গল্প ও সাংবাদিকতার তফাৎ কি?

নাদিম মাহমুদ

গত কয়েক বছর ধরে সাংবাদিকতার একটি বড় ট্রান্সফরমেশন শুরু হয়েছে। বলা হচ্ছে, বর্তমান সময়ের সাংবাদিকতার তথ্যের একটি বড় অংশ আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পেয়ে যাচ্ছি। বিশ্বের বড় বড় নেতা ও সরকারের নীতি নির্ধারকরা নিজেদের বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে তুলে ধরছে। সেই তথ্য মূল ধারা সংবাদ মাধ্যমগুলো অনায়াসে ব্যবহার করছে। আমাদের দেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। সংবাদ মাধ্যমগুলো ফেইসবুকে কড়া নজর রাখেন। যেকোন সংবাদের ক্লু পেলেই আমরা সেই তথ্য আরো বেশি ডিগিং করে মাঠ থেকে একটি সংবাদ তুলে আনার চেষ্টা করি। আমি বিষয়টিকে নেতিবাচক হিসেবে কখনোই দেখি না। বরং এইসব তথ্য যাচাইয়ের শক্তি গণমাধ্যমগুলো থাকা উচিত। আপনার যদি কোন সংবাদ ফেইসবুকে পাওয়ায় যাই, তাহলে মানুষ কেন আপনার পত্রিকা কিনবে, কেন আপনার অনলাইনে ক্লিক করবে?

হ্যাঁ সংবাদ মাধ্যম আর ফেইসবুকের মধ্যে এটি বড় তফাৎ। ফেইসবুকে হোক্স থাকবে, জোকস থাকবে, তবে সংবাদ মাধ্যমে থাকবে রিয়ালিবিটি। ট্রাস্টের জায়গায় এখন পর্যন্ত আমরা সংবাদ মাধ্যমগুলোকে বিবেচনা করি।

অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একজন সাংবাদিকের দেয়া পোস্ট আর একজন সাধারণ মানুষের পোস্টের মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। সাধারণদের পোস্টগুলো নির্ভরযোগ্য না হতে পারে, তবে সাংবাদিকদের পোস্টগুলো দায়িত্বশীলদের মত হওয়া উচিত। কারণ, অনেক মানুষ সাংবাদিকদের পোস্টগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করে। বেশি তথ্য নির্ভরশীল মনে করে। আর সেই করাটা মূলত আসে পত্রিকায় সংবাদ পরিবেশনের মধ্যে দিয়ে।

সম্প্রতি দেশে আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ড। গণমাধ্যমের মত সারা দেশের মানুষ চেয়ে আছে এই খবরটির সর্বশেষ জানার জন্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো মুখিয়ে রয়েছে, সিনহা কেন্দ্রিক পোস্ট পড়ার জন্য।
এমন একটি ঘটনা ৯ জুলাই থেকে ফেইসবুকে ভেসে বেড়াচ্ছিল। মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডে একটি গল্প আমাদের অনেক পরিচতজন শেয়ার করছে। গল্পের শেষে লেখা একটি পত্রিকার সাংবাদিকের নাম। সেই পোস্টটি আমাকে শেয়ার দিয়ে, একজন জানতে চেয়েছিল, ঘটনা সত্য কি না? আমি তাৎক্ষণিক কোন উত্তর দেয়নি। শুধু এইটুকু বলেছি, যে যদি পত্রিকায় এইসব খবর আসে, তাহলে কিছুটা দায়িত্বশীলতার মধ্যে পড়ে।

এরপর আমি এই বিষয়টি নিয়ে আর কিছু আগ্রহ দেখাইনি। কারণ, ওই পোস্টে যে গাল-গল্প তুলে ধরার চেষ্টা করেছে, সেটিকে নিদেনপক্ষ সাংবাদিকতা বলা যায় না। ওসিকাণ্ড থেকে শুরু করে সিনেমা পাড়ার এক খল নায়কের আবির্ভাব আমাকে বিশ্বাস করাতে না পারলেও অন্তত কয়েক হাজার মানুষেকে ওই সাংবাদিকের পোস্টটি বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারছে বলে মনে হয়। তবে এক পাক্ষিক ‘জানা যায়, সূত্র জানায়, এমন উদ্ভট তথ্যমালায় সংবাদ পরিবেশনে বিশ্বাসযোগ্যতা হারায় বলে আমি এই বিষয়টিকে তেমন কর্ণপাত করিনি।

কারণ, আমি জানি, ইস্যূভিক্তিক সাংবাদিকতায় অনেক ভুল ও বিভ্রান্তকর তথ্য আমাদের দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশিত হচ্ছে। সেখানে আমাদের সংবাদবোধ্যরা সব সময় নিরব থেকেছে। যাই হোক, ওই পোস্টের সূত্র ধরে রাতে সময় টেলিভিশনের প্রতিবেদক ওমর ফারুক ভাই ওই পোস্টে উঠে আসা অভিযুক্ত খল নায়কের সাক্ষাতকার দেখলাম। ফেইসবুকের পোস্টে যেসব অভিযোগ এসেছে, তা ফারুক ভাই খুঁটিখুঁটিয়ে জানার চেষ্টা করছে, যে তিনি কোনভাবে এই ঘটনায় জড়িত কি না? আর সাংবাদিক হিসেবে সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাইয়ে এটিকে এগিয়ে নেয়া যায়। কেউ কোন তথ্য দিলে যে সেটিকে আমরা যেমন সংবাদ বলতে পারি না, তেমনি, যাচাইয়ের মাধ্যমে সেই তথ্য থেকে সংবাদ বের করতে পারি। আমার মনে হয়, ওমর ফারুক ভাই, ঠিক সেই কাজটি করেছেন, যা সাংবাদিকতার ব্যাকরণের অন্যতম অংশ।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো যে, গতকাল থেকে যে পোস্টটিকে সংবাদ হিসেবে মানুষ জেনেছে, সেই পোস্টটিকে ওই সাংবাদিকের পত্রিকা আজ ১০ জুলাই প্রকাশ করেছে। ফেইসবুকের পোস্টটিতে যেসব তথ্য ঘাটতি ছিল, সেই তথ্য ঘাটতি নিয়ে এবার সংবাদ করা হলো। আমি সত্যি অবাক হয়েছি, ফেইসবুকের পোস্ট কিভাবে মূল ধারার পত্রিকায় সরাসরি ছাপে? তাতে আমার কোন সমস্যা নেই, যদি সেটিকে সাংবাদিকতার নীতির মধ্যে রাখা যেত।

ওই গল্পময় পোস্টটিতে অভিযুক্ত কারও বক্তব্য নেয়া হয়নি, ঠিক তেমনি প্রকাশিত সংবাদটিতে নেয়। ঠিক, আমার বুঝে আসে না, চব্বিশ ঘণ্টা আগে এক প্রতিবেদক ফেইসবুকের পোস্টে একটি গল্পকে হালাল করার চেষ্টা করলো, সেই খবরটিকে কোন রকম যাচাই বাছাই ছাড়ায় ছেপে দেয়াকে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা বলা চলে না। বরং, এই ধরনের খবর ব্যক্তিকেন্দ্রিক ফায়েদা উঠানোর সম্ভবনা তৈরি হয়। বিচারাধীন কিংবা তদন্তাধীন বিষয়ে সুক্ষ্ম প্রভাব ফেলার সম্ভবনা থাকে। যে পোস্টের সূত্র ধরে, অন্যন্য সংবাদ মাধ্যম অভিযুক্তদের বক্তব্য নিয়ে আত্মকপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিলো, সেই খবরটি চব্বিশ ঘণ্টার বেশি সময় পর ওই সাংবাদিকদের সংবাদ মাধ্যমে উঠলো, কোন প্রকার যাচাই ছাড়ায়? এটি ভাবলে মাথা ধরে আসছে।

আমি জানি না, খবরটির সত্যতা কতটুকু। তবে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক আক্রোশ কিংবা সুবিধা লাভের কোন সম্ভবনা যে খবরে সুপ্ত থাকে, তাকে খুঁজে বের করা হাউজগুলোর দায়িত্ব। ফেইসবুকের পোস্টের শেয়ারিং দেখে, গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়তো পাঠকদের টানাকে আমি অন্তত সাংবাদিকতার মধ্যে ফেলতে পারি না।

আমাদের আরো বেশি সাবধান হতে হবে। বিশেষ করে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য যাচাইয়ে। একটুখানি খাম খেয়ালিপনা, একটি পরিবারকে হয়তো বিপদে ফেলতে পারে, তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করতে পারে। তাই, তথ্য পরিবেশনে আমাদের যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। আর সেটি করতে ব্যর্থ হলে, মূল ধারার সাংবাদিকতা হতে আমরা হয়তো যোজন যোজন দূরত্বে থাকবো।

লেখক: নাদিম মাহমুদ, ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান