতাম। সেটা তখন ছিলো খুবই জনপ্রিয়। নাঈমুল ইসলাম খান নিশ্চয়ই তার সাক্ষী দেবেন। সেই পাতায় প্রায় প্রতিদিনই নানা তর্ক-বিতর্ক, নানান প্রতিক্রিয়া ছাপা হতো। এখনকার কোনো দৈনিকের সম্পাদকীয় বিভাগই আমি নিশ্চিত ততোটা ‘লাইভলি’ নয়। সেই জনপ্রিয়তাও আর পায়নি। তা সত্ত্বেও আজ অব্দি কেউ আমাকে মিডিয়ায় ডাকেনি! আমার সমবয়সী, আমার কিছু অনুজ মেধাবী সংবাদকর্মীও কখনো ডাক পাননি! আমি যেমন কোথাও তদ্বির করিনি, তেমনি তারাও। ফলে আমার মতো তারাও রয়ে গেছেন আড়ালেই।

সম্ভবত মিডিয়াই একমাত্র জায়গা যেখানে মেধাবীদের জায়গা নেই। মেধাবীদের সেখানে ডাকাও হয় না। ডেকে কাজ দেয়ার রেওয়াজ এখানে নেই। দুয়েকটি ব্যতিক্রম বাদে তদ্বিরবাজ গাধারাই সেসব স্থান দখল করে নিয়েছে। আমি এমন অনেক মেধাবীকে জানি, যাদের কন্ট্রিবিউট করার অনেক কিছু আছে, কিন্তু তারা যেচে মিডিয়ামালিকদের সামনে হাজির হয়নি বলে তারা রয়ে গেছেন আড়ালেই। গাধারা নিজেরা বড়বড় পদপদবি নেয়ার ধান্দা করেছে, মেধাবী সংবাদকর্মীরা রয়ে গেছেন বেকার, কিংবা তারা বেছে নিয়েছেন রুটি-রুজির অন্য পথ।

মিডিয়ায় না গিয়ে অবশ্য ভালোই হয়েছে। আমার মতো শক্ত মেরুদণ্ডঅলাকে সহ্য করতো না কেউ। ফলে মিডিয়ায় ফিরে যাওয়ার দু’-এক বছরের মাথায় এমনিতেই বিদায় নিতে হতো আমাকে। সাংবাদিকতা পেশায় থাকতে আমি আট-দশটা কাগজ পড়তাম। এ পেশা থেকে সরে আসার পরেও আমি প্রতিদিন চারটা কাগজ রাখতাম। যদিও পত্রিকাগুলোর মধ্যে ‘প্রথম আলো’ ও ‘ডেইলি স্টার’ ছাড়া আর কোনো কাগজ হাতেই নেয়া যায় না। সেগুলো এতোই অখাদ্য। এতোই দরিদ্র।

‘প্রথম আলো’ শুরুর দিকে চমক নিয়ে এলেও অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ফক্কিকার হয়ে গেছে! এ কাগজটিতে বেশ কিছু প্রতিভাবান সাংবাদিক যে নেই, তা নয়, কিন্তু দৈনিকটির করপোরেট সংস্কৃতি সেসব প্রতিভাবানদের প্রতিভা খেয়ে ফেলেছে। এখন তাদের নতুন কিছু দেয়ার ক্ষমতা আর অবশিষ্ট নেই। ‘ইয়েস স্যার’ সংস্কৃতি কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রকট হয়ে উঠলে সেটা বেশিদিন টিকতে পারে না। এ দৈনিকটির হয়েছে সে দশা। সাংবাদিকরা মেরুদণ্ডহীন হলে কতোটা নিচে নামতে পারেন, সেটা আমার চাইতে বেশি আর কে জানে! বাংলাদেশে তেমন মেরুদণ্ডঅলা সাংবাদিক গুনতে হলে কনিষ্ঠ আঙুলই যথেষ্ট। আর, পত্রিকাগুলোও এখন সত্যিকার অর্থেই আমলা-মন্ত্রীদের জনসংযোগ জার্নাল ছাড়া আর কিছু না। মানুষ এমন জিনিশ কেন পড়বেন?

আর টিভি চ্যানেলগুলোর বেশিরভাগই তো তদ্বিরবাজ ‘সংবাদিক’দের দখলে। কোনো চ্যানেলই কেবল এক-দুজন প্রতিভাবান দিয়ে চলতে পারে না। প্রতিভাবান ও সৃজনশীল সংবাদকর্মী ও প্রযোজকদের একটা টিম থাকতে হয়। কিন্তু সব টিভি চ্যানেলের দিকে তাকালে আমি দেখতে পাই, তেমন প্রতিভাবান আছেন সাকল্যে ১০-১২ জন। এরা সকলে একটা চ্যানেলের দায়িত্ব পেলে ঠিক হতো। কিন্তু তারা ছড়িয়ে আছেন ১২ টা চ্যানেলে। ফলে প্রতিটি চ্যানেলে একটা-দুটো প্রোগ্রাম হঠাৎ ভালো হলেও, বাকিগুলো একদমই সাবস্ট্যান্ডার্ড! সোজা কথায় অখাদ্য। মাসে এক বেলা ভালো খাবার দিয়ে সারা মাস পচা খাবার খাওয়ালে তা কে খাবে।

নিউজচ্যানেলগুলোর সবচাইতে খারাপ অনুষ্ঠানের একটি হলো ‘টকশো’। এটা এতোই টক যে এ অনুষ্ঠানটি এখন আমি দেখিই না। একটা চ্যানেলের টকশো আমি দেখতাম, সেটার সঞ্চালক সেখান থেকে বিদায় নেয়ার পর সেটা দেখা ছেড়ে দিয়েছি। এখন টকশোগুলো কেবল টকশোঅলারা ছাড়া আর কেউ দেখেন বলে মনে হয় না।
আসল কথা, যে চ্যানেল সাহেদকে ‘আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক’ যদু-মধুকে ‘রাজনৈতিক বিশ্লেষক’ খেতাব দিয়ে তাদের কথা আমাদের শোনাতে বাধ্য করে সেসব চ্যানেল লোকে দেখবে কেন? এর চাইতে সাপলুডু খেলে সময় কাটানো উত্তম। বিনোদন চ্যানেলগুলোর একটির বিনোদন তো খোদ এর মালিকই। এই বিনোদন এতোই নিচুমানের যে সেটা আমার বাসার গৃহপরিচারিকাও দেখে না। নাটক-সিনেমা কোনো কিছুই দেখার যোগ্য না। আমাদের তথাকথিত ভালো টিভি নাটকও পাকিস্তানের একটা খারাপস্য খারাপ টিভি নাটকের চাইতে খারাপ।

আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো তো এটাও জানে না, তার কোন অনুষ্ঠানের টার্গেট দর্শক কে বা কারা?
ফলে রিকশাঅলাদের নিয়ে বানানো অনুষ্ঠান রিকশাঅলারা দেখেন না। বুদ্ধিজীবীদের জন্য বানানো অনুষ্ঠানও বুদ্ধিজীবীরা দেখেন না। নারীদের জন্য বানানো অনুষ্ঠান বাচ্চারা হয়তো দেখে। যে অনুষ্ঠান বাচ্চারা দেখে সেটার জন্য তারা স্পন্সর কেন পাবে? যদিও সত্যি বলতে বাচ্চারা তো দেশি কোনো চ্যানেল দেখেই না। তাদের দেখার কিছু সেখানে নেইও। আমি সরকার প্রধান হলে সব পত্রিকা, সব চ্যানেল বন্ধ করে দিতাম।

পত্রিকা বা চ্যানেলের মালিকদের কাছে অবশ্য মেধার কোনো দাম নেই। তারা কোনোভাবে সেটা বহাল রাখতে পারলেই খুশি। কারণ পত্রিকা বা চ্যানেলের মালিক হওয়ার সূত্রে তারা যে রাজনৈতিক ও সামাজিক সুবিধা বা প্রিভিলেজ লাভ করে তার মূল্য হাজার কোটি টাকার কম না। আর, এসব মালিকদের প্রায় সকলেরই আছে কোটি কোটি কালো টাকা। তা দিয়ে মাসে দু-এক কোটি টাকা গচ্চা দিয়ে কোনো রকমে একটা কাগজ বা চ্যানেল তারা চালিয়ে যেতে পারেন। সেটা আমরা দেখতেও পাচ্ছি।

সম্প্রতি অনেক দৈনিক ও চ্যানেল থেকেই জনবল ছাঁটাই চলছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছাঁটাইয়ের তালিকায় দেখতে পাচ্ছি, মেধাবীরাই। মেধাবীদের বেতনভাতা যেহেতু একটু বেশি, ফলে খড়গটা নামছে তাদের ঘাড়েই। মেধাবীদের চেয়ারে বসছেন গাধা আর ছাগলরা। আগামীতে এসব কাগজের মান কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা অনুমান করতে কষ্ট হয় না। শুনতে পাচ্ছি, অনেক গণমাধ্যম তার সংবাদকর্মীদের বেতন দিচ্ছে না মাসের পর মাস ধরে।

লেখক: ফরিদ কবির, কবি