সাংবাদিকতার গ্রামার বনাম ‘গ্ল্যামার’

তপন মাহমুদ

জেকোজি হেলথ কেয়ারের দূর্নীতির ‘ছোট্ট’ খবরটি ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠলো, তবে ভিন্নভাবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও  পেল ‘বিশেষ ট্রিটমেন্ট’। সরব হয়ে উঠলো ফেসবুকের দেয়াল, পত্রিকা আর অনলাইনের পাতা আর টেলিভিশন স্ক্রিণ। কারণ সবাই ‘গ্লামার’ খুঁজে পেলেন।

কিন্তু জেকোজি হেলথ কেয়ারের দূর্নীতি কোন মাত্রাতেই কম ছিলনা। পুলিশের ভাষ্যে,অনুমতি পাবার পর, ১৫ হাজার ৪৬০টি ভূয়া করোন া পরীক্ষা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। মানুষের জীবন-মরণ বিবেচনায়এতো ভয়াবহ অপরাধ। কিন্তু এই অপরাধে প্রথম গ্রেফতার প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মচারী ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. আরিফ চৌধুরী খুব একটা পাত্তা পেলেন কি মিডিয়ায় বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে? নাই পেতে পারেন। কারণএরকম অহরহ কত কিছুই তো ঘটে চলছে। এড়িয়ে যাওয়া কিংবা ‘ যা হবার তাই হোক’কওে পাশ কাটিয়ে যাওয়া সাধারণ মানুষের কাছে দোষের কিছুও নয়।

আরও পড়ুন


> নৈতিকতার কাঠগড়ায় সংবাদমাধ্যম

> নীতিভ্রষ্ট ‘সাংবাদিকদের হাতে’ সাহেদরা শক্তিশালী

কিন্তু এই সাধারণরা অসাধারণ ভূমিকা নিতে শুরু করলো পরবর্তীতে, যখন স্পটলাইট ডা. সাবরিনার দিকে পড়লো! অনেক মিডিয়াও যেন প্রাণ ফিরে পেল। পত্রিকার মূলপাতা গুলো হয়ে উঠলো ‘পেজ-৩’। আর বিনোদন সংবাদেও স্ক্রিণ টেলিভিশন। রিজেন্ট মালিক সাহেদের বেলায়ও বিশেষ গুরুত্ব জুটলো। কারণ তারও কিছ ুগ্লামার ফ্যাক্টও ছিল।

‘কে এই আরিফ চৌধুরী?’এমন শিরোনামে খবর চোখে না পড়লেও খুঁজে পাওয়া গেল ‘কে এই সাবরিনা’ শিরোনামের অনেক‘মুখরোচক গল্প’। তাতে দূর্নীতি ছাপিয়ে উঠে এসেছে তার পোশাক, রুচিবোধ, দাম্পত্য জীবনের খুঁটিনাটি আর কখনও যৌন সুড়সুড়ি। গ্রেফতারের প্রথম রাতে ডা. আরিফ চৌধুরী কেমন ছিলেন তা পাঠক-দর্শকের জানার আগ্রহ ছিল কিনা, বুঝতে পারছিনা। কিন্তু অনেক গণমাধ্যম বুঝে ফেলল, যে সাবরিনা আটকের পর কেমন আছেন, কি করছেন পুলিশ হেফাজতে তা জানার প্রবল আগ্রহ জেগেছে জন-মানসে! বিভিন্ন পত্রিকার শিরোনাম গুলো দেখুন- ‘জেলে প্রথম রাত যেমন কাটালেন সাবরিনা?’, ‘প্রথম রাত কোথায় কাটিয়েছেন সাবরিনা?’, সারারাত জেগে কাদের সঙ্গে কথা বলেছেন সাবরিনা?’, ‘আগেও বিয়ে হয়েছিল সাবরিনার, ২ সন্তানও আছে’।

কি সংবাদ মূল্য আছে উপরের শিরোনাম আর খবরে? কতজনের গ্রেফতারের পর এমন সংবাদ চোখে পড়েছে আমাদের? আমি তো মনে করতে পারছিনা। তার মানেকি দাঁড়ালো? অপ্রয়োজনীয় চাহিদা বা‘ফলসনিডকে’ মানুষের প্রকৃত চাহিদা বলে বাজারজাত করা হচ্ছে। এর ভোক্তা আছে সত্যি! কিন্তু গণমাধ্যমের হিসেব করে দেখা দরকার তারা এমন ভোক্তাকে অপ্রযোজনীয় এবং আদতে সামাজিক মূল্যবোধ বিবেচনায় ও মানবাধিকার প্রশ্নে ক্ষতিকর পন্য সরবরাহ করবে কিনা। কারণ গণমাধ্যমের সামাজিক ও নৈতিক অনেক দায়িত্¦ আছে।

বলা যায়, ডা. সাবরিনার ছবি বা বিবরণ প্রকাশের ক্ষেত্রে গণমাধ্যম বাজার মূল্যকেই বেশি গুরত্ব দিচ্ছে, সংবাদমূল্যের চেয়ে।এক্ষেত্রেঅপরাধীরঅপরাধের চেয়েতার‘গ্লামার’ইমেজই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। আর এই গ্লামার কতটা বাস্তব আর কতটা আরোপিত সেটাও আলোচনার দাবি রাখে। তবে, নারীকে অবজেক্ট বা দৃশ্যবস্তু হিসেবে উপস্থাপনার যে প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক কৌশলতাকেই অনুসরণ করছে গণমাধ্যম।

সাবরিনা কিংবা সাহেদ ইস্যুতে টেলিভিশনও গ্লামার ও বাজারমূল্যকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। তারাও তাদের প্রতিবেদনে অপ্রাসঙ্গিক ও অপ্রয়োজনীয় হারে এমন সব ছবি ব্যবহার করছেন, যার সাথে ছবি ব্যবহাররে যে ক্লাসিক ধারণা বা নিয়মতার কোন মিল ছিলনা। ডা. সাবরিনার ক্ষেত্রে তার‘মডেল ইমেজ’ বেশি আলোক সম্পাত করা হয়েছে।

টেলিভিশন সংবাদেও প্যাকেজ প্রতিবেদনে কারো ছবির (স্থিরচিত্র) ব্যবহার সবশেষ অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু সেটাই ‘মানিশটের’অনৈতিক প্রয়োগের ফলে প্রধান হয়ে উঠেছে। মনে হয়েছে গনমাধ্যমও যেনো সামাজিক মাধ্যম হয়ে উঠেছে।অফিসের ছবি, তার কাজের ছবি, পুলিশের আটকের ছবি কম গুরুত্ব পেয়েছে। উপস্থাপিত ডকুমেন্টের পক্ষে তেমন কোন ছবি নেই।

এই ছবিগুলোর সাথে তার দূর্নীতির কিসম্পর্ক? হ্যাঁ, তিনি যদি এসব ছবি দিয়ে করোনা দূর্নীতির বা অন্য কোন ক্ষমতার অপ-ব্যবহার করতেন, তার প্রমাণ হাজির কওে ছবিগুলো নিশ্চয়ই ব্যবহারকরা যুক্তি সংগত হত। কিন্তু স্রেফ বাজাওে কাটতি বিবেচনায় প্যাকেজে  প্রাসঙ্গিগতা  বিবেচনানাকরে, এভাবে অপরাধীর মূল অপরাধে নজর না দিয়ে, তার শরীরী উপস্থাপনায় অনেক ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের’ সেক্সিস্ট’ মানসিকতার প্রকাশ ঘটছে। সামাজিক মূল্যবোধের বিবেচনায় যে ছবিকে‘আপত্তিকর’মনে করা হচ্ছে, তা প্রকাশ করা হচ্ছে কোন নীতিবোধে?এরমধ্য দিয়ে গণমাধ্যম কারো পারসোনাল স্পেসে অযাচিত ভাবে ঢুকে পড়ছে কিনা, সেটাও বিবেচনা করতে হবে।

অনেকে হয়তো এই কুতর্ক নিয়ে হাজির হতে পারেন যে, গ্লামার বা বাজার মূল্য কি সংবাদমূল্যের সাথে সম্পর্কিত নয়? হ্যাঁ।তবে, তা অবশ্যই একটা নীতির মধ্যে। যদি অতি লাভের আশায় নীতির সাথে আপোষ করেন, তাহলে ডা. সাবরিনার দোষ কোথায় অর্থ-যশ-সম্পদ লাভের আশায় নীতি বিসর্জন দিয়ে?

লেখক: তপন মাহমুদ
সহকারী অধ্যাপক
সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমঅধ্যয়ন বিভাগ
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়।