আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ গণমাধ্যম জনবিচ্ছিন্ন হবে

সাজিদ রাজু

যে কোনো আতঙ্কই মানুষকে গুটিয়ে যাওয়ার পথকে সহজ করে। বাধাগ্রস্ত করে স্বাভাবিক বিচরণ। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাস মানুষের মাঝে বড় ধরণের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কাগজ বা পত্রিকার মাধ্যমে ছড়াতে পারে করোনা ভাইরাস- এমন ধারণা সৃষ্টি হয়েছে মানুষের মনে। এ কারণে বছরের শুরুর দিকে করোনার ব্যাপক বিস্তারের পর থেকেই মানুষ পত্রিকা নেয়া বন্ধ করতে থাকে। এর সঙ্গে যোগ হয় আর্থিক অনটন। অনেকেই করোনার প্রভাব চাকরি হারিয়েছেন, অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হয়েছে অনেকের। অনেকে আগের বিলাসবহুল বাসা ছেড়ে খরচ সমন্বয় করেছেন। এমন অবস্থায় খরচ কমানোর খাতে পড়েছে পত্রিকা ছেড়ে দেয়াও। বিপদে ৩শ’ টাকা খরচ কমাতে পারাও বিশাল সহযোগিতা হয়ে দাঁড়ায়।

এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে দিনের ব্যস্ততা শুরুর আগেই যারা গ্রাহকদের ঘরে ঘরে তাজা খবর পৌঁছে দেয়ার কাজ করতেন সেই হকারদের ওপর। তাদের অনেকে কাজ হারিয়েছেন, কেউ পেশা বদলেছেন। কর্মীদের বেতনের টাকা জোগাড় করতে না পারায় বিক্রি বন্ধ করেছেন অনেক পরিবেশক। আর বিপুল অংকের ক্ষতির শিকার হয়েছে গণমাধ্যমগুলো। বিশেষ করে পত্রিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে। পত্রিকা মালিকদের সংগঠন নোয়াব বলছে, কোভিড নাইন্টিন শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত দৈনিক পত্রিকার গ্রাহক কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ। প্রায় বন্ধ আয়ের একমাত্র মাধ্যম বিজ্ঞাপন। এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে বেশ কয়েকটি পত্রিকার মূদ্রণ সংস্করণ। টেলিভিশনগুলোর আয়ের একমাত্র পথ বিজ্ঞাপনেও এসেছে নানা পরিবর্তন। বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোর হিসেব বলছে, প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার বিজ্ঞাপন অর্থনীতির হয়েছে নানা রূপান্তর। কোভিড পরিস্থিতিতে প্রিন্ট মিডিয়া থেকে বিজ্ঞাপন স্থানান্তর হয়েছে ডিজিটাল মিডিয়ায়।

এই যে মিডিয়ার আয়ের উপর হাত পড়েছে, এতে গণমাধ্যম মালিকরাও শঙ্কিত। শঙ্কায় অনেকে খরচ কমাতে কর্মী ছাটাই করেছেন, করছেন। অনেকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। যারা এরই মধ্যে অনলাইন মাধ্যমে পত্রিকা প্রকাশ করছেন তারা পড়েছেন আরেক ইদুর দৌঁড়ে। মানুষ যেসব অনলাইন বেশি পড়ে তাদের রিডারশিপ বাড়ে, যেসব টিভি বেশি দেখে ভিউয়ারশিপের দিক থেকে তারা থাকে এগিয়ে। সাধারণত কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বিজ্ঞাপন দেয়ার আগে রিডারশিপ বা ভিউয়ারশিপের দিক থেকে এগিয়ে থাকা পত্রিকা, অনলাইন বা টেলিভিশনকেই বেছে নেয়। আর এ কারণেই জনপ্রিয় হওয়ার জন্য গণমাধ্যমগুলোর এই দৌঁড়।

এই দৌঁড়ে এখন গণমাধ্যমগুলোর কাছে একমাত্র প্রাধান্য ‘মানুষ কি বেশি খায়’। যে দেশে কিছু মানুষ সিফাতুল্লাহ ওরফে সেফু দা’র মতো লোকের গালিগালাজ ইউটিউব থেকে ইন্টারনেটের ডেটা খরচ করে কানে হেডফোন লাগিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শোনে, তাদের রুচি বা পছন্দ করার সক্ষমতার ব্যাপারে বেশি কিছু না বললেও চলে। আর এই পর্যায়ের মানুষরা অনেক বেশি সক্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। অর্থাৎ কিসে ভালো, কিসে মন্দ এই বিবেচনা বোধও যেখানে কম, সেখানে গণমাধ্যমগুলোও যদি এমন কিছু সক্রিয় পাঠক বা দর্শকদের উপর নির্ভর করে সংবাদ প্রচার করে,সেখানে শিক্ষণীয় আর কি থাকবে? তাই ‘মানুষ কি খায়’ এই বিবেচনায় নিম্ন রুচির কনটেন্ট বা সংবাদ ভয়াবহভাবে আরো নিচের দিকে ধাবিত হতে শুরু করেছে। গণমাধ্যম যে সাধারণের রুচিবোধ নির্মাণ করে দেয়ার কথা, পাঠক ও দর্শকের পছন্দ-অপছন্দ নির্ধারণে ভূমিকা রাখার কথা সেটা রাখতে পারছে না। গণমাধ্যমের যে শিক্ষকের ভূমিকা, ওয়াচডগের ভূমিকা পালন করার কথা তা করতে পারছে না। ফলে গণমাধ্যম মূলত বেশিরভাগ মানুষের কাছে যাওয়ার পরিবর্তে ধীরে ধীরে আস্থা হারাচ্ছে,সাধারণের কাছে যাওয়ার পরিবর্তে দূরে সরে যাচ্ছে।

পশ্চিমা বিশ্বে কাগজের মূদ্রণ সংস্করণ অনেকটাই সংকুচিত। সেখানে অনলাইন সংস্করণও মানুষ রেজিস্ট্রেশন করে, মাসিক ফি দিয়ে পড়ে। পত্রিকা তার পরেও যদি প্রাপ্ত বিজ্ঞাপন দিয়ে চলতে না পারে তবে মাঝে মাঝেই দেখি ডোনেশন এর জন্য আহবান জানায়। মানুষ ডোনেশন দেয়ও। আমাদের দেশে এমন অবস্থা হয়তো আসতে আরো কিছু দিন লাগবে। কিন্তু ততক্ষণে মানুষের আস্থা অর্জন করতে না পারলে ডোনেশন তো দেবেই না বরং টাকা দিয়ে অনলাইনেও পড়বে না। আর পাঠক হারালে মূলত পত্রিকা থাকা না থাকা সমান কথা।

অর্থ উপার্জনের জন্য গণমাধ্যম নির্ভরশীল আরেক পক্ষ কর্পোরেটের উপর। এই নির্ভরতা অনেক সময় গণমাধ্যমকে নিজের পরিচয় ভুলিয়ে দিচ্ছে। কর্পোরেট স্বার্থ দেখতে গিয়ে জনস্বার্থ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে মূলধারার মাধ্যমগুলোও। অনেক সময় ব্যবসায়ীক নানা দ্বন্দ্বে, স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বহীন খবরকে শিরোনামে জায়গা দিচ্ছে, আবার জনগুরুত্বপূর্ণ খবরের ঠাঁই হচ্ছে তলানীতে কিংবা জায়গাই পাচ্ছে না। এই স্বার্থের দ্বন্দ্ব, তা এক দিকে অসুস্থ মানসিকার বিকাশ ঘটাচ্ছে, অন্যদিকে আস্থাহীন হচ্ছে জনমানুষ থেকে।

সব কিছুরই একটা পরিণতি আছে। কর্পোরেট স্বার্থ প্রাধান্য দিলে কর্পোরেট পেয়ে বসে গণমাধ্যমকে। ফলে সাংবাদিকতা কাজ হারায়। কাজহীন অকর্মন্য গণমাধ্যম আর গণের থাকেনা। গণ না থাকলে শুধু মাধ্যম অব্যবহৃত রয়ে যায়। দিন শেষে ফলাফল,কর্পোরেট স্বার্থও আর পূরণ হয় না, ফলে সেই গণহীন মাধ্যমকে ত্যাগ করে কর্পোরেট। অর্থাৎ খেলা সাঙ্গ। তাই উভয়ের মেল বন্ধন খুব জরুরি। তবে গণস্বার্থকে প্রাধান্য দিলে মানুষই গণমাধ্যমের পাশে দাঁড়াবে। তাই মনে রাখা জরুরি, গণমাধ্যম মানুষকে ভুলে গেলে, মানুষও সময়ের ব্যবধানে ভিন্ন পথ বেছে নেবে।

আবারো শুরুর কথা, করোনা আতঙ্কে ফিরি। কানাডিয়ান লেখক রবিন এস শর্মা বলেছেন, ‘ভয় পাওয়া জীবিত থাকারই প্রমান। ভয়কে মেনে নিন, এর মধ্য দিয়েই এগিয়ে যান’। আতঙ্ক ও ভয় মানুষকে এক সময় সাহসী হতে শেখায়। গণমাধ্যমকেও নানা ভয়, শঙ্কা আর চ্যালেঞ্জের মধ্যদিয়ে এগিয়ে যেতে হয়েছে, সামনেও হবে। করোনায় উপার্জনের যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে তাও এক সময় কেটে যাবে। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে উদ্ভব হবে ভিন্ন পন্থার, ভিন্ন উপায়ের। এর সঠিক সময়ন্বয় করতে পারলেই শঙ্কা কাটিয়ে আলো আসবে গণমাধ্যমে।

লেখক: সাজিদ রাজু, গণমাধ্যমকর্মী