গণমাধ্যমে উপকূল বিটের যৌক্তিকতা

জুনাইদ আল হাবিব

খবর। তিনটে অক্ষরের একটি শব্দ। খবরের খোঁজে গণমাধ্যমে খবরওয়ালাদের ভূমিকা নিয়ে নিঃসন্দেহে কোন সন্দেহ নেই৷ রাত-বিরেত, ২৪ঘন্টার ২৪ঘন্টা। খবরের পেছনে লড়ে যান তারা। জীবনের ঝুুঁকি, চাকরি হারানোর ঝুঁকি, রাঘব বোয়ালদের চোখ উপেক্ষা করে সত্য উদঘাটন করতে হয় তাদের। আমি বলব না, আজকাল সাংবাদিকতায় আমরা সব সত্যকে উদ্ধার করে পেরেছি। কিন্তু এটা সত্য যে, সত্য উদঘাটনে এখনো যে লড়ে যান অনেকে। হামলার শিকার হন, মামলার শিকার হন, প্রাণও হারান। তবুও যারা সৎ সাহস নিয়ে এ পেশায় লড়েন, তারা অদম্য সব সময়।

এ গণমাধ্যমকর্মীরা গণমাধ্যমের বিভিন্ন বিটে কাজ করেন। যেমন, জাতীয়, আন্তর্জাতিক, সারাদেশ, মফস্বল, উত্তরাঞ্চল, ফিচার, প্রযুক্তি, ভ্রমণ, স্বাস্থ্য, বিনোদন, লাইফস্টাইল, ব্যবসা, খেলাধুলা, প্রবাস, সাহিত্য, রাজনীতি, অর্থনীতি, কলাম ইত্যাদি বিটে। আমি এসব বিটগুলোর কোনটাকে অপ্রয়োজনীয় বিট বলি না। কিন্তু, এ বিটগুলোর সঙ্গে যদি উপকূল নামে একটি বিট যুক্ত হয়, তাতে মন্দ কী?

আমি এখনো পর্যন্ত কোন গণমাধ্যমের কর্পোরেট হাউজে কাজ করিনি। কিন্তু, গণমাধ্যমে যেহেতু যুক্ত, সে সুবাদে গণমাধ্যমের অনেক কিছুই নখদর্পনে। গণমাধ্যমে উপকূল বিটটি কেন গুরুত্বপূর্ণ, আমি সেটা নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করবো।

দেশের মফস্বলের জেলাগুলোতে হাজার হাজার সাংবাদিক বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশনে কাজ করেন। সে দিক বিবেচনায় প্রতিটি গণমাধ্যমে আমরা মফস্বল ডেস্ক বা মফস্বল বিট দেখতে পাই। যেখানে মফস্বল বিভাগে সম্পদনা পর্ষদ থাকে। মফস্বল বিটটি থাকার কারণে, মফস্বলের ছোটখাটো খবরগুলো মোটামুটি স্থান পায়। ঠিক অনেক গণমাধ্যমে আমরা উত্তরাঞ্চল বিভাগ খেয়াল করি। যার মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের খবরগুলো নিয়ে বিশেষ চোখ রাখে গণমাধ্যমের কর্তাব্যক্তিরা। এর বিপরীতে আমরা গণমাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চল বিভাগ দেখতে পাই না। মফস্বল বা সারাদেশের মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের খবরগুলোকে স্থান দেয়া হয়। দক্ষিণাঞ্চলের পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ছাড়া সবগুলো জেলাই উপকূল অঞ্চলে।

সমুদ্রতীরবর্তী ৭১০কিলোমিটার তটরেখার ১৯টি জেলা উপকূলীয় জেলা। ৩টি জেলা পরোক্ষ উপকূল, বাকি ১৬টি প্রত্যক্ষ উপকূল। মানে সেখানে ঝড়-ঝঞ্ঝা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, জোয়ার-ভাটার বিস্তৃতি বিশেষভাবে লক্ষ করার মতো। ঘূর্ণিঝড়ের বাতাস, জোয়ার-ভাটার বিস্তৃতি এবং লবণাক্ততার প্রভাব। সাধারণত আমরা এ তিনটে নির্দেশক চিহ্নের ওপর ভিত্তি করে উপকূল অঞ্চলকে চিনি।

উপকূলের মানুষের জীবন স্বাভাবিক সময়েও যে কতটা অস্বাভাবিক থাকে, তা অনেকটা প্রকাশের আড়ালেই থেকে যায়। যেমন, ঘূর্ণিঝড় এলেই কিন্তু গণমাধ্যমের ক্যামেরাটা উপকূলের দিকে চোখ ফেরায়। কিন্তু, ঘূর্ণিঝড়ের বাইরেও যে উপকূলের মানুষ বিক্ষুব্ধ ঝড়-ঝঞ্ঝা, জলোচ্ছ্বাস, জোয়ার-ভাটা, লবণাক্ততার প্রভাবে অস্বাভাবিক জীবন পার করে, সেটা প্রকাশের অন্তরালেই পড়ে থাকে। উপকূলে নদীভাঙন স্বাভাবিক সময়েও এক অস্বাভাবিক চিত্র। পুরো উপকূল অঞ্চলজুড়ে নদীভাঙনের এক তান্ডবলীলা আমরা সারাবছরই দেখতে পাই। দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও যে নদীভাঙছে না, তা কিন্তু নয়। নদীভাঙছে, সে সব এলাকায় নদীভাঙে বর্ষা এলে। কিন্তু উপকূলে বছরটাজুড়েই নদীভাঙনে ঠিকানা বদল করেন লক্ষ লক্ষ মানুষ।

মজবুত বেড়িবাঁধ নেই, নদীর স্বাভাবিক জোয়ারেও তলিয়ে যায় তীরের বিস্তীর্ণ জনপদ। কৃষকের ফসল উৎপাদন হয় না। মানুষজন পানিবন্দি হয়ে পড়েন বিপাকে৷ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এলোমেলো হয়ে যায়। এই যে স্বাভাবিক সময়েও যে উপকূলের মানুষের অস্বাভাবিক জীবনচিত্র, সেগুলো গণমাধ্যমে কতটা ফোকাস হচ্ছে? উপকূলের গণমাধ্যমকর্মীরা চাইলেও অনেক সময় গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষ যেন উপকূল নিয়ে উদাসীনতা দেখান। গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষকে দেখা উচিত যে, উপকূলের অঞ্চলে বসাবসরত মানুষরাও যে এই দেশের নাগরিক। কম নয়, ৫কোটি লোকের বসবাস উপকূল অঞ্চলে। তাহলে দেশের একটা বিরাট জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে, পেছনে পেলে কীভাবে দেশের উন্নয়ন চিন্তা করবেন আপনি?

আরেকটা বড় সমস্যা হচ্ছে, মাথায় যখন উপকূল শব্দটা ঢুকে, তখন অনেকেই উপকূল মানে কেবলই সমস্যা দেখেন। কিন্তু এ উপকূল অঞ্চলকে ঘিরে আমাদের দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরছে, সেটা ক’জনেই বা ভাবছি আমরা।

ব্লু-ইকোনমি শব্দটার সঙ্গে আমরা কম-বেশি সবাই পরিচিত। এ ব্লু-ইকোনমির বিকাশ কেবল উপকূল অঞ্চলেই সম্ভব। সমুদ্র বা নদীনির্ভর যে অর্থনীতির কথা বলা হচ্ছে, তার মধ্যে সমুদ্র বন্দর, ইলিশ সম্পদ, পর্যটন, লবণ চাষ, চিংড়ি ঘের আমরা উপকূলের বিরাট একটা সম্ভাবনা হিসেবেও দেখতে পারি। পাশাপাশি উপকূলে সারা বছর ধরে ধান চাষ। সয়াবিন, মরিচ, বাদাম, হেলন, মুগসহ অন্যান্য জাতের ডালও উৎপাদন হয় উপকূলে। নদীতীরবর্তী এলাকায় সবজি চাষের বিরাট একটা সম্ভাবনাও আমরা দেখি।

সবচে খুশির খবর হচ্ছে, মাছ উৎপাদন বাড়ার হারে বিশ্বে বাংলাদেশ বর্তমানে দ্বিতীয় অবস্থানে। করোনাকালে এমন সুখবর দিল জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও)। গত ৮জুন তাদের এক বৈশ্বিক প্রতিবেদন দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার–২০২০ এ এমনটা জানানো হয়েছে। তাহলে এ মাছের বিরাট অংশটা আসলো কোত্থেকে? এখানে কি উপকূলের ইলিশ সম্পদকে অস্বীকার করতে পারবেন কেউ? মোটও না।

যদি পর্যটনের কথা বলি। তবে, বিশ্বের সর্ববৃহৎ সমুদ্র সৈকত বাংলাদেশের উপকূলে। তারপরে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত, পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত ছাড়াও উপকূল অঞ্চলে ছোট-বড় অনেক পর্যটন স্পটের কথা আমরা জানি।

সব মিলিয়ে কথা হচ্ছে, আমাদের উপকূলে কেবলই সমস্যা নয়, উপকূল অঞ্চলকে ঘিরে উঁকি দিচ্ছে বিরাট সম্ভাবনা। দেশের একটা বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জীবনমান স্বাভাবিকের চিন্তা করতে এবং দেশের অর্থনীতির গতিকে আরো তরান্বিত করতে, উপকূল অঞ্চলকে ঘিরে সাংবাদিকতার জায়গাটাও কম নয়। সে জন্য, মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের প্রতি আহবান রাখবো, গণমাধ্যমকে গণমানুষের মাধ্যমের জায়গাটা ধরে রাখতে গণমাধ্যমে উপকূলকে গুরুত্ব দিন এবং উপকূল বিট চালু করুন।

লেখক: জুনাইদ আল হাবিব, গণমাধ্যমকর্মী।