ছাঁটাই গাঁথা

কাজী আনিছ

প্রতিদিন কোনো না কোনো ফোন আসে, টেক্সট আসে। ওই প্রান্তে থাকে হাহাকার, চাপা কান্নার শব্দ, হতাশা, দীর্ঘশ্বাস। গত কয়েকটা দিন এমন অসংখ্য সংবাদকর্মীর দুর্বিষহ মুহূর্তের গল্পগুলো শুনছি। কেউ ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন। কেউ আতঙ্কে আছেন। করোনাকে ছাপিয়ে তাঁদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম ‘ছাঁটাই’। অথচ এই করোনাকালে অন্যান্য ফ্রন্টলাইনারের মতো বরং তার চেয়ে বেশি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সংবাদকর্মীরা তথ্য পরিবেশন করে গেছেন, যাচ্ছেন। পরিবার-পরিজন ছেড়ে আলাদা থেকেছেন, থাকছেন।

এমনও আছেন, যারা হয়তো গত কয়েকটি মাস তাঁর বাচ্চাটিকে কোলে নিতে পারেননি। সংবাদকর্মীদের অনেকে আক্রান্ত হয়েছেন, কেউ মারা গেছেন, বাকি সবাই আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় আছেন। তবে, এসব আশঙ্কা এখন তাদের কাছে তুচ্ছ। বড় আতঙ্ক, ছাঁটাই হবেন না তো! ইতিমধ্যে আতঙ্ক সত্যি হয়ে গেছে কারো কারো জীবনে। ‘ইস্তফা না দিলে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হবে’-এর মতো অমানবিক, অনৈতিক ও অপেশাদারী ‘নীতিতে’ পিষ্ট হয়েছেন, হচ্ছেন অনেকেই। চাকরি হারিয়ে চরম বিপদে পড়া মানুষগুলোর হাহাকারের গল্প শুনছি প্রতিদিন।

আরও লেখা


> গণমাধ্যমে অপেশাদারিত্ব বনাম সংবাদকর্মীর নিরাপত্তা

‘…খুব বিপদে আছি। এই সময়ে চাকরি যে পাবো, তার উপায় নেই…।’ ‘…বউ বাচ্চা নিয়ে এই শহরে যুদ্ধ করি…’ এমন অসংখ্য কষ্টের শব্দমালা পাচ্ছি প্রতিদিন। শব্দমালার প্রতি অক্ষরে আছে অনিশ্চিত জীবনের নিশ্চিত সঙ্কেত। জবাব দিতে পারি না। দেওয়ার ক্ষমতা নেই। শুধু শুনে যাই আর ভাবি, সারাজীবন তথ্য পরিবেশন করা এই মানুষগুলোর নিজের জীবনের এই বেদনাময় তথ্যের মূল্য দেওয়ার কি কেউ আছে? কেউ কি আছে, একসঙ্গে সমস্বরে বলে উঠবে, ‘এ অন্যায়, এ অমানবিক’।

সাংবাদিকতা করেছি। এখন সাংবাদিকতা পড়াই। পেশা আর জ্ঞানে এই পেশাটি আমার মতো অনেকের রক্তে মিশে আছে। গণমাধ্যমের ভালো কিছুতে আনন্দিত হই, খারাপ কিছুতে কষ্ট পাই। আমি প্রতিদিন সংবাদ দেখেছি, পড়েছি। সচেতনে আর অবচেতনে প্রার্থনা করেছি, পুলিশ, চিকিৎসক আর সংবাদকর্মীদের জন্য। ক্রান্তিলগ্নে এই মানুষগুলোই ছিল, আছে জাতির পাশে, প্রতিনিয়ত। প্রার্থনা করেছে পুরো জাতি, যাতে করোনা থেকে রক্ষা পেয়ে নিরাপদেই দায়িত্ব পালনকরে যেতে পারেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাওয়া মানুষগুলো।

কিন্তু, সংবাদকর্মীদের জীবনে করোনার চেয়েও ভয়ংকর হয়ে আসলো ছাঁটাই প্রক্রিয়া। স্বাস্থ্যঝুঁকির ভয় কাটতে না কাটতেই আসলো চরম অনিশ্চয়তার ঝুঁকি। আমরাও আতঙ্কিত হলাম। এই দুঃসময়ে চাকরি হারানো মহাবিপদ। কোথায় যাবেন এই সংবাদকর্মীরা, কী হবে তাঁদের পরিবার পরিজনের! এইসব চিন্তা করে প্রায় এক মাস আগে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কয়েকজন সংবাদকর্মী বিবৃতির মাধ্যমে গণমাধ্যম মালিক/সম্পাদকদের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছিলাম। বিবৃতিতে সাক্ষর ছিল সেই সকল শ্রদ্ধেয় শিক্ষকেরও, যাদের শিক্ষার্থীরা আজ বিভিন্ন গণমাধ্যমের উচ্চপদে, নেতৃত্বে। বিবৃতির মাধ্যমে আমরা গণমাধ্যমকর্মীদের ছাঁটাই না করে বিকল্পপন্থা বা কৌশল অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছিলাম। আমরা সবপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের পথ খোঁজার কথা বলেছিলাম। সংবাদকর্মী, সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকতার বৃহৎ স্বার্থে আর কল্যাণে আমরা এই আবেদনটুকু রেখেছিলাম। পাঠক ও দর্শক হিসেবেও এই আবেদন ছিল আমাদের অধিকার।

কিন্তু, অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আমাদের আবেদনের এতটুকুন গ্রাহ্য না করে এবং কোনো অনুরোধ-আবেদনের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধা প্রদর্শন না করে সংবাদকর্মী ছাঁটাই শুরু করা হয়েছে। আমি মনে করি, এই ছাঁটাই প্রক্রিয়া শুধু সংবাদকর্মীর স্বাভাবিক জীবনের উপরই নয়, বরং পেশাগত ও অ্যাকাডেমিক সাংবাদিকতার দীর্ঘদিনের সম্পর্কের উপরও তীব্র আঘাত। একই সঙ্গে তা পাঠক-দর্শকদের আকুতি আর আবেদনের প্রতি অসম্মান।

আমরা বলিনি, আমাদের আবেদন-অনুরোধ রাখতেই হবে। আমরা আলোচনার কথা বলেছিলাম। আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ অন্বেষণের আবেদন রেখেছিলাম। সংকট সমাধানে আলোচনাই একমাত্র পথ- এটাই তো গণমাধ্যমের শিক্ষা। আমরা তা-ই অনুসরণ করেছিলাম। আশা করেছিলাম, অন্তত আলোচনার মধ্য দিয়ে দেশের সংবাদকর্মী ও সাংবাদিকতার সার্বিক কল্যাণে আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করবো। কিন্তু, অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, তা করা হয়নি। অবাক হয়েছি এই ভেবে, যে গণমাধ্যম মানুষের কথা বলে, সেই গণমাধ্যম মানুষের কথা শুনছে না! পাঠকদের কথা এতটুকুন আমলে নিচ্ছে না! এ কেমন অমানবিক গণমাধ্যম! আমি তীব্রভাবে মর্মাহত ও অসহায় বোধ করছি।

না, ঠিক আর আবেদন করতে এই লেখা লিখছি না। বরং লিখছি ‘ছাঁটাই গাঁথা’, প্রতিদিন ফোন আসে, টেক্সট আসে। শুনি, পড়ি, লিখে রাখি। এই ‘ছাঁটাই গাঁথা’র গল্পগুলো দিয়ে যেতে চাই ইতিহাসকে। আমার শক্তি নেই বইবার। বরং ইতিহাসই বহন করুক, চরম দুঃসময়ের মুখোমুখি সংবাদকর্মীদের দীর্ঘশ্বাসের ভার।

 

লেখক: কাজী আনিছ, শিক্ষক

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতাবিভাগ

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।