অনিশ্চয়তার এক অদ্ভুত অধ্যায়

সৈয়দা আখতার জাহান

সময়ের নাড়িতে এখন জ্বর। জ্বরের কারণ করোনা বা কোভিড নাইন্টিন। নিউনর্মাল কোভিড-১৯ এখন এক নতুন বাস্তবতা, যা ধাঁধা’র চেয়েও জটিল আর ক্ষুধার চেয়েও স্পষ্ট। নতুন এই সময়ে প্রায় প্রত্যেককেই নিজ চেষ্টায় নিজেকে টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে।অথচ গুটিকতক নীতিভ্রষ্ট, দুর্নীতিগ্রস্থ মধ্যপন্থীদের দুর্নীতি এবং সন্ত্রাস; নিন্দা-ভয়-বয়কট সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে।

করোনাকালের জুয়া চুরিতে কেউ কেউ বনে গেছেন শতকোটি টাকার মালিক। বাগিয়ে নিয়েছেন কাজের কন্ট্রাক্ট, ফিরিয়ে নিয়েছেন ভাগ্য। যারা চির নির্বোধ ছিল, তারাও হঠাৎ চতুর হয়ে উঠেছে এই সম্প্রতি। নিউনর্মাল পরিস্থিতিতে এদেশের স্বাস্থ্যখাত বুঝিয়ে দিয়েছে, সংখ্যাগত সুবিধাভোগীরা এক হলে সেবার গুনমান নষ্ট হয়। কোভিড-১৯ এর টেষ্ট ফলাফল এবং হসপিটালের ভুতুড়ে বিল ছিলো অনেকটাই ভদ্রভাবে চুরি-ডাকাতির সামিল। মেজর (অবঃ) সিনহা রাশেদের হত্যাকাণ্ড আমাদের জানিয়ে দিলো, ক্ষমতা; অপাত্রে অঢেল ক্ষমতা বিপজ্জানক, যে কোনো ব্যক্তির হাতেই।

দীর্ঘদিন ধরে যে ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা অতিব্যবহার চলছে হাতে বা শার্টে ময়লা না লাগিয়েই।তথাকথিত ক্ষমতাবানদের পোশাক যত ক্লিন, ইমেজ ততটা ক্লিন নয়। ফুঁটে উঠেছে আত্মিক দেউলিয়াপনার নির্মমচিত্র। অদৃশ্য দৈত্যরা যেন খেলা করছে আর কিছু নয়। খলনায়করা বুঝিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর, তারা যা বলবে তা-ই হবে আইন। এটা রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়, হয়তো সার্বিক ব্যর্থতা।

এদেশে কিা-না সম্ভব! যে সম্পর্কগুলো হওয়া উচিৎ ছিল নিছক সরকারী তা চলেগেছে ব্যকরনের বাইরে। যে কোনো অপরাধ মেনে নেয়াটা এদেশের মানুষের কাছে ভয়ের চেয়েও বেশি অভ্যাসের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।সরকারের উৎকট সমর্থক সাহেদ করিম সাহেবদের দেখলে ধারনা হয়, জীবন সংগ্রামের কঠোর তারপর ‘দূর্নীতি’ যেন প্রয়োজনীয় একটু নির্দোষ আনন্দ।ডা. সাবরিনাদের সৌজন্যতায় এদেশের সাধারণ মানুষ শুয়ে শুয়ে মরার মতো সক্ষম আছেন। প্রদীপ’দের সাজানো ক্রসফায়ার; লক্ষ্যের দিক থেকে অগ্রগতি; পদ্ধতির দিক থেকেও। নিষ্ঠুরতার জন্য কোন কিছুই প্রদীপরা করেন না; করেন কেবল প্রয়োজনের খাতিরেই।

এদেশে ক্ষমতাবানদের ছত্রছায়ায় থাকা দূর্নীতিবাজরা কোনো কোনো অদৃশ্য ও দুষ্টশক্তির প্রভাবে সকল নিয়ম/নীতি/ধারা/আইন ভুলে যেতে থাকেন। বস্তুত, তাঁদের চিন্তাশক্তিতে শিশুসুলভ নৈরাজ্য বা ইনফ্যানটাইল ডিজওর্ডার দেখা যায়। বর্তমানে ক্ষমতাবান বলতে তাদেরকেই বোঝা হয়- ১) যারা ধনী এবং সরকারী দলের সঙ্গে সম্পর্কিত; ২) যারা ধনী নয় কিন্তু জন্মসূত্রে এবং শিক্ষাদীক্ষায় সরকারীদলের সাথে সম্পর্কিত; ৩) সরকারীদলে গ্রহণযোগ্য হতে ইচ্ছুক ধনীব্যক্তি; এবং ৪) যাদের প্রথম ও দ্বিতী দুটিরই অভাব অথচ অর্থ এবং সরকারপ্রধানের আনুকূল্য উভয়ই নিজেদের সামর্থে বা কর্মদক্ষতায় পেতে চায়। কোভিড-১৯ এর সর্বোচ্চ সতর্কসময়ে এদেশে দূর্নীতি রোগটা এখন আরোগ্যের বাইরে। আবদার করে আদায় করার মতো বিষয়তো সততা নয়। যদিও আমরা স্কুলে শিখি Honesty is the best policy. ভুল শিখি। আসলে Honesty is the only policy. কেননা সততার জন্য good policy বা better policy বলে কিছু নেই।

এদেশে প্রায়শ গণমাধ্যম মারফত দূর্নীতির যে ইস্যুগুলো আলোচনায় উঠে আসে সেগুলো বড় বেশি স্বল্পস্থায়ী, অনিশ্চিত ও বিলীয়মান। পাহাড়ি এলাকায় ঝড় যেমন কয়েকদিন ধরে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায় ঠিক তেমন। অতঃপর ইস্যু পরম্পরায় সেগুলো চলে যায় দৃষ্টির আড়ালে। প্রত্যাশিত উন্নয়নের সাথে বাইপ্রোডাক্ট হিসেবেই এদেশে সম্ভবত দুঃখ, ক্ষোভ, হতাশার পাহাড় জমেছে।আসলে বেঁচে থাকার মতো জোরের সন্ধান পেতে হলে তাড়াতাড়ি ভুলতে পারার ক্ষমতা থাকা চাই। পেটের চিন্তার মত সহজ অথচ জটিল চিন্তা আর নাই। বর্তমান সময়ে সাধারণ মানুষকে দিনরাত সেই চিন্তাই করতে হচ্ছে। একে চিন্তাশীলতা বলে না, বলে চিন্তাগ্রস্ততা। মস্তিষ্কে অন্যকিছুই আর দাগ কাটছেনা; পেটই এখন প্রভু আমাদের।সোজা হয়ে আজ পর্যন্ত দারিদ্র নিজের সত্য পরিচয় দিতে শেখেনি। আর দারিদ্রের সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই আমাদেরকে নিজেকে গুটিয়ে রাখতে, ভুলে যেতে এবং প্রতিটি মুহুর্তে অস্তিত্ব রক্ষা ছাড়া বাকি সবকিছু বিস্মৃত হতে শিখিয়েছে। এদেশের জনগনের রয়েছে ফ্লুইড পার্সোনালিটি। তাই হয়তো দিনেদিনে নীতির প্রলেপটা হয়ে উঠেছে অস্বাভাবিক মাত্রায় পাতলা। সাধারণ জনগণ, রাজনীতিকরা যাদের নিয়ে খেলছেন তারা কালে ভদ্রে ঠিক প্রতিবাদ নয়, সরল আপত্তি জানায়। এক টুকরো রুটির জন্য মারামারি অন্য সবকিছুর থেকে বেশি দরকারি হয়ে পড়লে ঘৃনা আর স্মৃতিও যে মিলিয়ে যেতে পারে এই জ্ঞানটাও অর্জিত হয়েছে। সাহেদকরিম, ডা. সাবরিনা এবং ওসি প্রদীপ-এর দূর্নীতিও একসময় আমরা বিস্মৃত হবো।

মিথ্যার মধ্যে একধরনের সম্মোহনী ক্ষমতা আছে যা প্রায়শই সত্যের অস্তিত্ব গিলে ফেলে। বেঁচে থাকার একমাত্র যে সংকীর্ণ পথটুকু চেনা তা বড় বেশি বিবর্ণ, সুলভ আর সাধারণ। অভ্যাসের ছাঁচেবদ্ধ হয়ে গেছি আমরা, জীর্ন-মলিন হয়ে গেছি সংসারের ধূলোয়।সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার সোস্যালমিডিয়ায় চোখে পড়ে বাঙালির নীতিবোধ ও বীরত্ব। উঠে আসে এক নিরুত্তাপ, স্পষ্ট, বুদ্ধি বৃত্তিগত ঘৃণার বার্তা। বাস্তবে যেসব রাজনীতিবিদরা কথায় কথায় ‘কনফার্মেশন বায়াস’ করেন তারা ভালো করেই জানেন, প্রাকৃতজনের কথা আমলে নিয়ে কী লাভ! সর্বগ্রাসী বাস্তবতার অতলান্তে সব ডুবে গেছে। অহমিকার ক্ষুদ্রদ্বীপটুকু জেগে আছে শুধু। শ্লথগতির এই সময় উজানে বয়না ভাটায়, কিসের অনুকূলে যায়, কাদের প্রতিকূলে; বুঝে ওঠা কঠিন। সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি। এখনো একটা সুযোগ আছে। হতাশা ও আশার মধ্যে এই হলো আমাদের বিপুল পাওনা। দূর্নীতিপ্রতিরোধ ক্ষমতা মানুষকে নতুন মানুষ করে তোলে। দূর্নীতি সমূলে নির্মুল করতে এদেশে এখন সম্ভবত দাবানল দরকার।

লেখক: সৈয়দা আখতার জাহান
সহকারী অধ্যাপক, সাাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়নবিভাগ,
স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ।